বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনে মুগ্ধতা ছড়ালেন অ্যানালাইজেনের রিদওয়ান

বিশ্বের তাবৎ উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন ‘বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনে’ অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েই ঘোরের মধ্যে ছিলেন। তারওপর ছয় হাজারের মধ্যে সংক্ষিপ্ত ১২-তে অ্যানালাইজেনের অবস্থানে অভিভূত রিদওয়ান হাফিজের মরক্কো জয়ের গল্প শোনাচ্ছেন সাইমুম সাদ।

বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনের (জিইএস) এবারের আসর বসেছিল মরক্কোতে ১৯-২০ নভেম্বর। প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে ৬ হাজার উদ্যোক্তার এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোগ অ্যানালাইজেনের উদ্যোক্তা রিদওয়ান হাফিজ।

সম্মেলনে যোগ দেওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু নাটকীয়তার মুখোমুখি হয়েছেন তরুন এ উদ্যোক্তা। ফিরে আসার পর টেকশহরডটকমকে সে গল্পই বলেছেন তিনি।

ridwan

যেভাবে উদ্যোক্তা সম্মেলনে
বেশ কিছু দিন আগে আগে নেট ঘেঁটেঘুঁটে বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনের সাইটে যান রিদওয়ান। সম্মেলনে যোগ দেয়ার লালিত স্বপ্ন নিয়ে আবেদন করতেই সাইটটিতে ঢুঁ মারা। কিন্তু যখন দেখলেন, আবেদন করতে লাগবে ১০০ ডলার, তখন দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কেননা অলাইনে পেমেন্ট করার জন্য ভিসা কার্ড নেই। এত অল্প সময়ে তা সংগ্রহও করা যাবে না। তখনই উবে গেল সেই স্বপ্ন।

তবে এর পরের ঘটনা তরুণ এ উদ্যোক্তার কাছে স্বপ্নের মতো, নাটকীয়ও বটে। কেননা সম্মেলনের ঠিক তিন দিন আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে রিদওয়ানের নাম্বারে ফোন ‘আপনাকে মারকেশ যেতে হবে’!

হঠাৎ মারকেশ! তরুন এ উদ্যোক্তা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। মরক্কোর এ শহরটা সম্বন্ধে খানিকটা জানতেন তিনি। তবুও কৌতূহল বশত নেটে সার্চ দিলেন। ভাবলেন, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কোনো কাজের জন্য হয়ত এ প্রস্তাব। কিন্তু যখন শুনলেন, তিনি বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন তখন তার চোখ ছানাবড়া হওয়ার অবস্থা।

Marrakech-to-host-5th-Global-Entrepreneurship-Summit

এখানেই শেষ নয়, পরদিনই ফ্লাইট! হঠাৎ পাওয়া এ সুযোগ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। বিশ্বাস করবেনই বা কিভাবে, তিনি তো উদ্যোক্তা সম্মেলনে আবেদনই করেননি!

পরে জানলেন, মাস খানেক আগে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহায়তায় রিদওয়ান বাঙ্গালোরে সাউথ এশিয়ান ইয়াং ইন্টারপ্রনিয়র সামিটে অংশ নিয়েছিলেন। তখন তার প্রোফাইলটা দূতাবাস রেখে দেয়। এরপর তাকে না জানিয়েই দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনে আবেদন করে রাখে। তরুণ এ উদ্যোক্তার প্রোফাইল দেখে আয়োজকরা তাকে সম্মেলনে যোগদানের জন্য মনোনয়ন দেন।

সেরার সেরা রিদওয়ান
সম্মেলনে অংশ নেয়া ৬ হাজারেরও বেশি উদ্যোক্তাদের পেছনে ফেলে সেরা ১২ জন তরুণ উদ্যোক্তার তালিকায় ঠাঁই পান রিদওয়ান। ২০ নভেম্বর বিশ্বসেরা এসব তরুণ উদ্যোক্তা তাদের জীবনের টানা-পোড়েনের গল্প শোনানোর সুযোগ পান।

উদ্যোক্তাদের প্রোফাইল থেকে সেরা ১২ নির্বাচন করে আয়োজক ও মার্কিন দূতাবাস বলে জানান রিদওয়ান। এ সুযোগের কথা জানতে পেরে যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি, তেমনি অভিভূত হয়ে পড়েন।

অনুষ্ঠানের শেষের দিকে মঞ্চে উঠেন রিদওয়ান। এখানেও ছিল এক নাটকীয়তা। কথা ছিল তিন মিনিটের মধ্যেই বক্তব্য শেষ করবেন তিনি। অন্যরাও তাই করেছেন।

দুরুদরু বুকে হাজার হাজার উদ্যোক্তার সামনে নিজের জীবনের গল্প শুরু করলেন এ উদ্যোক্তা। সামনে কয়েক হাজার দর্শক মুগ্ধ হয়ে তা শুনছেন। কিন্তু মিনিট তিনেক পর দেখা গেল আয়োজকরা তাকে থামানোর চেষ্টা করছেন।

কিন্তু তখনও তার অর্ধেক কথাই শেষ হয়নি! এদিকে, দর্শকরা হাততালি দিয়ে জানান দিলেন, আমরা রিদওয়ানের গল্প পুরোটাই শুনতে চাই, তাকে আরও বলার সুযোগ দেয়া হোক।

দর্শকদের চাওয়া অনুযায়ী এরপর পুরো অনুষ্ঠানে শুধু রিদওয়ানকেই তিন মিনিটের বেশি সুযোগ দেয়া হয়। বক্তব্য শেষে দর্শকরা হাততালি দিয়ে তাকে ও বাংলাদেশকে অভিবাদন জানান। বক্তব্যের পর অনেকেই তার সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

analyzen-ridwan-techshohor

রিদওয়ানে মুগ্ধ জো বাইডেন
সম্মেলনে স্বপ্নের মতো কাটলো রিদওয়ানের পুরোটা সময়। সম্মেলনে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে দেখা করা ও কথা বলার সুযোগ পেলেন। অবশ্য এই সুযোগটা কেবল রিদওয়ানই নয়, বিশ্বের সফল ১২ জন উদ্যোক্তাও পেয়েছেন। আড্ডার ছলে প্রায় ঘণ্টা খানেক চলে সে বৈঠক।

এখানেও খানিকটা বাড়তি মনোযোগ লাভ করে বাংলাদেশের এ তরুন তুর্কি। বাইডেন তাকেই প্রশ্ন করলেন বেশি। একের পর এক প্রশ্নে জানতে চাইলেন এ দেশের উদ্যোক্তাদের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো।

রিদওয়ান তাকে জানালেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থ। এরপর আছে ব্যাংক ঋণসহ নানা প্রতিবন্ধকতা। রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যা। তবে বড় বাধা বাংলাদেশের সমাজে উদ্যোক্তা হিসাবে উদ্যোগ গ্রহণকে খুব বেশি সমর্থন দেওয়া হয় না।

এসব শুনে বিস্মিত বাইডেন পাল্টা প্রশ্ন করলেন, এত চ্যালেঞ্জের পরও আপনি উদ্যোক্তা হলেন কেন? এর জবাবে তরুন এ উদ্যোক্তা বলেন, “বাংলাদেশে কিছুই নেই বলে অনেকের ভুল ধারনা রয়েছে। তবে আমার মতে কিছু না থাকার মধ্যেই আসলে অনেক কিছু করার আছে। সেই ভাবনা থেকে শুরু এ উদ্যোগের।” এ উত্তরে সন্তুষ্ট মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট তার পিঠ চাপড়িয়ে জানালেন, লেগে থাকো!

ওয়াশিংটন পোস্টের মুখোমুখি
এরপর এলো বিশ্বের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে সাক্ষাৎকার দেয়ার সুযোগ। ভেন্যুর মিডিয়া সেন্টারে রিদওয়ানের সঙ্গে কথা বললেন ওয়াশিংটন পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার ক্যারেল ডি ইয়াং। বর্তমান কাজ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কাজের পথে চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি নিয়ে অনেক বলেন তিনি।

Screenshot_1

টিম অ্যানালাইজেন
অ্যানালাইজেন ডটকম হলো সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও মোবাইল সফটওয়্যার তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান।

এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনলাইন মার্কেটিংয়ের কাজ করে। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপস তৈরি করেও অল্প সময়েই বেশ সুনাম করেছে।

২০০৮ সালে রিদওয়ান হাফিজ ও তার বন্ধু সুমিতের হাত ধরে অ্যানালাইজিনের যাত্রা শুরু হয়। মজার ব্যাপার হলো প্রতিষ্ঠানটিতে গতানুগতিক কোন পদবী নেই।

এখানে ডিরেক্টর, ম্যানেজিং ডিরেক্টর নেই। এখানে কেউ ব্যাটমান, কেউ পিপলস চ্যাম্প, ম্যান অব স্টিল, অ্যামাজিং স্পাইডারম্যান।

analyzen-techshohor

এমন অদ্ভুত পদবীর কারণটাও ব্যাখ্যা করলেন আনালাইজেনের পিপলস চ্যাম্প রিদওয়ান হাফিজ, ‘আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিষ্ঠানের সবাই সমান। কারণ আমাদের কাজটা আইডিয়া নিয়ে। ‘

ব্যতিক্রমী সব আইডিয়ার বদৌলতে টিমটির ঝুলিতে আছে স্যামসাংয়ের অনলাইন কমেডি শো রেক্সপোসড (এসডুওসড) ফেইসবুক মার্কেটিং গ্র্যান্ড উইশের সাফল্য।

এ কাজ দুটি অ্যানালাইজেনকে সিঙ্গাপুরের ওয়ার্ল্ড ব্র্যান্ড কংগ্রেসে বেস্ট প্রাকটিস ইন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং অ্যাওয়ার্ড এনে দেয়।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি স্যামসাং, ইইনিলভার, এলজি, ডেল ও বাংলালিংকসহ ৫৮ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।

এক নজরে বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলন
আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হাত ধরে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে বিশ্ব উদ্যোক্তাদের তীর্থভূমি বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলন। প্রথম সম্মেলন বসেছিল ওয়াশিংটনে।

এরপর পরপর পাঁচবছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সম্মেলনটি। বিশ্বের লাখ লাখ উদ্যোক্তা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু সবার ভাগ্যের শিকা ছিড়ে না। শুধু নির্বাচিত উদ্যোক্তারাই অংশগ্রহণের সুযোগ পান।

এবারের সম্মেলনটি বসে মরক্কোতে। বিশ্বের ৭০টি দেশের ৬ হাজার উদ্যোক্তা এতে যোগ দেন।

আরও পড়ুন 

ভার্চুয়াল বাজার : দেশে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কোম্পানি ৫০ ছাড়িয়ে

*

*

আরও পড়ুন