Techno Header Top and Before feature image

স্মার্টকার্ড কি এবং কেন?

Evaly in News page (Banner-2)

তুসিন আহমেদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : দেশের সকল নাগরিকদের টেকসই ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্রের সুবিধা দিতে শুরু হয়েছে স্মার্টকার্ড বিতরণ কর্মসূচী। আপাতত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের চার ওয়ার্ড এবং কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছড়ায় স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। স্মার্টকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে ব্যক্তির চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি এবং দশ আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে। যা নিরাপত্তার দিকটি সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বজায় রাখবে বলে বলছেন এর বিশেষজ্ঞরা। অনেকের মনে প্রশ্ন এই স্মার্টকার্ড কী, কেন, তা কি ভাবেই বা  সংগ্রহ করতে হবে। 

স্মার্টকার্ড কি?
জাতীয় পরিচয়পত্রের ডিজিটাল সংস্করণকেই বলা হয় স্মার্টকার্ড। স্মার্টকার্ডে দেশের নগরিকদের ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নাগরিক সম্পর্কে জানা যাবে। স্মার্টকার্ডে নিরাপত্তামূলক নানা সুবিধা থাকার কারণে তা সহজেই নকল করা যাবে না। ব্যক্তিগত নানা সেবা নেয়া যাবে এই স্মার্টকার্ডের  সাহায্যে।

দেখতে যেমন স্মার্টকার্ড
স্মার্টকার্ডের আকৃতি পূর্বের কাগজের তৈরি লেমিনেটিং বিদ্যমান জাতীয় পরিচয় পত্রের মতোই। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে স্মার্ট কার্ডের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্লাস্টিক ও পলিমারের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে স্মার্টকার্ড। ফলে কার্ডটি মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে যা প্রায় ১০ বছর নষ্ট হবে না। স্মার্টকার্ডে রয়েছে একটি চিপ, যা মেশিনের সাহায্যে রিড করা যাবে। সেখানে নাগরিকের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। স্মার্ট কার্ডের ডিজাইনে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পাখি, শাপলা ফুল, চা বাগান, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি।

Page1.1

যেসব তথ্য থাকবে এই কার্ডে
স্মার্টকার্ডে প্রত্যেক নাগরিকের বিস্তারিত তথ্য থাকবে। এগুলো হলো ব্যক্তির নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম, পেশা, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, জন্মতারিখ, রক্তের গ্রুপ, জন্ম নিবন্ধন সনদ, লিঙ্গ, জন্মস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন, ধর্ম। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্মার্টকার্ডে থাকবে ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের মণির ছবি।

এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট নম্বর, আয়কর সনদ নম্বর, টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর, মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, স্বামী বা স্ত্রীর নাম ও পরিচয়পত্র নম্বর (থাকলে) এবং মা-বাবা, স্বামী বা স্ত্রী মৃত হলে সে-সংক্রান্ত তথ্য, অসামর্থ্য বা প্রতিবন্ধী হলে সেই তথ্যও উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগের জাতীয় পরিচয় পত্রে বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে পিতার নাম ব্যবহারের সুবিধা ছিলো না। এবার তা যুক্ত করা হয়েছে। নারীরা স্বামীর নামের পরিবর্তে চাইলে বাবার নাম যুক্তের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্মার্টকার্ড কতোটা নিরাপদ?
বিভিন্ন অবৈধ কাজে অনেকেই নকল জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরি করে তা ব্যবহার করে থাকে। কেননা যেকোনো ফটোকপি মেশিনে খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ের নকল জাতীয় আইডি কার্ড তৈরি করা যায়। আগের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিরপত্তামূলক তেমন কোনো ফিচার ছিলো না। তাই স্মার্টকার্ডের নিরাপত্তা বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্মার্টকার্ডে তিন স্তরে মোট ২৫টি নিরাপত্তা-বৈশিষ্ট্য সংযোজিত রয়েছে।

প্রথম স্তরের নিরাপত্তাগুলো খালি চোখের দেখা যাবে। যেকোনো ব্যবহারকারী সহজেই দেখলে বুঝতে পরবেন। নকল এমনভাবে করা হতে পারে যে খালি চোখে হয়তো বুঝাও না যেতে পারে। এর জন্য রয়েছে দ্বিতীয় স্তর নিরাপত্তা। যন্ত্রের মাধ্যমে তা দেখা যাবে। তৃতীয় স্তরের নিরাপত্তা-বৈশিষ্ট্য দেখতে ল্যাবরেটরিতে ফরেনসিক টেস্টের প্রয়োজন হবে।

স্মার্টকার্ডে থাকা সকল নাগরিকদের তথ্য একটি সার্ভারে জমা থাকবে। নিবার্চন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে যতটা সম্ভব নিরাপদে থাকবে এই তথ্যগুলো যেন হ্যাকারা তথ্য চুরি করতে না পারে। আইরিশ স্ক্যানের ও ফিঙ্গার প্রিন্ট তথ্য সার্ভার সংরক্ষণ হবে বাইনারি কোড আকারে। ফলে চুরি হলেও এই তথ্যগুলো থাকবে সুরক্ষিত।

স্মার্টকার্ড যে কাজে লাগবে
জাতীয় পরিচয়পত্র যে কাজ লাগতো সেই কাজগুলো করা যাবে স্মার্টকার্ডে। মূলত ২২ ধরনের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র কাজে লাগবে। স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স করা ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স করা, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, চাকরির আবেদন, বিমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা, নির্বাচনে ভোটার শনাক্তকরণ, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলাসহ আরও নানা কাজে লাগবে।

Smart-card-techshohor

যেভাবে পাওয়া যাবে র্স্মাটকার্ড
স্মার্টকার্ড পেতে নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী সশরীরে নির্দিষ্ট বিতরণ কেন্দ্রে আসতে হবে। সঙ্গে অবশ্যই মূল জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে আসতে হবে। যারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি তাদের মূল নিবন্ধন স্লিপ নিয়ে আসতে হবে।

তবে যে যাদের মূল জাতীয় পরিচয়পত্র বা নিবন্ধন স্লিপ হারিয়ে গেছে তাদের সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করে, জিডির মূল কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় অথবা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

কোথায় আপনার স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে সে সম্পর্কে তথ্য জানতে প্রথমে যেতে হবে এই ওয়েবসাইটে। তারপর সেখানে বাম পাশে থাকা সাইডবারে ‘স্মার্ট জাতীয় বিতরণ তথ্য’ তে ক্লিক করতে হবে। তাহলে নতুন একটি পেইজ চালু হবে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের আইডি কার্ডের নম্বর অথবা যারা জাতীয় পরিচয়পত্র পায়নি কিন্তু স্লিপ পেয়েছেন তারা স্লিপে দেয়া নম্বর, জন্মতারিখ ও নিরাপত্তামূলক নম্বর দিয়ে সাবমিটে ক্লিক করতে হবে । তারপর আপনার স্মার্টকার্ড কোথা থেকে সংরক্ষণ করবেন তা জানা যাবে।

Screenshot_2

যাদের কাছে ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য জানতে কঠিন মনে হয় তাদের জন্য সহজ সমাধান হলো ফোন কল। যেকোনো মোবাইল নম্বর হতে ১০৫ নম্বরে ফোন দিয়ে কল সেন্টারের মাধ্যমে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিরতণের সম্পর্কিত তথ্যাদি জানা যাবে।

এসএমএসের সাহায্যেও জাতীয় স্মার্টকার্ড বিতরণ সম্পর্কে তথ্য জানা যাবে। এর জন্য প্রথমে ম্যাসেজ অপশনে গিয়েে sc লিখে স্পেস দিয়ে nid লিখতে স্পেস দিয়ে আপনার ১৭ সংখ্যার জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর লিখে ১০৫ নম্বরে পাঠিয়ে দিতে হবে। যাদের ১৩ সংখ্যার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর তাদের আইডি নম্বরের আগে জন্ম সাল যোগ করতে হবে।
উদাহরণ : sc nid 19***************

যারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি তারা sc লিখে স্পেস দিয়ে f লিখে স্পেস দিয়ে নিবন্ধন স্লিপের ফরম নং লিখে স্পেস দিয়ে d লিখে স্পেস দিয়ে yyyy-mm-dd ( বছর-মাস-দিন) এই ফরম্যাটে জন্ম তারিখ লিখে ১০৫ নম্বর পাঠাতে হবে।
উদাহরণ : sc f 2***** d yyyy-mm-dd

স্মার্টকার্ড প্রকল্পের ব্যয় ও কবে সবাই পাবেন

বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে এই প্রকল্পে। দেশের ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্টকার্ড দেওয়ার এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০১১ সালে। কার্ড বিরতণ প্রক্রিয়া শেষ হবে আগামী বছর।

সিটি-পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যাম্প করে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে। গ্রামীণ ভোটারদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে ক্যাম্প করা হবে। একটি ইউনিয়নে একাধিক ক্যাম্পও করা হতে পারে। কেউ স্মাটকার্ড নেওয়ার জন্য ক্যাম্পে এলে তাকে প্রথমে দশ আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি দিতে হবে। এরপর তিনি স্মার্টকার্ড নেবেন। তবে তাকে আগের নেওয়া লেমিনেটিং করা জাতীয় পরিচয়পত্রটিও জমা দিতে হবে। আর পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় লাগবে।

ঢাকায় আজ থেকে শুরু হওয়া স্মার্টকার্ড বিতরণের পরপরই অন্য সিটিতেও কার্যক্রম শুরু করা হবে। এরপর পৌরসভা ও ইউনিয়নে এ কার্যক্রম হাতে নিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রামে গ্রামে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে বলে জানায় নিবার্চন কমিশন।

*

*

আরও পড়ুন