প্রোগ্রামিংয়ের স্বপ্নপূরণে মুক্ত সফটওয়্যার ও দ্বিমিক কম্পিউটিং

Tamim_Sahriar_suben_techshohor

প্রোগ্রামিংয়ের টানে নিশ্চয়তার পথ ছেড়ে ঝুঁকি নিয়েছেন। শিক্ষকতা ও চাকরি ছেড়েছেন। গড়ে তুলেছেন মুক্ত সফটওয়্যার ও দ্বিমিক কম্পিউটিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। তরুন এক প্রোগ্রামারের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কথা জানাচ্ছেন ফখরুদ্দিন মেহেদী।

তামিম শাহরিয়ার সুবিন পেশায় একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী। ২০০৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাশ করেন। ক্যারিয়ারের শুরুটা অন্যের প্রতিষ্ঠানে হলেও এখন নিজেই গড়ে তুলেছেন দুটি উদ্যোগ।

মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দ্বিমিক কম্পিউটিংয়ের ম্যানেজিং পার্টনার এ তরুন উদ্যোক্তার ধ্যানজ্ঞান সব প্রোগ্রামিংকে ঘিরে। পরিশ্রম ও কাজের স্বীকৃতি মিললেও থেমে থাকেননি তিনি। প্রোগ্রামিংকে সহজ ও জনপ্রিয় করে তুলতে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।

tamim_sahriar_suben_techshohor

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরে সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। তবে কোনো কাজেই তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আরও ভালো অন্যরকম নতুন কিছুর তাগিদ অনুভব করতেন। সেই তাড়না থেকেই নিজেদের মতো করে কিছু করতে কাজে নেমে পড়েন।

নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঙ্গীও পেয়ে যান। ২০০৯ সালে মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড।

শুরুর কয়েক বছর আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে মুক্ত সফটওয়্যার। এখন বিদেশের জন্য সফটওয়্যার বানানোর চেয়ে স্থানীয় মার্কেটের জন্য পণ্য তৈরিতে অধিক মনযোগী হচ্ছেন। নিজেদের জন্য নিজেদের কিছু করতে কাজ করছেন তরুন প্রোগ্রামারদের এ দলটি।

সফটওয়্যার তৈরির এ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে নেওয়ার পথে নতুন ভাবনা উঁকি দিতে শুরু করে তরুন উদ্যোক্তা সুবিনের মাথায়। নবীনদের প্রোগ্রামিংয়ে উৎসাহিত করতে ২০১৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধে তাহমিদ রাফিকে নিয়ে শুরু করেন দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল। এ ই-লার্নিং প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তির নানা বিষয়ে বাংলায় অনলাইন কোর্স তৈরি করা হয়।

tamim_sahriar_suben_techshohor

শুধু নিজের দুই উদ্যোগের মধ্যে থেমে থাকেনি প্রোগ্রামার সুবিনের কার্যক্রম। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। গণিতের পাশাপাশি প্রোগ্রামিং শেখানোর ইচ্ছে ছিল অনেক আগে থেকেই। সেই ভাবনার আলোকে বাংলায় লেখেন ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামিং’ নামের একটি বই।

প্রোগ্রামিং শিক্ষার্থীদের কাছে বইটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। অন্যরকম প্রকাশনী থেকে এটির নতুন সংস্করণও বের হয় ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ১ম খন্ড’ নামে।

এ ছাড়া তাঁর ব্লগের (http://blog.subeen.com) মাধ্যমেও নতুন প্রজন্মের প্রোগ্রামারদের উৎসাহিত করছেন ও প্রোগ্রামিং বিষয়ক তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

উদ্যোগের শুরুর কথা
এক সময় রেন্ট-এ-কোডার নামে মার্কেটপ্লেসে কাজ করতেন সুবিন। সেখানে দুই বছর কাজ করার পরে কিছু টাকা ও সাহস সঞ্চয় করে নিজের একটি সফটওয়ার কোম্পানি খোলার পরিকল্পনা করেন। সেই ভাবনার পরিকল্পিত বাস্তবায়ন হলো ‘মুক্ত সফটওয়্যার’।

প্রথম এক বছর এ কাজের অংশীদার মাহমুদ কোম্পানির কার্যক্রম দেখাশোনা করতেন। তখন সুবিন প্লেডমের ঢাকা অফিসে কাজ করতেন। ২০১০ সালের জুন থেকে ফুলটাইম মুক্ত সফটে প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ শুরু করেন তরুন এ উদ্যোক্তা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আবার মাহমুদের হাতে কোম্পানি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলে মনোনিবেশ করেন তিনি। মাহমুদ বর্তমানে মুক্তসফটের সিইও।

প্রথম দিকের কথা
মুক্তসফটের শুরুতে একটা ছোট অফিস ছিল সুবিনদের। যেখানে মাহমুদ ও অন্য কয়েকজন প্রোগ্রামার কাজ করতেন। ছুটির দিনে সুবিন তাদের সঙ্গে যোগ দিতেন। তার কাজ ছিল মূলত প্রজেক্ট সংগ্রহ করা। তিনি কাজ জোগাড় করতেন ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলো থেকে। পরে বেশ কিছু ক্লায়েন্ট নিয়মিত কাজ দেওয়া শুরু করেন। পুরনো ক্লায়েন্টদের রেফারেন্সের মাধ্যমেও কাজ আসতো বলে জানান তিনি।

সুবিনদের সঙ্গে পরে যোগ দেন তাহমিদ রাফি। বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাশ করা এ প্রকৌশলী প্রথমে মুক্তসফটে যোগ দেন। পরে দ্বিমিকের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন।

tamim_sahriar_suben_techshohor

দ্বিমিকের শুরুর দিকের অনলাইন কোর্সগুলো ইন্টারনেটে সবার জন্য বিনামূল্যে দেওয়া আছে। প্রোগ্রামিংয়ের হাতেখড়ি, ওয়েব কনসেপ্টস এবং ডিসক্রিট ম্যাথমেটিক্স এ তিনটি বিষয়ের অনলাইন কোর্স পুরোপুরি আছে।

এ ছাড়া পাইথন পরিচিতি নামে পাইথন শেখার ডিভিডিও বের করেছে দ্বিমিক। অচিরেই ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং ১’ নামের একটি কোর্স শুরু হতে যাচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। থেরাপ সার্ভিসেস লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে ‘এন্টারপ্রাইজ জাভা-১’ নামে একটি কোর্সও তৈরির কাজ চলছে বলে জানান সুবিন। আরও কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে অনলাইন কোর্স তৈরির জন্য আলোচনা চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এগিয়ে যাওয়ার গল্প
২০১২ ও ২০১৩ সালের দিকে আউটসোর্সিং কাজ কমিয়ে দিয়ে স্থানীয় সফটওয়্যার তৈরিতে মনোযোগ দেয় তরুন প্রোগ্রামারদের এ দল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে বিআইডব্লিউটিএ’র জন্য ওয়েব বেজড ডাটাবেজ তৈরি করে মুক্তসফট।

এরপর ২০১৪ সালে গ্ল্যাক্সো স্মিথক্লায়েনের (জিএসকে) জন্য সেলস অটোমেশনের একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়, যেটি পরে বাজারেও ছাড়া হয়। প্রোডাক্টটির নাম হচ্ছে মুক্ত আরএমএস (RMS -> Representative Mobility Solution)। বর্তমানে বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে অটোমেশনের কাজ করছে মুক্ত সফট।

অন্যদিকে দ্বিমিকের কোর্সগুলো এমনভাবে বাছাই ও তৈরি করার পরিকল্পনা করেছেন যেন প্রোগ্রামে আগ্রহীরা এগুলো সম্পন্ন করে দেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে পারে কিংবা নিজেই আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে পারে। তবে সেটা তিন বা ছয় মাসে সম্ভব নয় বরং দেড়-দুবছর সময় দিলে শিক্ষার্থীরা যোগ্য হয়ে উঠবে বলে মনে করেন সুবিন।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের থেকে ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছে দ্বিমিক স্কুল। সামনের দিনগুলোতে বিনামূল্যের কোর্সগুলোর পাশাপাশি ‘পেইড’ কোর্স পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।

Tamim_Sahriar_suben_techshohor

প্রচারণা
দ্বিমিকের প্রচারণার কাজ চলে মূলত সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। বেশিরভাগ সময় শিক্ষার্থীরাই এ কাজ করে দেয় তাদের হয়ে। কমিউনিটিতে মুখে মুখে প্রচারণারও সুবিধা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন সুবিন।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা
তরুন এ উদ্যোক্তার স্বপ্ন অনেকটা পূরণ হতে চলেছে। তার কম্পিউটার প্রোগ্রাম বইটি প্রোগ্রামিংয়ে আগ্রহীদের জন্য হাতেখড়ি হিসাবে বেশ কাজে দিচ্ছে। পাঁচ-দশ বছর পরে দেশের অধিকাংশ তরুন সফটওয়্যার নির্মাতা দ্বিমিকের কোর্সগুলো থেকে উপকার পেয়েছে বলে স্বীকার করবে এমনটাই বিশ্বাস করেন সুবিন। এজন্য নিরলস কাজ করে চলেছেন তারা।

একই সঙ্গে স্থানীয় সফটওয়্যার শিল্পে বড় আবদান রাখার স্বপ্ন পূরণেও কাজ করবে মুক্ত সফটওয়্যার।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ
শখের বশে যারা উদ্যোক্তা হতে চান তাদের নিরুৎসাহিত করেছেন তরুন এ প্রোগ্রামার। তার মতে, শখ করে আসলে খুব বড় কিছু করা যায় না। যারা সমস্যা সমাধানের সংকল্প থেকে উদ্যোক্তা হয়, তারাই সফল হয়। আগ্রহীদের জনসমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলেন তিনি।

একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের পরিশ্রমী হওয়ার পাশাপাপিশ সৎ সাহসের সঙ্গে পড়ুয়া, মিতব্যায়ী ও স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হবার পরামর্শ দেন সুবিন।

যোগাযোগ
muktosoft.com ([email protected])
dimikcomputing.com ([email protected])
subeen.com ([email protected])

২ টি মতামত

*

*

আরও পড়ুন