চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অস্ত্র ‘ইডিএ’

টেকশহর কনটেন্ট কাউন্সিলর: যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বিবাদ কি কখনো থামবে? মনে হয় না। এই যেমন প্রযুক্তি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য যুদ্ধে নতুন ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ইলেক্ট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ)। এই ইডিএ হচ্ছে খুবই ছোট একটি সফটওয়্যার যা সেমিকন্ডাক্টরের সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য অত্যাবশকীয় অংশ।

১২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক ঘোষণায় সুনির্দিষ্ট কিছু ইডিএ টুলসের ওপর বহুপাক্ষিক রফতানি নিয়ন্ত্রন ঘোষণা করা হয়। চীন এবং আরো দেড় শতাধিক দেশকে বিশেষভাবে পাওয়া লাইসেন্স ছাড়া ইডিএ পণ্য থেকে ব্লক করা হয়।

মাত্র তিনটি পশ্চিমা কোম্পানি ইডিএ ব্যবসার বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রন করছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই শক্তিশালী পয়েন্ট। আর এ কারনেই চিপ তৈরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টুল লিথোগ্রাফি মেশিনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। আর যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হয়ে উঠা এই শিল্প থেকে বেরিয়ে চীন এখন নিজেরাই বিকল্প সফটওয়্যার তৈরির চিন্তাভাবনা করছে।

Techshohor Youtube

ইডিএ কি?

একটা সময় ছিল যখন কম্পিউটার চিপ হাতে তৈরি করতে হতো। সত্তরের দশকের দিকে চিপে হাজার হাজার ট্রানজিটর থাকতো। বর্তমান যুগে কোটি কোটি। আর এ কারনেই এসব নকশার চিপ হাতে তৈরি করা রীতিমতো অসম্ভব। এমন পরিস্থিতিতেই এসেছে ইলেক্ট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন বা ইডিএ (যা ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারের মাধ্যমে করা ডিজাইন; যা ইসিএডি নামেও পরিচিত)। এটি এমন একটি ক্যাটাগরির টুল যা ইলেক্ট্রিক্যল ইঞ্জিনিয়ারদেরকে জটিলতম চিপগুলো তৈরিতে সাহায্য করে। স্থপতিদের ব্যবহার করা সিএডি সফটওয়্যারের মতো এটি অনেকটা। তবে সিএডির তুলনায় এই সফটওয়্যারটি আরো সংবেদনশীল কারন এটিকে সমন্বিত সার্কিটের ভেতরে কোটি কোটি মাইনাসকুল ট্রানজিটরের সঙ্গে কাজ করতে হয়।

প্রযুক্তিশিল্পের সেরা প্রতিনিধিত্ব করবে এমন কোন একক আধিপত্যশীল সফটওয়্যার নেই। বরং নকশার সামগ্রিক চক্রে সফটওয়্যার মডিউলের একটি সিরিজ ব্যবহার করা হয়। যেমন-লজিক ডিজাইন, ডিবাগিং, যন্ত্রাংশ সংযোজন, ওয়্যার রাউটিং, সময়ের ব্যবহার, বিদ্যুৎ ব্যবহার, ভেরিফিকেশন ইত্যাদি। আধুনিক যুগের চিপগুলো অনেক জটিল হওয়ার কারনে এটি তৈরির প্রতিটি পদক্ষেপে ভিন্ন ভিন্ন সফটওয়্যার টুল প্রয়োজন হয়।

চিপ তৈরির ক্ষেত্রে ইডিএ কেন গুরুত্বপূর্ণ ?

গত বছর বৈশ্বিক ইডিএ বাজারের আর্থিক মূল্যমান ছিলো প্রায় ১০ বিলিয়নন ডলার। যা ৫৯৫ বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর বাজারের খুবই ছোট একটি অংশ। কিন্তু এরপরেও ইডিএ সাপ্লাই চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিপ ডিজাইন এবং ইডিএ শিল্পে ৪০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন মাইক ডেমলার। তিনি বলেছেন, সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমকে একটি ত্রিভুজ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ত্রিভুজের এক কোনায় থাকবে প্রতিষ্ঠাতা অথবা টিএসএমসির মতো চিপ ম্যানুফ্যাকচারাস, আরেক প্রান্তে এআরএমের মতো মেধাসম্পদ কোম্পানি যা পুনঃব্যবহারযোগ্য ডিজাইন ইউনিট অথবা লেআউট তৈরি এবং বিক্রি করে এবং ত্রিভুজের তিনন্বর প্রান্তে থাকবে ইডিএ টুল। এই তিনটি প্রান্ত মিলে সরবরাহ শৃঙ্খল মসৃনভাবে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

নাম শুনে মনে হতে পারে ইডিএ টুলগুলো শুধুমাত্র চিপ নকশাকারী কোম্পানিগুলোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎপাদন শুরুর আগেই নকশাটি করা সম্ভব কিনা যা যাচাইয়ের জন্যও ইডিএ ব্যবহার করে থাকে চিপ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রটোটাইপ হিসেবে একটি চিপ তৈরি করার কোন উপায় নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় এবং একই সেমিকন্ডাক্টর বেজের ওপরে শত শত চিপ তৈরি হয়। ফলে নকশায় ত্রুটি থাকলে বিশাল অপচয় ও বর্জ্য সৃষ্টি হবে। আর তাই ম্যানুফ্যাকচারারা তাদের নিজস্বতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ ধরনের ইডিএ টুলের উপর নির্ভর করে।

ইডিএ শিল্পে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি কোনগুলো?

চিপ তৈরির প্রতিটি প্রক্রিয়ার জন্য সফটওয়্যার বিক্রি করে এমন কোম্পানির সংখ্যা হাতে গোনা। কিন্তু এই কয়েকটি কোম্পানিই দশকের পর দশক ধরে এই বাজারে আধিপত্য করছে। এরমধ্যে শীর্ষ তিনটি কোম্পানি হচ্ছে ক্যাডেন্স (যুক্তরাষ্ট্রের), সিনোপসিস (যুক্তরাষ্ট্রের) এবং মেন্টর গ্রাফিকস (যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কিন্তু ২০১৭ সালে জার্মান কোম্পানি সিমেন্স এটিকে কিনে নিয়েছে)। এই কোম্পানি তিনটি বৈশ্বিক ইডিএ বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। এদের আধিপত্য এতোটাই শক্তিশালী যে অনেক স্টার্টআপই ব্যবসা শুরুর পর এই কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি হতে বাধ্য হয়েছে।

চীনে ইডিএ রফতানি সীমিত করতে কি পদক্ষেপ নিচ্ছে মার্কিন সরকার?

ইডিএ শিল্পে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সুবিশাল প্রভাবের কারনে এখানে চীনকে কোনঠাসা করে ফেলা খুব সহজ হয়েছে মার্কিন সরকারের জন্য। দেশটির পক্ষ থেকে দেয়া সর্বশেষ ঘোষণায় রফতানি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন প্রযুক্তি পণ্যের তালিকায় নির্দিষ্ট ইডিএ পণ্যগুলো রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই বিধিনিষেধগুলো বাস্তবায়নে জার্মানিসহ আরো ৪১টি দেশের সঙ্গে সমন্বয় করবে যুক্তরাষ্ট্র।

রফতানি বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত হতে যাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে জিএএএফইটি ( গেট-অল-অ্যারাউন্ড ফিল্ড,ইফেক্ট ট্রানজিটর) আর্কিটেকচারে ব্যবহৃত টুলগুলো রয়েছে। এটি বর্তমানের সবচেয়ে আধুনিক সার্টিক স্ট্যাকচার; বর্তমানের আধুনকি চিপ এবং ভবিষ্যতে আরো উন্নত চিপ নির্মাণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এখানেই থেমে নেই। এই বিশেষ কাঠামো নির্মাণের জন্য কোন ইডিএ সফটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ তা বের করতে জনমত সংগ্রহ করছে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রনালয়; মতামত নেয়ার পর এই টুলগুলোও তালিকাভুক্ত করা হবে।

চীনের হার্ডওয়্যার জায়ান্ট হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে একইভাবে ২০১৯ সালে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল; সেসময় কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সবধরনের ইডিএ টুলের অ্যাকসেস হারায়। রফতানি নিয়ন্ত্রনকে বাণিজ্যযুদ্ধের একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে ট্রাম্প প্রশাসনের দেখানো পথ অব্যাহতভাবে অনুসরন করে যাচ্ছে বর্তমানের বাইডেন প্রশাসন। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক শিয়াওমেং লু বলেছেন, ‘এরআগে হুয়াওয়ের উপর তাদের দেয়া বিধিনিষেধ সফল হওয়ার কারনে তারা এটি অনুসরন করার পথ খোঁজে পেয়েছে।’

চীন কিভাবে প্রভাবিত হবে?

স্বল্প মেয়াদে চীন খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারন চীনের কোম্পানিগুলো এখনো এতোটা আধুনিক হয় নি যে তারা জিএএএফইটি স্ট্র্যাকচার প্রয়োজন হবে এমন ধরনের চিপ তৈরি করতে পারে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার অর্থ চীনের চিপ ডিজাইনের কোম্পানিগুলো অত্যাধুনিক টুলগুলোর অ্যাকসেস পাবে না এবং সময়ের সাথে সাথে এসব কোম্পানি ক্রমে পিছিয়ে পড়বে।

এছাড়াও সফটওয়্যার রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সঙ্গে লিথোগ্রাফি মেশিনের মতো ভারী হার্ডওয়্যারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। কারন এ ধরনের পণ্য চোরাকারবারের মাধ্যমে চীনে প্রবেশ অসম্ভব। ইডিএ সফটওয়্যার টুলগুলো অনলাইনে বন্টন হওয়ার কারনে এগুলো পাইরেট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তবে এরইধ্যে ক্রয় করেছে এমন ইডিএ সফটওয়্যারগুলোও চীনের কাছে আসা আটকে যেতে পারে। ফলে সবমিলিয়ে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধটি চীনকে কতটুকো ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা এই মুহুর্তে বলা মুস্কিল।

চীন ইডিএ নিয়ে কি কাজ করছে?

স্থানীয়ভাবেই বিকল্প তৈরির বিষয়টি চীন খুব ধীরে ধীরে বোঝতে পারছে। দেশটির সর্বশেষ পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় সেমিকন্ডাক্টও ইন্ডাস্ট্রিতে ইডিএকে খুব চাহিদা সম্পন্ন পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই পণ্যের উন্নয়ন ও গবেষণা ক্ষেত্রে সরকার আরো অর্থ ব্যয় করবে।

চীনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা সেমিকন্ডাক্টর তহবিল ২০১৮ সালে চীনের ইডিএ কোম্পানি হাওদা এম্প্রিয়ানে বিনিয়োগ করে। এছাড়া চীনে ইডিএ নিয়ে নতুন নতুন স্টার্ট আপও শুরু হচ্ছে। এসব উদ্যেগের একটি বড় অংশের নের্তৃত্ব দিচ্ছে ক্যাডেন্স অথবা সিনোপসিসে কাজ করেছেন এমন চীনা কর্মীরা।

ইডিএর স্থানীয় বিকল্প তৈরি করা চীনের জন্য খুব কঠিন কি?

চীনের খুব প্রানবন্ত সফটওয়্যার শিল্প রয়েছে; যারা টেনসেন্টের উইচ্যাট এবং আলিবাবার আলিপের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি অ্যাপ তৈরি করেছে।

তবে ইডিএ এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি পেতে হলে দশকের পর দশক সময়ের পাশাপাশি শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে চীনা কোম্পানিগুলো ইডিএ তৈরির দৌড় শুরু করতে চাইলেও তাদেরকে সফলতার জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় মেধা। ইডিএ টুল তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। ইডিএ টুল তৈরিতে চীনা কোম্পানিগুলো প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী খুব একটা আকৃষ্ট করতে পারছে না।

আমেরিকান চিপ কোম্পানিগুলোকে কিভাবে প্রভাবিত করবে?

ইডিএ রফতানির ওপর সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ মূলত এই শিল্পের খুব বিশেষায়িত ও আধুনিক সেকশনের ওপর। এই অত্যাধুনিক সফটওয়্যারটি এখনো চীনা কোম্পানিগুলো ঢালাওভাবে ব্যবহার শুরু করে নি। ফলে বাণিজ্যের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব কম হবে।

তবে রফতানি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটি চিপ কোম্পানিগুলো সার্বিকভাবে স্বাগত জানায় নি। কারন এ ধরনের নীতিমালার কারনে মার্কিন পণ্যের চাহিদা কমবে এবং আয় হ্রাস পাবে। এটি শুধুমাত্র ইডিএ কোম্পানি নয়, আইপি, যন্ত্রাংশ নির্মাতা কোম্পানিগুলোও প্রভাবিত হবে।

আরএপি

*

*

আরও পড়ুন