স্কুলের স্বপ্নের সফলতার গল্প ডিক্যাস্টালিয়া

Evaly in News page (Banner-2)

দু’বন্ধুর ব্যবসা শুরুর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম এক উদ্যোগের। সেই স্কুল জীবনের স্বপ্নই তরুন বয়সে এসে জন্ম দিল নতুন গল্প, সফল এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডিক্যাস্টালিয়া’র। সেই গল্প জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন।

দুই তরুনের দীর্ঘ সংগ্রাম ও নিরন্তর পরিশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্নের বাস্তবরূপ এখন ‘ডিক্যাস্টালিয়া’।

একদিনে অবশ্য আজকের অবস্থান তৈরি হয়নি। একটু একটু করে যেমন বেড়েছে কাজের পরিসর, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বেড়েছে পরিচিতিও। ওয়েব ডেভলপমেন্ট, অ্যাপ তৈরি, ডোমেইন হোস্টিং, ওয়েব সল্যুশন, সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, ই-কমার্স সল্যুশন, ইন্টারনেট অ্যাপ্লিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়া সল্যুশন, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সার্ভিসসহ নানা ধরনের কাজ করে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলেছে তিন তরুনের প্রতিষ্ঠান ডিক্যাস্টালিয়া। যদিও শুরুর গল্পটা দু’বন্ধুর ছোটবেলাকার এক স্বপ্নের, যা কালের গর্ভে মিলিয়ে যায়নি।

গত রমজানে ডিক্যাস্টালিয়ার আপটিটিভ এ বানানো ‘রমজান’ অ্যাপ দেশে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। যা প্রথম সপ্তাহে ৫০ হাজারের বেশি ডাউনলোড হয়। সম্প্রতি ডিক্যাস্টালিয়ার উদ্যোক্তাদের এক আড্ডায় জানা গেল সেই বন্ধুদের উদ্যোক্তা হওয়ার কাহিনী। নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে যারা ডিক্যাস্টালিয়াকে নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে নেমেছিলেন। এটিকে ঘিরে এখনও ঘোরের মধ্যে যাদের দিন কাটে। যারা পেশা হিসেবেও নিজেদের উদ্যোগকে ভালোবেসেছেন।

s

এসিসিএ ডিগ্রিধারী খায়রুল হাসান শামীম রয়েছেন টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে। ডিজাইনার ও আইডিয়া স্পোশালিস্টের কাজও করছেন তিনি।সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায় পাস করা ইয়াফী খানের দায়িত্ব চিফ টেকনিক্যাল অফিসারের। আর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পড়াশোনা শেষ করে সাবিলা ইনুন রয়েছেন যোগাযোগবিদ হিসেবে। ডিক্যাস্টালিয়ার শুরুর সময় থেকে এ তিন উদ্যোক্তার কাজের নেপথ্যের সহযোগী আব্দুর রহিম অফিস সহকারি হলেও এ পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব তারই। এ কারণে এ উদ্যোগের গল্পে জোরের সঙ্গেই তার নামটাও জুড়ে দিলেন তারা।

শুরুর কথা

শামীম ও ইয়াফী; বন্ধু সেই ছোটবেলার। স্কুলে একসঙ্গে লেখাপড়ার সময় থেকে কিছু একটা করবেন বলে নিজেরা গল্প করেছিলেন। যা আর গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বপ্নে রূপ নিয়েছিল। তাইতো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টাতেও মাথায় বয়ে বেড়িয়েছেন। ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন চাকরি জীবন শুরু করলেন কৈশরের সেই স্বপ্নটাই তাদের আবার এক করে দিল। চাকরির এক বছরের মাথায় যৌথ প্রচেষ্টায় কিছু করার পরিকল্পনা জোরালো হতে থাকে। ঘোরাফেরা আর চা আড্ডা সবকিছুতেই তখন এক চিন্তা। শামীম বলেন, চিন্তার অনেকটা পূর্ণতা পায় কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে। সেখানেই পরিকল্পনা হয়, নিজেদের কিছু করার। ইয়াফী যোগ করেন, আজকের অবস্থানে আসার ক্ষেত্রে চায়ের দোকানের ভূমিকা কিন্তু অনেক। সেখানেই আড্ডার ছলে মিটিংগুলো হতো।

অবশেষে দু’বছরের মাথায় চাকরি ছেড়ে দেন দুজন। অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে একটি বাসায় কাজ শুরু করেন তারা। শুরুটা ২০০৮ সালে হলেও কাগজে কলমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিক্যাস্টালিয়ার শুরু ২০০৯ সালে।

ইয়াফী বলেন, শুরুর সময়টাতে এখনকার মতো প্রযুক্তি খাতে ব্যবসা বাড়েনি। শখের বসে ফ্রিল্যান্সিং কিংবা যাদের ‘সিড মানি’ আছে তারা এখন এ কাজে আসছে। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সাবিলা ইনুন তার সঙ্গে যোগ করে বলেন, এখন সেটাই বেশি দেখা যায়।

11348969_10155567645185697_126273731_n

দেশে নতুন গড়ে ওঠা আইটি কমিউনিটিকে নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল শুরুটা। ধীরে ধীরে সে পথে এগিয়ে যাচ্ছে ডিক্যাস্টালিয়া বলে মনে করেন এ উদ্যোগের ‘আইডিয়াবাজ’ শামীম।

প্রতিবন্ধকতা

নতুন কাজের শুরুতে প্রতিবন্ধকতা থাকার বিষয়টি ডিক্যাস্টালিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ২০০৮ সালে অনেকেই তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। পারিবারিক চাপের বিষয়ে তিনজনই একসুরে বলে ওঠেন, ‘আমরা কেউ তা অনুভব করিনি। তারা সবাই হেল্পফুল ছিলেন বলে এতদূর আসার স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলাম।’

শামীম বলেন, বিনিয়োগ কম ছিল বলে একটি অফিস ভাগাভাগি করে কাজ শুরু করি আমরা। হঠাৎ তারা অফিস ছেড়ে দিলে বিপাকে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে আমাদেরকেও অফিস ছাড়তে হয়। পরে অন্যখানে তা কোনোভাবে ম্যানেজ করা হয়।

ইয়াফী বলেন, বিনিয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কাছে গেলেও ঋণ মেলেনি। এক ধরনের তুচ্ছ তাছিল্যের শিকারও হতে হয়েছে। তারা ‘সফটওয়্যার’ না, ‘হার্ডওয়্যার’ দেখতে চেয়েছে। মানে অনেক পরিমাণ টাকার লেনদেন দেখতে চেয়েছে।

বর্তমান অবস্থা

বয়স অনেক হলেও পরিসর খুব বাড়ায়নি ডিক্যাস্টালিয়া। কাজের মানের দিকেই বেশি নজর তাদের। বর্তমানে সফটওয়্যার প্রকৌশলী রয়েছেন ১৪ জন। আরও কয়েকজন শিগগরি যোগ দেবেন বলে জানান শামীম।

শামীম জানান, কাজের মধ্য দিয়ে, আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এটিকে বড় একটা আইটি কোম্পানিতে রূপ দিতে চান তারা।

প্রচারণা

আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো প্রচারণায় যায়নি ডিক্যাস্টালিয়া। একটি ফেইসবুক পেইজ থাকলেও সেখানে খুব বেশি পোস্ট দেওয়া হয় না বলে জানান ইনুন।

67328_10154786882695414_8931645720578345237_n

বিজ্ঞাপনের এ যুগে প্রচারণা বিমুখ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম বলেন, কাজের সততা, দক্ষতা ও সঠিক সময়ে গ্রাহকদের কাজ কর দেওয়াটাই প্রচারণার কাজ করেছে। গ্রাহকরাই প্রচারের কাজটি করে দিয়েছেন। ইয়াফী যোগ করেন তার সাথে, আসলে কাজের সুনামই মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে।

প্রচারণায় জন্য আলাদা ব্যয় না করে সে অর্থে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী রাখার পক্ষে তরুন এ তিন তুর্কি উদ্যোক্তা।

সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারি সহায়তা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ এখন ঋণের পাশাপাশি অনুদানও দিচ্ছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ডিজিটাল বিনিয়োগ সম্মেলন অনেক আশা জাগানিয়া বলেও তারা মনে করেন।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, এ খাত টিকে থাকবে প্রতিযোগিতার ওপর। তাই বিদেশি কোম্পানি আসলে যেমন প্রতিযোগিতা বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগও বাড়বে। সরকার এ খাত নিয়ে আন্তরিক হলে দেশে আরও উদ্যেক্তা তৈরি হবে বলে মনে করেন ডিক্যাস্টালিয়ার উদ্যোক্তারা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ডিক্যাস্টালিয়া সব সময় নতুন কিছু করার চিন্তা করে। শুরুর দিকের অনেকে আইডিয়া অনেকে পছন্দ করেননি। কিন্তু সেগুলোই এখন খুব পপুলার ডিজাইন বলে জানান ইনুন। তাই নতুন সব আইডিয়া তৈরির পাশাপাশি নতুনদের কাজের সুযোগ দিয়ে, কাজের পরিধি আরও বাড়াতে চান তারা।

নতুনরা কেমন করছে

এখন যারা কাজে আসছেন তাদের অনেকেই খুব ভালো করছেন বলে জানান ইনুন। ব্যবসায়িক দিক দিয়েও তাদের এগিয়ে রাখতে হবে।

তবে নতুনদের মধ্যে অনেকেই একটা ঘোরের ভিতর আছে বলে মনে করেন এ উদ্যোক্তারা। তারা বলেন, আসলে অনেকে কাজ না জেনে, বুঝে কয়েকদিন ফ্রিল্যান্স করার পরই উদ্যোক্তা বনে যেতে চাইছেন। উদ্যোগ ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের পার্থক্য বুঝতে না পেরে অল্পতেই হতাশ হয়ে সব ছেড়ে দিচ্ছেন।

তবে নতুনদের মধ্যে অনেকের আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট, কাজের পরিচ্ছন্নতা খুবই চোখে পড়ার মতো। এমন কি তারা যেসব কাজ করে সেগুলো বিশ্বের অনেক দেশের নামকরা আইডিয়াবাজরাও পারের না বলে জানান শামীম।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই কাজে সততা থাকা চাই। আর মূল যে মন্ত্র তা হলো লেগে থাকা। অল্পতেই ধৈর্য্যহারা হলে ছিটকে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। অবশ্যই প্রতিযোগিতার মানসিকতা থাকতে হবে।

*

*

আরও পড়ুন