Samsung HHP Online Campaign

হ্যান্ডসেটসহ টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির মান যাচাইয়ে বিটিআরসি, হচ্ছে অত্যাধুনিক ল্যাব

নমুনা ছবি, রেডিও কমিউনিকেশন ও রিসার্চ ল্যাবের বিভিন্ন অংশ

আল-আমীন দেওয়ান :  মোবাইল হ্যান্ডসেটসহ সকল টেলিযোযোগ যন্ত্রপাতির মান যাচাইয়ের অত্যাধুনিক ল্যাব করছে বিটিআরসি।

যে ল্যাব হতে পরীক্ষার পর আমদানি করা এবং দেশে উৎপাদিত সকল টেলিযোগাযোগ পণ্য-যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ছাড়পত্র পাবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘টেলিযোযোগ খাতের নিযন্ত্রক হিসেবে জনগণের সেবার গুণগত মান রক্ষা করার বিষয়টিও দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে। আমাদের যারা গ্রাহক আছে তারা আমাদের উপর ভরসা করেই ফোন বা সেবা কিনবে। আমি যখন একটি ফোন উৎপাদনের জন্য দিচ্ছি অথবা কোনো যন্ত্রপাতি আমাদানি করে তা পণ্য তৈরির জন্য দিচ্ছি তারমানে এখানে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে এটা উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন পণ্য হচ্ছে বা আসছে।’

Techshohor Youtube

`এখন এটি যে উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন পণ্য সেটি আমারই যদি যাচাই করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে কেমন করে তার মান নিশ্চিত হবে। সেই যাচাইয়ের জায়গা হতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আমরা অন্যের উপর নির্ভর করে কোনো অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারবো না।’ উল্লেখ করে তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি-দুটি ডিভাইস না, ফাইভজিসহ অসংখ্য ডিভাউস রয়েছে। আমরা মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে বলেছি যে তারা ল্যাব ছাড়া ফ্যাক্টরি করতে পারবে না। এখন আমারই যদি ল্যাব না থাকে তাহলে কীভাবে যাচাই হবে তারা যে রিপোর্ট দিচ্ছে তা সঠিক কিনা ?’

মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বিটিআরসি এখন এটি এক্সিকিউট করতে যাচ্ছে। বলা হয়েছে সর্বাধুনিক ল্যাব যেটা দিয়ে প্রয়োজনীয় সকল পণ্য যাচাই-বাছাই করতে পারি তার ব্যবস্থা থাকে। এই সার্টিফিকেটের মান আন্তর্জাতিক স্বীকৃত হবে।’

কেনো এই ল্যাব :

টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ (সংশোধিত-২০১০), টেলিযোগাযোগ নীতিমালা-২০১৮ এবং আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি স্ট্রাট্রেজি-২০২১ অনুযায়ী বেতার স্পেকট্রাম প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষা এবং তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা পলিসি গবেষণা, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি যন্ত্রপাতির মান নির্ধারণ এবং সনদ দিতে রেডিও কমিউনিকেশন ল্যাবেরেটরি স্থাপন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো করার নির্দেশনা রয়েছে ।

বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র টেকশহর ডটকমকে জানান, এই ল্যাব হলে দেশের গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। মানসম্মত পণ্যে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হবে।

বিটিআরসি বলছে, নিম্নমানের টেলিযোযোগ যন্ত্রপাতি বিদেশ হতে দেশে আসা ঠেকানো, দেশে ফাইভজিসহ টেলিযোগাযোগে মানসম্মত যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করে উন্নত টেলিযোযোগ সেবা দেয়া, সাইবার নিরাপত্তা এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য-যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে এই ল্যাব ও সনদ ভূমিকা রাখবে ।

আসছে ফাইভজির সময়ে শুধু সকল মানুষ-মানুষে নয় বিশ্বের সব যন্ত্রপাতি-জিনিসপত্রও সবাই সবার সঙ্গে সংযুক্ত হবে। গাড়ি সংযুক্ত রাস্তার সঙ্গে, চালকের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে, ডাক্তাররা রোগীদের মেডিকেল ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত, অগমেন্টেড রিয়েলিটি মাধ্যমে যেকোনও সময় যেকোনও স্থানে থেকেই যা ইচ্ছে দেখে শুনে কেনাকাটা, বাসার দরজা-জানালা, ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিন, টিভি, এসি সব সংযুক্ত হয়ে যাবে। এই ম্যাসিভ আইওটি গ্রাহক হতে নির্গত হওয়া সিগন্যাল একে অপরকে ইন্টারফেয়ার করতে পারে। সেখানে ডিভাইসের মান ও নিয়ন্ত্রণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এছাড়া বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এমন ল্যাবের মতো এই ল্যাব হতেও মান যাচাই সনদ হতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয়ের সুযোগ তো থাকছেই।

কেমন হবে ল্যাব :

সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের ১২টি ল্যাবের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রেডিও কমিউনিকেশন ল্যাব করা পরিকল্পনা বিটিআরসির।

এগুলো হচ্ছে :

১. স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট পলিসি ল্যাব
২. রেডিও রিসোর্স প্লানিং ল্যাব
৩. মোবাইল হ্যান্ডসেট টেস্টিং ল্যাব
৪. ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কম্প্যাটিবিলিটি (ইএমসি)
৫. ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড-ইএমএফ (এসএআর)
৬. ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস (ইএমপি)
৭. ব্রডকাস্টিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন
৮. ফ্রিকোয়েন্সি ইন্টারফেরেন্সে অ্যানালাইসিস (গ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক, ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক)
৯. কনফরমিটি অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন কো-অপারেশন
১০. ক্যালিব্রেশন ইন্সপেকশন অব পারফর্মেন্স অব অ্যান্টেনাস
১১. পোস্ট-মার্কেট সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড কনফরমিটি অ্যাসেসমেন্ট (টেস্ট)
১২. টেলিকমিউনিকেশন ল্যাব

কতদূর এগিয়েছে উদ্যোগ :

এ ধরনের রিসার্স ল্যাব অত্যাধুনিক ও দেশের জন্য নতুন বিষয়। এগুলোর যন্ত্রপাতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কোরিয়া জাপান ও জার্মানিতে তৈরি হয়। এ বিষয়ে দেশগুলোর বেশ কিছু পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে যারা সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রণয়ন, দরপত্র এবং টেকনিক্যাল নীতিমালা করা ও প্রশিক্ষণে পরামর্শ দেয়। দেশগুলোর মন্ত্রণালয় বা নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় এমন প্রতিষ্ঠান বা বিভাগ রয়েছে যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ।

বিটিআরসি এই উদাহরণকে সামনে রাখছে।

জাপান সরকারের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি রিসার্স পার্টনারশিপ ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (এসএটিআরইপিএস) কার্যক্রমে বিটিআরসির কোনো কারিগরি সহায়তায় প্রয়োজন কিনা তা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছে। যেখানে বিটিআরসি এই ল্যাব করতে জাপানের সহায়তা চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠিয়েছে।

টেলিযোগাযোগ বিভাগ সরকারের ইকোনমিক রিলেশন বিভাগ বা ইআরডিতে পাঠিয়েছে।

ইতোমধ্যে ল্যাব করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। আর স্পেকট্রাম বিভাগের অধীনে রেডিও কমিউনিকেশন রিসার্চ ও টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির মান পরীক্ষায় এই টেস্টিং ল্যাব করতে একটি প্রকল্প হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রণয়ন, দরপত্র এবং টেকনিক্যাল নীতিমালা করা ও প্রশিক্ষণে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে ।

বিটিআরসি এখন যেভাবে অনুমোদন দেয় :

বিটিআরসি এখন অ্যাডহক পলিসিতে তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা করছে। এছাড়া বেতার যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশন যাচাই ছাড়াই ভেন্ডরদের দেয়া তথ্যে নির্ভর করে টেলিযোযোগ যন্ত্রপাতির নমুনা বা ছকভিত্তিক (type) অনুমোদন দিচ্ছে।

টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির ‘স্টান্ডার্ডাইজেশন’ বা ‘মান যাচাইয়ে’ বিটিআরসির সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা নির্দেশনা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে অনাপত্তিপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মান সনদ দেখা হয় ।

বিটিআরসির বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে লাইসেন্সপাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বানুমোদন নিয়ে সুইচ, রাউটার, সার্ভার, আইপি ফোন, ওএনও, ওএলটি, ওটিডিআর, ডিডব্লিউডিএম যন্ত্রপাতি, ফায়ারওয়াল, গেটওয়ে, এসএফপি মডিউল, বেতার যন্ত্রপাতি, মোবাইল হ্যান্ডসেটসহ বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি করে থাকে । এসব ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশন্স এবং স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগ অনাপত্তিপত্র দিয়ে থাকে।

যেখানে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ), ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইনেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও), ইন্সটিটিউট অব ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইইই), ওয়েস্ট ফর্ম ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইক্যুপমেন্ট (ডব্লিউইইই), ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন (এফসিসি), ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (ইএন), চায়না কম্পোলসারি সার্টিফিকেশন (সিসিসি)সহ আরও অনেক সংস্থার সার্টিফিকেশন বা সনদ দিয়ে থাকে আমদানিকারকরা।

বেতার স্পেকট্রাম প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষা এবং তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা পলিসি গবেষণা, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির মান নির্ধারণ এবং সনদ প্রদানে রেডিও কমিউনিকেশন ল্যাবরেটরি স্থাপন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে রেডিও কমিউনিকেশন স্টাডি ও রিসার্চ নামে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগে একটি ডিরেক্টরেট রয়েছে।

টেলিযোগাযোগ সেবায় কলড্রপ কমানো, ভয়েস কলের মান বাড়ানো, ফোরজি সেবার নির্ধারিত মান নিশ্চিতে দেশজুড়ে নিয়মিত টেস্ট ড্রাইভ করে চলেছে বিটিআরসি। খাতটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে সংস্থাটি। বাড়ানো হয়েছে গ্রাহক অভিযোগ নেয়ার সক্ষমতা, হচ্ছে গণশুনানি । পাশাপাশি কলরেট ক্যাপিং ও মোবাইল ফোনে অফনেট-অননেটে এক কলরেট, ডু নট ডিস্টার্ব বা ডিএনডি, ডেটা ক্যারি ফরওয়ার্ড, প্যাকেজ কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে চলেছে তারা।

*

*

আরও পড়ুন