হস্তশিল্পের হাত ধরে স্বপ্ন সমান বড়ো সেলিয়া

আরও অনেকের মতো চাইলে তিনিও হাঁটতে পারতেন কোনো সরকারী চাকরির পেছনে। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনা রক্তে মিশে থাকায় তিনি আর সে পথে পা বাড়ালেন না। প্রতিকূলতার পাহাড় ভয় ভুলে গিয়ে গড়ে তুললেন হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান গদিঘর। সাধারণ এক শিক্ষার্থীর সফল উদ্যোক্তা হওয়ার বাকি গল্পটা জানাচ্ছেন ফখরুদ্দিন মেহেদী।

সেলিয়া সুলতানাকে স্বাবলম্বী হবার বাসনা সব সময়ই তাড়িয়ে বেড়াতো। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন বুনতে থাকেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক কাজ শুরু করেন হস্তশিল্প নিয়ে।

মূলত দেশের ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি হস্তশিল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন। আর এই ভালোবাসাই আজ তাকে বানিয়ে তুলেছে সফল উদ্যোক্তা। তার স্বপ্ন-যাত্রা শুরু হয় ই-শপ গদিঘর দিয়ে।

seliya sultana 2

শুরুর কথা
ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ থেকে সেলিয়া ২০১০ সালে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স শেষ করেছেন। ঐ সময় নিজের বন্ধু-বান্ধবদের দেখেছেন পড়াশুনার শেষ করে একটা সরকারী চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরতে। কিন্তু তিনি আর ঐ পথে হাঁটেননি। বরং নিজেই চাকরি দেবার উদ্যোগ নেন। আর এ জন্য বেছে নেন দেশের ঐতিহ্য হস্তশিল্পকে।

সেলিয়া বলেন, নানান প্রতিকূলতা থাকায় অনেকে নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটা ত্যাগ করেন। পড়াশুনার শেষে কি করবো বা কি করবো না এ নিয়ে দ্বিধার দোলাচলে পড়েন। কিন্তু আমি এসবকে পাত্তা দেইনি। পাহাড় সমান প্রতিকূলতায় হতাশ না হয়ে ২০১২ সালে গড়ে তুলি ই-শপ ‘গদিঘর- নোভেলেট অব লাইফ ইন হ্যান্ডিক্র্যাফটস’।

গদিঘরের যাত্রা শুরু দুজনের হাত ধরে। এর মধ্যে একজন টেকনিক্যাল বিষয়গুলো তদারকি করতেন এবং অন্যজন যোগাযোগ মাধ্যম সামলাতেন।

সেজন্য আমি বলি, যারা গদিঘরের কাজে সম্পৃক্ত আছেন তারা প্রত্যেকেই এক একজন উদ্যোক্তা। তাদের নিয়েই গদিঘর।

পরামর্শ পেয়েছেন যাদের কাছে
শুরুর পর উদ্যোক্তা হবার আকাঙ্ক্ষা থেকে সেলিয়া বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) গ্রুপের মেম্বার হন। এখানেই তার স্বপ্ন পূরণের পরামর্শ পান তিনি। এখানে সারাদেশের নানান উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করার একটি রীতি চালু আছে, তাই পরামর্শের জন্য তার কাজ আটকে থাকেনি কোথাও।

যে কারণে বেছে নিলেন হস্তশিল্প
আশেপাশে এতো বিষয় থাকতে হস্তশিল্পকেই কেন বেছে নিলেন এমন প্রশ্ন করতেই সেলিয়া বলেন, প্রথমত, দেশ-ভেদে ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ইত্যাদি ভিন্ন হয়। এই ভিন্নতা প্রত্যকটা দেশের পরিচিতিকে আলাদাভাবে প্রকাশ করে। মূলত আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে আরেকটু এগিয়ে নিতেই হস্তশিল্প নিয়ে কাজ শুরু করি।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন হলো সেই মাধ্যম যার সাহায্যে মুহূর্তেই একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পণ্যের পরিচিতি তুলে ধরা যায়। হস্তশিল্পকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে গদিঘর এই মাধ্যমটিকে বেছে নেয়।
তৃতীয়ত, কোন দোকান বা আউটলেট না থাকলে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম রাখা যায়। তাই মূলধনের পরিমাণ কম হলেও প্রাথমিকভাবে এগিয়ে যেতে সমস্যা হয় না। এক্ষেত্রে হস্তশিল্প নিয়েই কাজ করাটা সব দিক থেকে সুবিধাজনক মনে হওয়ায় এটা নিয়ে কাজ শুরু করি।

seliya sultana

প্রতিবন্ধকতা
সেলিয়া বলেন, যে কোন কিছুর শুরুটা সবসময়ই কঠিন হয়ে থাকে। অনেকের চোখে পড়ার মতো কিছু করতে গেলে বড় আকারের মূলধন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার মৃত্যু হয়। যেহেতু ই- কমার্সের সাথে জড়িত বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই তরুণ, তাই স্বল্প মূলধন নিয়ে কাজ শুরু করলে একটা সময়ে তা তাল হারিয়ে ফেলে।
এর কারণ বলতে গিয়ে তিনি জানান, ই- কমার্সের উন্নয়নে আমাদের এখনো কোন নীতিমালা নেই। কম মূলধন নিয়ে কাজ শুরু করলেও কোন উদ্যোক্তা যদি পরিসর বড় করতে চায় তার জন্য নেই কোন অর্থনৈতিক স্কিম বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা। দেশে পে-পাল না থাকায় বিদেশী কাস্টমারদের কাছ থেকে অর্ডার নেওয়া বা টাকা উত্তোলনের সমস্যা তো আছেই।
এদিকে আবার ফেইক সাইট এবং ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে ই-কমার্সের নামে অনেকেই গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা করেই চলেছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাও বড় এক প্রতিবন্ধকতা।

বর্তমান অবস্থা
গদিঘরের বয়স তিন বছর হতে চললো। প্রতিষ্ঠানটি থেকে হস্তশিল্পের ১০ টি ক্যাটাগরির প্রায় ৪০ টি পণ্য বিক্রয় করা হয়। সারা দেশে প্রায় ৫০ জন লোক প্রতিষ্ঠানটির হয়ে কাজ করছেন।
সেলিয়া বলেন, সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হলো ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। তবে আপাতত দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করতে পারছি না।

প্রচারণা
প্রচারণার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেন সেলিয়া। এছাড়া গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও গ্রাহক আকৃষ্ট করার চেষ্টা আছে তার।

যে পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই
অনলাইনের সাহায্যে গদিঘরকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে চান সেলিয়া। সেজন্য নিজের প্রতিষ্ঠানটিকে আরেকটু বড় করতে চাইছেন তিনি। বাড়াতে চাইছেন এর লোকবলও।

নতুনদের জন্য পরামর্শ
সেলিয়ার মতে, আপনি যদি কাজটাকে ভালোবাসেন, তবে সফল হবেনই। ভালোবাসার পাশাপাশি থাকতে হবে কাজ করার ধৈর্য ও সফল হবার জেদ। শুরুতে চ্যালেঞ্জ আসবেই, কিন্তু ঘাবড়ে যাওয়া যাবে না।

*

*

আরও পড়ুন