Techno Header Top and Before feature image

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ঘটন-অঘটনের বছর ২০১৫

ইমরান হোসেন মিলন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : পুরনো বছর যায়, নতুন বছর আসে। নতুন বছরে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয় কিন্তু স্মৃতিতে থেকে যায় পুরনো বছরের ভালমন্দের নানা ঘটনা। আসছে ২০১৬ সাল। বিদায় বেলায় দাঁড়িয়ে ২০১৫। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভালমন্দ মিলিয়ে কেমন কাটলো বছরটি? প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বাইরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বছরটি ছিল নানা ঘটন-অঘটনের। ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর মন্ত্রীত্ব হারানো, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা, ফেইসবুক বন্ধ করার মতো ঘটনাতো অঘটনই।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর মন্ত্রীত্ব হারানো:
২০১৪ সালের শেষ থেকেই আলোচনায় ছিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হজ্ব ও তাবলিগ জামায়াত নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সভায় বেশ কিছু মন্তব্য করেন তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রি আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। এরপর দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। ওই বছরের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত হন লতিফ সিদ্দিকী। এরপর দীর্ঘ ছয়মাস ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ছিল মন্ত্রিবিহীন। পরে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদ তারানা হালিম।

tech-best-of-2013-TechShohor

ইন্টারনেট বন্ধ:
বছরের শেষের দিকে দুটি ঘটনা জন্ম দিয়েছে নানা সমালোচনার। একটি ইন্টারনেট বন্ধ। আরেকটি বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া। ১৮ নভেম্বর দেশে প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট ইন্টারনেট সরবরাহও বন্ধ ছিল। একই দিনে জননিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিটিআরসিকে নির্দেশনা দেয় দেশে ফেইসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার। দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ১০ ডিসেম্বর জনপ্রিয় এই মাধ্যমগুলো খুলে দেওয়া হয়।

ফেইসবুক বন্ধের ঘটনার রেশ তখনো কাটেনি। এমন সময় ১৩ ডিসেম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয় খুদে ব্লগ লেখার জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম টুইটার, ইন্টারনেটে কথা বলা ও ম্যাসেজিং অ্যাপ ইমো এবং ভয়েস, ভিডিও কল ও ম্যাসেজিংয়ের জনপ্রিয় মাধ্যম স্কাইপ। তবে এগুলো সেদিনই খুলে দেওয়া হয়।

সার্চ ইঞ্জিন চরকির যাত্রা:
১ মার্চ থেকে যাত্রা শুরু হয় দেশীয় ভাষায় ও দেশে তৈরি তথ্য খোঁজার ওয়েবসাইট বা সার্চ ইঞ্জিন চরকি ডটকম। মূলত নিজের ভাষায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সার্চ ইঞ্জিন সেবা দিতে চালু হয়েছে এই চরকি ডটকম। এর আগে বাংলাভাষায় এবং দেশে তৈরি সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকা ডটকম। মার্চে চরকি তাদের কার্যক্রম শুরু করলেও আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আগস্টে।

সিম ও হ্যান্ডসেট নিবন্ধন:
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে তারানা হালিম ঘোষণা দেন দেশে সিম নিবন্ধনের। ১৬ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন শুরু হয়। ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত চলবে সিমের নিবন্ধন।

সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও কেলেঙ্কারি কম ঘটেনি। ২০১৫ সালে প্রযুক্তিক্ষেত্রে দেশে আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রায় ছয় হাজার মোবাইল সিম নিবন্ধনের বিষয়টি। ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এটি প্রকাশ করে।

এছাড়াও ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ২১ নভেম্বর ঘোষণা দেন, ২০১৬ সাল থেকে সিম নিবন্ধনের মতো করে মোবাইল হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন করতে হবে।

হাইটেক পার্কের যাত্রা:
দেশে প্রযুক্তিনির্ভর হাইটেক পার্কের যাত্রা শুরুর বছর ছিল ২০১৫। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর দেশের সবচেয়ে বড় হাইটেক পার্কের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে। এছাড়াও রাজধানীর কাওরান বাজারের জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার পার্ক ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ঢাকা, গাজীপুর ছাড়াও খুলনা, যশোর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নীলফামারীসহ মোট ১৩টি জায়গায় হাইটেক পার্ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

ইন্টারনেট উইক:
প্রতিবছর এক কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বছরের ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারনেট উইক। এই উৎসব আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), গ্রামীণফোন এবং সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
দেশের তিনটি স্থানে বড় তিনটি এক্সপোসহ মোট ৪৮৭টি উপজেলায় একযোগে ইন্টারনেট সপ্তাহ পালন করা হয়। উৎসবটিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স কোম্পানি, মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান, ওয়েব পোর্টাল, ডিভাইস কোম্পানিসহ ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্য ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সামিট:
আউটসোর্সিং খাতে দক্ষ জনবল তৈরি, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রথমবারের মতো এবছর অনুষ্ঠিত হয় বিপিও সামিট-২০১৫। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি, কোম্পানির প্রতিনিধিসহ কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারী সম্মেলনে অংশ নেয়। দেশে ২০২১ সালের মধ্যে বিপিও খাতে এক লাখ কর্মসংস্থানসহ প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) এবং সরকারের আইসিটি বিভাগ।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট:
প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খবর ১১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাসের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক চুক্তি। ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে অল্প খরচে এই খাতে নানান সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে।

ছিল অ্যাপস তৈরির বছর:
বিদায়ী বছরকে দেশে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) তৈরির বছর বললে ভুল হবে না। স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে তৈরি হয়েছে হাজারো অ্যাপস। এর মধ্যে সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ৫০০ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ)। ২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আইসিটি বিভাগে ওই অ্যাপসগুলোর উন্মোচন করেন। আইসিটি বিভাগের অর্থায়নে ৫০০ অ্যাপস তৈরি প্রকল্প কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে দেশীয় অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এথিকস অ্যাডভান্সড টেকনোলজি লিমিটেড (ইএটিএল)। এই অ্যাপসগুলোর ৩০০টি সরকারি বিভিন্ন সেবা এবং ২০০টি বিভিন্ন সৃজনশীল ধারণার উপর নির্মাণ করা হয়।

এছাড়াও ইএটিএল আরো নানা ধরনের অ্যাপস তৈরির প্রতিযোগিতা করেছে। যেগুলোতে তৈরি হয়েছে হাজার অ্যাপস। ৭০০ অ্যাপস তৈরি করতে গুগল স্টাডি জ্যাম নামের প্রোগ্রামের মাধ্যমে। আর বছর জুড়েই ছিল অ্যাপস তৈরির এমন নানা আয়োজন। অ্যাপ তৈরি নিয়ে বিভিন্ন হ্যাকাথন।

আলোচনায় ছিল পেপ্যাল :

গ্লোবাল অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম কোম্পানি পেপ্যাল। যা ইলেক্ট্রনিক বা ইন্টারনেটে অর্থ লেনদেন সেবা দিয়ে থাকে মানি-অর্ডার বা চেকের বিকল্প হিসেবে। ২০১৫ সালের একটি আলোচিত বিষয়ও ছিল পেপ্যাল। দীর্ঘদিন থেকে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা তাদের অর্জিত অর্থ আনতে দেশে পেপ্যালের সেবা দেওয়ার দাবী জানিয়ে আসছিল। তবে বছরের মাঝামাঝিতে পেপ্যালের সঙ্গে সরকারের আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বৈঠক করেন। পেপ্যাল বাংলাদেশে তাদের সেবা দেওয়ার আশ্বাস বাণী দিলেও এখন পর্যন্ত সেবাটি দেওয়া নিয়ে কোনো উন্নতি হয়নি।

বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহার:
দেশে ২০১৫ সালে উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বছরের সেপ্টেম্বরে এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাচ কোটি ছাড়িয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে এই সংখ্যার ওঠানামা হয়েছে। তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০১৫ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরর সংখ্যা বেড়েছে এক কোটিরও বেশি।

মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বেড়েছে:
২০১৪ সালে যে পরিমাণে হ্যান্ডসেট বিক্রি হয়েছে ২০১৫ সালের প্রথম দশমাসেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমদানির হিসাবে এ বছর প্রথম দশমাসে হ্যান্ডসেট এসেছে ৪৬ লাখ ৭১ হাজার পিস। যা ২০১৪ সালে মোট আমদানি ছিল ৪০ লাখ ৫৪ হাজার পিস।
এছাড়াও ফ্রিল্যান্সিং খাতে জনবল বেড়েছে, বেড়েছে এই খাত থেকে আয়। তৈরি হয়েছে প্রযুক্তিখাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা।

 

*

*

আরও পড়ুন