কোডিং দিয়ে জীবন বদলের দুই প্রকল্প

মাইক্রোসফট-বিশ্ব-ব্যাংক-কোডিং-প্রতিযোগিতা-পুরস্কার-টেকশহর
Evaly in News page (Banner-2)

ফখরুদ্দিন মেহেদী, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : আর্থিক অনটনে মুহাইমিনের পড়াশোনা আটকে গিয়েছিল সপ্তম শ্রেণীতেই। এরপর হয়ত হাজারো শিশুর মতো তিনিও হয়ত হারিয়ে যেতেন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা ও জানার প্রচন্ড আগ্রহ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নিজের চেষ্টায় এগিয়ে চলেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই মাইক্রোসফট ও বিশ্বব্যাংকের ‘কোডিং ইউর অপরচুনিটি’ প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

সার্কের তিন দেশের সঙ্গে স্বদেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে বিজয়ী মুহাইমিন খান আবেগ তাড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি হয়তো ঝড়ে পড়াদের দলেই শামিল হতাম। কিন্তু কম্পিউটার নিয়ে আমার আগ্রহের সীমা ছিল না। সারাদিন কাটত কম্পিউটারের জগতের মধ্যে। ইন্টারনেটে ঘেটে বেড়াতাম সারা দুনিয়ায় কোথায় কি আছে। নিজে থেকেই আয়ের পথ তৈরি করেছি। নিজের রোজগারে ও লেভেল শেষ করেছি, এখন এ লেভেল পড়ছি।”

মাইক্রোসফট ও বিশ্বব্যাংকের যৌথভাবে আয়োজিত এ কোডিং প্রতিযোগীতায় মুহাইমিন ও তার সহযোগী সুমন সেলিমের দল বেটার স্টোরিজ লিমিটেডের প্রকল্পটির নাম ‘কোডিং ইউর ওয়ে আউট অব প্রোভার্টি। মূলত পথশিশু বা বস্তিতে বসবাস করা শিশু-কিশোরদের কম্পিউটারের বেসিক ও কোডিং শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

মাইক্রোসফট-বিশ্ব-ব্যাংক-কোডিং-প্রতিযোগিতা-পুরস্কার-টেকশহর

গত জুন-জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতার প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশের ২০ প্রতিষ্ঠান দলগতভাবে অংশ নিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে মুহাইমিন ও সুমনের বেটার স্টোরিজ লিমিটেডসহ চারটি দল আঞ্চলিক পর্যায়ের ফাইনাল রাউন্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। আঞ্চলিক পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিযোগীতায় সাত দলের মধ্যে বাংলাদেশের দুটি ও নেপালের দুটি দল জয়ী হয়।

জয়ী দল কোডিং বিষয়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১০ হাজার ডলার অনুদান পেয়েছেন। কর্মসংস্থানমুখী প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারে এ কোডিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে মাইক্রোসফট ও বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার তরুন-তরুনীদের নিয়ে কাজ করছে এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে আইডিয়া আহ্বান করা হয়েছিল।

জয়ী দল বেটার স্টোরিজ লিমিটেডের এ তরুনদের প্রকল্পের মডিউল ছিল, তারা পাঁচজন কোডারকে জোগাড় করবেন- যারা ১০ ভিন্ন এলাকায় গিয়ে ১০ জন ছেলেমেয়েকে কম্পিউটিং এবং কোডিংয়ের বেসিক শেখাবেন। এরপর ওই ১০ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে আরও ১০০ জন জোগাড় করে তাদের কোডিং শেখানো হবে।

এভাবে ক্রমান্বয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। তার এই আইডিয়াটিই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে মাইক্রোসফট ও বিশ্বব্যাংকের বিচারকদের কাছে।

কোডিং-মুহাইমেন-মাইক্রোসফট-বিশ্বব্যাংক-বাংলাদেশ-টেকশহর

প্রকল্পটি সম্পর্কে মুহাইমিন বলেন, আসলে দরিদ্রদের সারাজীবন দরিদ্র করে রাখা হয়। তাদের নিয়ে কেই বড় পরিকল্পনা করতে সাহস করে না। দেশের বড় বড় প্রকল্পের আওতায় কোটি কোটি টাকা করচ করা হলেও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কিছু করা হয় না।

একটি রাস্তার ছেলের পিছনে ১০০ ডলার খরচ করা হলে তার জীবন বদলে দেওয়া যায় বলে মনে করেন তিনি। পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর চোখে কোডার হওয়ার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানে ফান্ডের জন্য আবেদন করবেন বলে জানান তৃণমূল থেকে উঠে আসা এ তরুণ।

মুহাইমিন খান ‘বিজ ক্যাফে’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এটি ষ্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেন্টর এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযুক্ত করিয়ে দেওয়ার কাজ করে।

অন্যদিকে বাংলায় ভিডিও কনটেন্ট তৈরির প্রকল্প উপস্থাপন করে কোডিং প্রতিযোগিতায় রানার আপ হয়েছে বাংলাদেশের ড্রিম ডোর সফট লিমিটেড। এ দলে ছিলেন ড. মোহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম ও তার সহযোগী মো: সাদেকুর রহমান।

এ প্রকল্পের আওতায় প্রোগ্রামিং বা কোডিং শিখতে আগ্রহীদের জন্য বাংলায় ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করা হবে। দেশের সব শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে কোডিং শিখতে হয় যা অনেকের কাছে বোধগম্য হয় না। তাই স্বদেশি ভাষার কনটেন্ট দিয়ে শেখানোর ভাবনা থেকে এ প্রকল্প তৈরি করেন তারা।

কোডিং-আনোয়ারর-মাইক্রোসফট-বিশ্বব্যাংক-বাংলাদেশ-টেকশহর

এটির বাস্তাবয়ন হলে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মনে করেন এ দলের দুই সদস্য। ড. সালাম টেকশহর ডটকমকে জানান, জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিজ ভাষায় কোডিং বা প্রোগামিং শেখানো হয়। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ইংরেজিতে কোডিং শেখানো হয়। এ কারণে দেশের বেশিরভাগ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীও ভালো করে কোডিং বা প্রোগ্রামিং শিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বের হতে পারে না। এমনকি তার কর্মস্থলে গিয়েও বিপদে পড়েন। এর কারণ ইংরেজিতে দুর্বলতা।

এ প্রকৌশলী বলেন, তাদের প্রকল্পের আওতায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কিল আপ করার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। বাংলা কনটেন্ট থেকে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পারে এটা পরিমাপ করার জন্যই মূলত এ আয়োজন করা হবে। এ জন্য তারা তহবিল যোগাতে বেসিস ও বিসিসির সহায়তা চাইবেন বলে জানান।

ড. সালাম ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক পাশ করার পর টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ইলেক্ট্রা কমিউনিকেশন থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছেন। বর্তমানে তিনি গুগল বাংলাদেশের কান্ট্রি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

*

*

আরও পড়ুন