অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা

তুসিন আহমেদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর :  মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথায় জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালী জাতির জীবনে এক অবিস্মরনীয় দিন। বিজয়ের পর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। তবুও মুক্তিযুদ্ধের গল্প, স্বাধীনতার সেইসব দিনগুলো আজও অমলিন।

অনলাইনের বিশাল জগতে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে হাজারো কাজ চলছে। নিত্যনতুন ওয়েবসাইট যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি ব্লগেও চলছে ইতিহাস নির্মাণ। গবেষকরাও নতুন করে গড়ে তুলছেন নানা তথ্যভান্ডার।

এ ছাড়া অনেক ফেইসবুক পেইজে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জয়গান তুলে ধরা হয়েছে নানা পর্যায় থেকে। নানা তথ্য ও ছবি শেয়ার করা হয় এগুলো থেকে। তবে অনেক পেইজ আছে সেগুলো মিথ্যা এবং ভুল তথ্য প্রচার করে। সবার উচিত এগুলো থেকে সাবধান থাকা।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে কিছু সাইটের কথা জানাতে এ প্রতিবেদন।

Victory-Day-Final-Cover-Page-1

জেনোসাইড বাংলাদেশ ডটআর্গ ওয়েবসাইটিতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে।যুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের ছবি ও ভিডিও পাওয়া যাবে এতে।

রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য, বই এবং জার্নাল। সাইটির টাইমলাইন বিভাগে রয়েছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ছবি এবং বিররণ।

‘এদের চিনুন’ নামক বিভাগে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি ও পাকিস্তানের দোসর রাজাকাদের বিভিন্ন দম্ভোক্তি ও ছবি।

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সর্ম্পকে অনেক তথ্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তিবাহিনীর নির্বাচিত জীবনী রয়েছে বাংলা উইকিপিডিয়ায়।

এ ছাড়া মিত্রবাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আল শামস, শান্তি কমিটি সর্ম্পকে তথ্য দেওয়া আছে। তবে সেসব তথ্যগুলো খুব বেশি মান সম্মত নয়। তথ্যের অনেক ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাগ্যালারি ডটকমে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ছবি। মুক্তিযুদ্ধের আগের রাজনীতির নানা ছবিও রয়েছে এতে।

‘ওয়ার ক্রাইম’ বিভাগে রয়েছে রাজাকারদের ছবি। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের অনেক ডকুমেন্ট ও বই পাওয়া যাবে এতে।

আইসিএসফোরাম ডটঅর্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করেছে তাদের সর্ম্পকে নানা তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে সাইটটি।

এতে তাদের অপরাধের নানা দলিল এবং তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে উইকি ডটকম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক একটি উইকিভিত্তিক ওয়েবসাইট। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী, সেক্টর কমান্ডার, বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উওম, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক অনুসারে সাজানো আছে।

এতে রয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক শ্রেণী ক্যাটাগরি যেখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চিত্রের তালিকা দেওয়া আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন বাহিনী জেড ফোর্স, কে ফোর্স, নৌ কমান্ডো, কাদেরিয়া বাহিনী ও মুজিব বাহিনী সর্ম্পকে তথ্য রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ওয়েবসাইটটি একটু হতাশ করবে। খুব সামান্য তথ্য ছাড়া খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না এতে।

সাইটটিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত একটি ফিচার লিঙ্ক রয়েছে। লিঙ্কটিতে কয়েকটি বিভাগে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাসটি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিহাস নামক লিঙ্কটিতে যে যৎসামান্য তথ্য রয়েছে তার বেশিরভাগই আবার ‘৭১ পূর্ববর্তী ইতিহাস।

ওয়েবসাইটের একটি লিঙ্কে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম থাকলেও বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীকদের কোনো তথ্য নেই।

৭ মার্চে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণ ও ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের ভিডিও চিত্র দেখা যাবে।

তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হিসেবে যেসব তথ্য থাকার দরকার এর বেশিরভাগ তথ্যই এখানে পাওয়া যায় না।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইট বেশ সমৃদ্ধ। ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায় সাজানো এ সাইটে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিদেশী ধারনা পাবেন।

১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নানা তথ্য রয়েছে এতে। এতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ভিডিও এবং জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি সর্ম্পকে তথ্য রয়েছে। তবে বেশ কিছুদিন থেকে সাইটটি বন্ধ রয়েছে। কেন বন্ধ- এ সর্ম্পকে সঠিক তথ্য জানা যায় নি।

বাংলাদেশের  প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এর ওয়েবসাইটটিতে মহান এ মুক্তিকামী নেতার কর্মজীবন তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ছবির গ্যালারি যেখানে রয়েছে সাদামাটা এ নায়কের বিভিন্ন ছবি।

স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে রয়েছে অনেক বির্তক। সেই বির্তক অবসান হবে যদি আপনি জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের বেস্ট ব্লগের পুরষ্কার পাওয়া ব্লগার ডা: নিয়াজ এর ব্যক্তিগত ব্লগের সংগ্রহে থাকা লিংকগুলোর বিভিন্ন তথ্য পড়ে নেন।

আগ্রহ নিয়ে আরও কিছু ওয়েবসাইটে গেলে পাবেন বাংলার স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অজানা সব তথ্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নানা তথ্য সমৃদ্ধ আরেকটি ওয়েবসাইট ভার্চুয়াল বাংলাদেশ (www.virtualbangladesh.com)।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার জন্য একটি উইকিভিত্তিক ওয়েবসাইট http://muktijuddho.wikia.com। বর্তমানে এখানে ৬৪টি ভুক্তি রয়েছে।

গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরেকটি চমত্‍কার ওয়েবসাইট www.muktadhara.net। সাইটটির http://www.muktadhara.net/page35.html ঠিকানায় পাবেন একাত্তরের গণহত্যার তথ্য ও ছবি, ঘটনাবলী, ভিডিও, মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক ওয়েবসাইটের সংযুক্তি, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ছাড়াও অনেক কিছু ।

এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক ক্রাইম স্ট্র্যাটেজি ফোরামের ওয়েবসাইট www.icsforum.org -এ একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে একটি ই-লাইব্রেরি তৈরী করা হয়েছে ।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ই-বুক ও বিভিন্ন বইয়ের ই-সংস্করণ পাওয়া যায় অনলাইনে। জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি” অনলাইনে বসে পড়তে পারবেন http://kamalres.tripod.com/main.html-এ ঠিকানায়।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ বইটি ডাউনলোড করতে পারবেন www.liberationwarbd.org ঠিকানা থেকে। মাত্র বাইশ পৃষ্ঠার এই ছোট্ট বইয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ব্লগাররাও নিয়েছেন বিভিন্ন উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমনি অসাধারন একটি ই-সংকলন ‘ ফিরে দেখা ৭১’ নিয়ে এসেছেন স্যামহোয়ারইন ব্লগের কয়েকজন তরুণ।

পিডিএফ আকারে সংগ্রহে রাখার মতো সংকলনটি বিনামূল্যে http://www.mediafire.com/?wn1n2po29xs ঠিকানা থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা আরও কিছু বই ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন http://www.edunews4u.com/admission/index.php/1971 -এ ঠিকানা থেকে ।

আরও কিছু ওয়েবসাইট হলো- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনাল্পয়সেক্টর কমান্ডারদের ফোরাম,গণহত্যার আর্কাইভ ও রাজাকারদের তালিকাওয়ার ক্রাইম স্ট্র্যাটেজি ফোরামভারতীয় ওয়েবসাইট ও মুক্তিযুদ্ধবাংলাদেশ ১৯৭১যুদ্ধাপরাধের দলিলপত্রবীরশ্রেষ্ঠস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইডিজিটাল প্রকাশনাই মুক্তিযুদ্ধমোবাইলে মুক্তিযুদ্ধ, www.bangladesh1971.org, www.1971bd.org, www.bd71.blogspot.com, www.bharat-rakshak.com/1971, http://www.gendercide.org/case_bangladesh.html

Screenshot_4

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অ্যাপ
বর্তমানে স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানতে স্মার্টফোনের উপযোগী বেশ কয়েকটি আ্যাপ্লিকেশন রয়েছে।

তেমনি একটি অ্যাপ হলো ১৯৭১ এর ডায়েরি। একাত্তরের দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সাজানো এ অ্যাপটি ডাউনলোড করা যাবে এ ঠিকানা থেকে।

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কেও তথ্য আছে। অ্যাপটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যুদ্ধের বিবরণ, নৃশংসতার ভয়াবহতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা, স্মৃতিস্তম্ভ সম্পর্কে জানা যাবে মুক্তিযুদ্ধ নামের এ অ্যাপ থেকে। এটি ডাউনলোড করা যাবে এ ঠিকানা থেকে।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়বাংলাদেশমুক্তিযুদ্ধ,  সাত বীরশ্রেষ্ঠ ও একাত্তর নামের অ্যাপগুলো থেকে জানা যাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের গেমস
অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের তথ্যবহুল ভান্ডার থাকলেও এ নিয়ে গেইম তৈরি হয়েছে খুব কম।স্বাধীনতা যুদ্ধ নামের একটি পাওয়া যাবে http://bit.ly/1OHM5Js -এ ঠিকানায়।

এ ছাড়া হিরোজ অব ৭১’গেইমটি তৈরি করেছে দেশীয় অ্যাপ্লিকেশন গেইম নিমার্তা প্রতিষ্ঠান পোর্টব্লিস। ১৬ ডিসেম্বর  বিজয় দিবসে গেইমটি উন্মুক্ত করা হবে।

ডিজিটাল প্রকাশনায় মুক্তিযুদ্ধ
সরকারি উদ্যোগে ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার তেমন নজির চোখে না পড়লেও বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহের কিছু বেসরকারী উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ’৭১ নামে একটি ডিজিটাল প্রকাশনা বের করেছিল হাইটেক প্রফেশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত এ সিডিতে ১৯৪৭ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়।

প্রায় এক হাজার দুর্লভ ছবি ও ভিডিওচিত্রের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছিল এ সিডি। এটি তৈরিতে কাজ করেছিলেন প্রজন্ম ’৭১ নামের একটি সংগঠনের কর্মীরা।

এটি প্রকাশ হওয়ার পর প্রচুর সাড়া পড়ে। বিক্রি হয় কয়েক লাখ কপি।

‘মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাঁথা নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রকাশনা ডিজিটাল মাধ্যমে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে ডিজিটাল প্রকাশনা হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার তত্ত্বাবধায়নে নির্মিত ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’।

এ ছাড়া জাগরণ সাংস্কৃতিক ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘জাগরণের গান’ নামের ৬ সিরিজের একটি সিডিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রেরণাদানকারী গান রয়েছে।

*

*

আরও পড়ুন