সৌদি আরবে তাপ থেকে পানি উৎপাদন

টেকশহর কনটেন্ট কাউন্সিলর: সোলার প্যানেলের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জ্বালানী তৈরির সময় মাত্রাতিরিক্ত তাপ সৃষ্টি হয় যা অনেক সময়ই অব্যবহৃত থেকে যায়। সৌদি আরবের একদল বিজ্ঞানী এই অতিরিক্ত মূল্যবান সম্পদ নষ্ট না করে দ্বিতীয়বার ব্যবহারের উপায় খোঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই তাপ ব্যবহার করে পাতলা বাতাস থেকে জল বের করা যাবে; যা পানির সংকটে থাকা অঞ্চলের জন্য বড় আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞানীদের এ উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্যই ছিলো শুষ্ক-আবহাওয়ার অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদেরকে সস্তায় জ্বালানী এবং পানি সরবরাহ করা।

যেভাবে পানি সংগ্রহ করা যাবে
সবার প্রথমে সোলার প্যানেলটি একটি হাইড্রোজেলের ওপর স্থাপন করা হয়; এই পদার্থটি পানি ধারন ক্ষমতার জন্য পরিচিত। এই নরম, নমনীয় প্লাস্টিকের উপাদান লেন্সে ফিলা¥টিকে আর্দ্র রাখতে সহায়তা করে।
এই উদ্ভাবনটির জন্য গবেষকরা একটি বিশেষ ধরনের হাইড্রোজেল তৈরি করে যা চারপাশের বাতাস থেকে পানি শোষন করে তা ধরে রাখে এবং যখন এটি গরম হয় তা তরল হয়ে পরে। এইক্ষেত্রে তাপের উৎস হলো সৌর প্যানেলের অতিরিক্ত তাপ; যা সাধারনত ‘নষ্ট’ শক্তি হিসেবে পরিচিত।
সৌর প্যানেলটি উত্তপ্ত হওয়ার পর জেল থেকে পানি বের হতে শুরু করে এবং এর নিচে একটি বড় ধাতব বক্স থাকে যেখানে পানির ফোটাগুলো জমা হয়। বাড়তি সুবিধা হিসেবে এই হাইড্রোজেলের কারনে সৌর প্যানেলের কার্যক্ষমতা প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় বলে গবেষণাটিতে বলা হয়েছে। কারণ জেলের মাধ্যমে প্যানেলের অতিরিক্ত তাপ শোষণের ফলে প্যানেল কম উত্তপ্ত হয়।
সৌদি আরবের আবহাওয়া যখন চরম উত্তপ্ত ছিলো তখন পানি উৎপাদনের ব্যবস্থাটি পরীক্ষা করে দেখা হয়। একটি ক্লাসরুমের ডেস্কের আকারের একটি সৌর প্যানেল থেকে মোট এক হাজার ৫১৯ ওয়াট-ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়; যা দিয়ে টেসলার একটি গাড়ি সাত কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। এই সৌর প্যানেল দিয়ে বাতাস থেকে প্রায় দুই লিটার করে পানি সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
এই পানি থেকে ফসল উৎপাদন করা যায় কিনা তা বোঝতে এই দুুই লিটার পানি প্লাস্টিকের বক্সে রেখে তাতে ৬০টি পালং শাকের বীজ লাগানো হয়। গবেষকরা জানিয়েছেন এই ৬০টি বীজ থেকে ৫৭টি থেকে চারা গজায়; যা স্বাভাবিকভাবে ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। আরো বিদ্যুৎ এবং পানি উৎপাদনের জন্য সৌর প্যানেলের এই মডেলটিকে আরো বর্ধিত করার চিন্তা-ভাবনা করছেন বিজ্ঞানীরা।

Techshohor Youtube

গবেষণা প্রতিবেদনটির মূল লেখক সৌদি আরবের কিং আব্দুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার পেং ওয়াং বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পরিবেশবান্ধব জ্বালানী, পানি এবং খাদ্য উৎপাদনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিশেষ করে আমাদের ব্যবস্থায় পানি সৃষ্টির একটি অংশ রয়েছে, যা বর্তমানের কৃষিফটোভোলটাইক থেকে পৃথক।’
তিনি আরো বলেন, ‘জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অনুযায়ি বিশ্বের সবার কাছে পরিস্কার পানি এবং সাশ্রয়িমূল্যে পরিবেশবান্ধব জ্বালানী পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা । আমি বিশ্বাস করি আমাদের নকশাটি বাড়িগুলোয় আলো এবং ফসলে পানি সরবরাহে শক্তি ও পানির ব্যবস্থার একটি বিকেন্দ্রীকরন উৎস হতে পারে।

চাহিদার কাছাকাছি পানি উৎপাদন করে এই প্যানেলগুলি বিশ্বে স্বাস্থ্যজনিত অনেক উদ্বেগের সমাধান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানভিত্তিক অনলাইন পাবলিকেশন আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডাটার (ওডবিøউআইডি) ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর অনিরাপদ পানির কারনে বিশ্বে ১২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়; বিশেষ করে দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করছেন এমন সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের মৃত্যুর হার বেশি। ২০২০ সালের তথ্যানুযায়ি বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজনেরই পরিস্কার পানি ব্যবহারের সুযোগ পাচেছন না।

এ বিষয়টি ছাড়াও জলবায়ু সংকট শুষ্ক অঞ্চলে আরো খরা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। আর খরা কৃষিকাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গত বছরের শেষের দিকে মাদাগাস্কারে ফসলের মারাত্বক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সবার সামনে নিয়ে আসে জাতিসংঘ। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল এ বিপর্যয়টি বিশ্বকে প্রথমবারের মতো জলবায়ু-পরিবর্তনজনিত দূর্ভিক্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আরএপি

*

*

আরও পড়ুন