তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল বিপণন

AlmasKabir-techshohor
Evaly in News page (Banner-2)

সৈয়দ আলমাস কবীর : ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন বিপণনের জন্য একটি আশির্বাদ। চৌকস বিপণনকারী বা মার্কেটিয়াররা এই ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন গ্রাহকদের অনেক কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছেন এবং ভোক্তা-অভিজ্ঞতাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যেতে পারছেন। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত পছন্দ, কোন বিশেষ ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য, এমনকি তাঁদের পূর্বের কেনাকাটার ধরণের উপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো এখন অনেক সহজ এবং এজন্য রয়েছে একাধিক ডিজিটাল মাধ্যম।

এই ডিজিটাল যুগের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অসংখ্য তথ্য বা ডেটা। ডেটার এই মহাপ্লাবনে অনেক মার্কেটিয়ারই হাবুডুবু খান! কিন্তু সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়া এই লক্ষ্য-কোটি ডাটার কোনো গুরুত্ব নেই। গ্রাহকের কী প্রয়োজন তা’ সে-ই বুঝতে পারবে, যে এই ডেটাকে বিশ্লেষণ করে অর্থবহ করে তুলতে পারবে। এর উপর ভিত্তি করে বিপণন প্রচারণা চালানো তার জন্য অনেক সহজ হবে।

AlmasKabir-techshohor
সাধারণ তথ্যকে অভিযোগ্য ও মাননিষ্কর্ষ করতে প্রয়োজন তথ্য বিশ্লেষণ বা ডাটা এনালিটিক্স। গ্রাহকের মোবাইল, ওয়েবসাইট, অ্যাপ ইত্যাদির ব্যবহার থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, তাকে তথ্যসম্পদে রূপান্তরে ডাটা এনালিটিক্স অপরিহার্য। তথ্যের উৎস সনাক্ত করে যথাযথ ডাটা ফানেলিং-এর মাধ্যমে সেই তথ্যকে ব্যবহারোপযোগী করে তোলাই ডিজিটাল মার্কেটিং এর মূলমন্ত্র। একজন মার্কেটিয়ার যদি কোনো গ্রাহকের সাথে কথা বলার আগে থেকেই সেই গ্রাহকের পছন্দ-অপছন্দ ও প্রয়োজন সম্বন্ধে জেনে রাখে, তাহলে তাকে সন্তুষ্ট করা অনেক সহজ হয়ে যায়। গ্রাহকের কাছে যদি তার ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বা সেবা উপস্থাপন করা যায়, তবে সেই গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যবসায় পাওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। ডাটা মডেলিং-এর মাধ্যমে গ্রাহকদের এই চাহিদা ও পছন্দের ধরণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

আসন্ন আইওটি (ইন্টারনেট অফ থিংগস) ও অন্যান্য পরিব্যাপক প্রযুক্তি এই তথ্য সংগ্রহে আরও সাহায্য করবে। যেমন, গ্রাহকের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বা গাড়িতে বসানো জিপিএস-এর মাধ্যমে লোকেশন জেনে তাকে স্থানভিত্তিক পণ্য বা সেবা উপস্থাপন করা যাবে। অথবা গ্রাহকের আইওটিসক্ষম ফ্রিজের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে তাকে কাঁচাবাজারের বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর প্রস্তাব পাঠানো যাবে।

বিভিন্ন অসম উৎসের তথ্যসমূহ থেকে মূল্যবান উপাত্ত বের করে তার সাহায্যে মার্কেটিং-এর কৌশল তৈরি করা একটি আধুনিক কোম্পানির এখন নিয়মিত কার্যক্রম। কাঠামোবদ্ধ তথ্য তো বটেই, কাঠামোবিহীন তথ্যও সিদ্ধান্ত নিতে বেশ কাজে আসে। যেমন, কল সেন্টারের এজেন্টের সাথে গ্রাহকের কথোপকথন বা গ্রাহকের ই-মেইল কিংবা প্রতিক্রিয়া জরিপ ইত্যাদি থেকেও অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।

সফল ডিজিটাল মার্কেটিং এবং উৎকৃষ্ট গ্রাহক অভিজ্ঞতা সৃষ্টির ৫টি প্রধান ধাপ :

(১) ক্রেতার আচরণের তথ্য সংগ্রহ করা।

(২) ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে পারে এমন মার্কেটিং বিষয়বস্তু তৈরি করা।

(৩) মার্কেটিং এর বিষয়বস্তু কোথায় প্রদর্শিত হবে অথবা কী কী মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পরিবেশন করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

(৪) কী ধরনের গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো হবে তা ঠিক করা। এমনভাবে এটা করতে হবে যাতে গ্রাহকের পছন্দ ও প্রয়োজনের সাথে পরিবেশিত পণ্য বা সেবার প্রাসঙ্গিকতা থাকে।

(৫) মার্কেটিং-এর বিষয়বস্তুকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিয়ে তার গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে তা পরিবর্তন করা।

গ্রাহকের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমটা সঠিকভাবে নির্ণয় করাটা সব থেকে জরুরি। কেউ হয়তো ই-মেলের মাধ্যমে যোগাযোগ পছন্দ করে, কেউ আবার এসএমএস-এর মাধ্যমে অথবা কেউ হয়তো ফোনে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। গ্রাহক সন্তুষ্টির জন্য এটা একটা বড় শর্ত।

Social_Media-techshohor

প্রাপ্ত তথ্যউপাত্তের উপর ভিত্তি করে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও বেশ জরুরি। অনেক সময়ই দেখা যায় যে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গ্রাহক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হলো, তা বিশ্লেষণ করে উপাত্ত তৈরি হলো কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করে ফেলায় সেই তথ্যের আর কোন প্রাসঙ্গিকতা থাকলো না। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন না করলে গ্রাহক হারাতে হবে।

তথ্যের বিশ্লেষণ কিন্তু খুব সহজ কাজ নয় এবং তা করতে গিয়ে অনেকেই কিছু ভুল করে ফেলেন। অনেকেই মনে করেন যে, যত বেশি তথ্য পাওয়া যায় ততই বুঝি ভাল। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে নানান রকমের তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। তারা ভুলে যান যে, বিশ্লেষণের জন্য শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক তথ্যই প্রয়োজন। না হলে তথ্যবিশ্লেষণ তো জটিলতর হবেই, সেই বিশ্লেষণ মার্কেটিং কৌশলকে ভুল পথেও পরিচালিত করতে পারে।

ডাটা এনালিটিক্স যদি সঠিকভাবেব্যবহার করা হয়, তাহলে ব্যবসায়িক পূর্বাভাস এবং বাজারের প্রবণতা ও মডেলিং সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যা কিনা সাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে নির্ণয় করা সম্ভব না। এ দিয়ে কী ঘটেছে, কীভাবে এবং কেন হচ্ছে, এখন কী হচ্ছে এবং কী ঘটতে পারে– এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।

গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ডিজিটাল মিডিয়ার জুড়ি নেই। মার্কেটিয়ারদের যেটা দরকার, তা হলো ব্যবসায়ের লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখে কী ধরনের গ্রাহকের কাছে বিপণন কার্যক্রম চালানো যেতে পারে, তা  ঠিক করা। তারপর বহুমূখী ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার করে দ্রুত গ্রাহকসেবা কিংবা পণ্য পরিবেশনার কাজ শুরু করা। সঠিক উৎস থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্যের যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পারলেই সফল ডিজিটাল মার্কেটিং সম্ভব।

লেখক : মেট্রোনেট বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেসিস পরিচালক। মেট্রোনেট আইটিইএস, সফটওয়্যার সলিউশন এবং নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তায় কাজ করে থাকে। সৈয়দ আলমাস কবীর বেসিসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ঊর্দ্ধতন সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি, এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন। ঢাকা চেম্বারের টেলিকম, আইসিটি ও মেধা-সম্পদ বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক এবং এফবিসিসিআইয়ের ই-কমার্স এবং টেলিকম ও আইটি বিষয়ক দুটি স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যানও তিনি।

*

*

আরও পড়ুন