এসএমপি ঠেকানোর কূটনৈতিক তৎপরতায় ‘সফল’ ইডটকো, আবেদন বিবেচনার আশ্বাস

ইডটকোর কার্যক্রম, ছবি : ইন্টারনেট

আল-আমীন দেওয়ান : দেশের মোবাইল টাওয়ার খাতে এসএমপি ঠেকাতে মালেয়েশিয়া সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার পর আশার আলো দেখছে ইডটকো।

খাতটিতে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপির অন্যতম নির্ণায়ক টাওয়ারের বাজার শেয়ার মূল্যায়নের বিষয়ে ইডটকোর আবেদন বিবেচনা করতে চায় সরকার।

এসএমপির জন্য একটির কোম্পানির টাওয়ার সংখ্যা, অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব এবং ৪০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার নির্ণায়ক ঠিক করেছে বিটিআরসি। এখানে টাওয়ারের বাজার শেয়ার হিসাবে টাওয়ার কোম্পানিগুলোর কার কাছে কতো টাওয়ার আছে সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়েছিলো।

Techshohor Youtube

যেখানে ইডটকোর প্রস্তাব ছিলো খাতটিতে মোবাইল অপারেটরসহ সবার কাছে সবমিলে যত টাওয়ার আছে সেটি ধরে হিসেব করার, শুধু টাওয়ার কোম্পানিগুলোর কাছে কতো টাওয়ার আছে সেটি ধরে নয়।

আর এখানেই বিষয়টি ভেবে দেখতে চান নীতি-নির্ধারকরা।

সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে দেখা করতে ইডটকোর শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। ইডটকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রিকি স্টেইনসহ এই দলে উর্ধ্বতন আরও কর্মকর্তা ছিলেন।

তারা সেখানে ইডটকোর এসএমপি প্রসঙ্গে তাদের আবেদনগুলো বিবেচনার অনুরোধ করেন। ওই সভায় মন্ত্রী ইডটকো প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশে তাদের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসায় কোনো বাধা দেয়া হবে না। তারা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারে।

মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘ইডটকো নিয়ে মালয়েশিয়া সরকার এবং এখানে তাদের হাইকমিশনার যে অনুরোধগুলো করছেন, যেগুলো আমরা যেগুলো যথাযথভাবে শুনেছি। দেশের টাওয়ার কোম্পানির মধ্যে তারা অনেক বছর ধরে টাওয়ার বানাচ্ছে, সেখানে এদের যে শেয়ার সে হিসেবে ৯০ শতাংশের মতো হয়।’

‘কিন্তু কোম্পানিটির বক্তব্য হচ্ছে, ‘যে পরিমান টাওয়ার অলরেডি আছে, অর্থাৎ টেলকোগুলোর কাছেও যে টাওয়ার আছে-এই টাওয়ারগুলো হিসাব করলে তাদের যে ভাগ এখন আছে সেটা ৩০ শতাংশের বেশি হয় না। ফলে তাদেরকে যদি এসএমপি বলা হয় সেটা সঠিক হবে না।’ উল্লেখ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমাদের মনে হয়েছে, হয়তো ঠিকই। আর আমরা তো তাদের বন্ধ করতে চাই না, আবার বাধাও তৈরি করতে চাই না। কারণ এই মূহুর্তে যখন আমি ফাইভজির কথা চিন্তা করবো তখন আমার যে পরিমাণ টাওয়ার লাগবে তা অনেক।’

‘আমরা এ মূহুর্ত পর্যন্ত তাদের কোনোরকম এসএমপিও ঘোষণা করিনি, কোনো নিষেধাজ্ঞাও প্রদান করিনি। এছাড়া এমন কোনো পরিস্থিতি করিনি যে তাদের গ্রোথ ঠেকে যেতে পারে। এসএমপি ঘোষণা করা মানেই তাদের পানিশড করা এটা আমরা বিশ্বাস করি না। জিপি অলরেডি এসএমপিতে আছে তাদের গ্রোথ তো ঠেকেনি।’ বলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তাদের কোনো কাজে আমরা আটকে দিলে তখন তারা বলতে পারে যে, এখানে তারা কাজ করতে পারছে না। তাদের কাজ করতে যতটুকু সহযোগিতা দেয়া দরকার সেটা আমাদের দিক হতে থাকবে। তারা টাওয়ারের সংখ্যা বাড়াতে পারে।’

‘যেহেতু তারা আবেদন করেছে, মালয়েশিয়ান সরকার পর্যন্ত বিষয়টিতে কনসার্ন । সে কারণে বিটিআরসিকে এটি বিবেচনা করতে হবে তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’ উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

আগে যা ঘটেছিলো ?

ইডটকোকে এসএমপি ঘোষণার প্রক্রিয়ার মধ্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারের সঙ্গে বৈঠক(অনলাইন) করেছিলেন বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাসিম ।

ওই বৈঠকে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার বলেছিলেন, এসএমপি ঘোষণার মাধ্যমে ইডটকোর বিনিয়োগ হুমকির মধ্যে পড়বে। বিষয়টি নিয়ে মালয়েশিয়ান সরকারের উদ্বেগ রয়েছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে । এতে মালয়েশিয়ান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা ইডটকো লিমিটেডে বিনিয়োগ করা।

এছাড়া মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানান । সেখানে বাংলাদেশের টাওয়ার ব্যবসায় এসএমপি নির্ধারণের বিষয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করে মালয়েশিয়া সরকার।

এরপর মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এসব বিষয় উল্লেখ করে বিটিআরসিতে চিঠি পাঠায়। এতে টাওয়ার ব্যবসায় এসএমপি নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।

এরমধ্যে দেশে আরেক মালেশিয়ান কোম্পানি মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা বিটিআরসিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াতে ভূমিকার জন্য প্রশংসাসূচক ডিও চিঠিও পাঠায় । এতে প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে অভিনন্দনও জানায় তারা। এতে রবি উল্লেখ করে, রবি আজিয়াটা মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারী হিসেবে ক্রমাগত বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। তারা এখানে বিনিয়োগ বাড়াতে ইডটকোর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের ডিজিটাল অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবদান বাড়াবেন।

ইডটকো বিটিআরসিকে জানায়, মোবাইল অপারেটদের টাওয়ার রোলব্যাক করা আগে এসএমপির দরকার নেই বলে তারা মনে করে। আর টাওয়ারের বাজার শেয়ার হিসেবে বাজারে যত টাওয়ার আছে সেটা ধরা উচিত, এখানে শুধু টাওয়ার কোম্পানিদের টাওয়ার ধরে বাজার শেয়ার নির্ধারণ ঠিক হবে না বলে মনে করেন তারা। বাজারে তিন-চারটি শক্তিশালী কোম্পানি থাকলে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা কম বলেও তাদের ভাবনা।

এসব প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাসিমেকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার এসএমপি নিয়ে ইডটকো’কে কোনো দুশ্চিন্তা না করতে আশ্বস্ত করেন ।

তাদের তিনি বলেছিলেন, এসএমপি নির্ধারণে ইডটকো’র ব্যবসা বন্ধ হবে না। শুধু কিছু নিয়ম কানুন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এরআগে গ্রামীণফোনকে এসএমপি করা হয়েছে এবং তারা বাজারে বেশ ভালোভাবেই ব্যবসা করে যাচ্ছে।

বিটিআরসি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের চিঠিরও জবাব দেয়। সেখানে হাইকমিশনকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

বিটিআরসি হাইকমিশনকে জানিয়েছিলো, বাজারে একচোটিয়া আধিপত্য ঠেকানো এবং গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিতে এসএমপির গুরুত্ব রয়েছে। এসএমপি নির্ণায়ক নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। এসএমপি নির্ধারণে ইডটকোর ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে না। এসএমপির কারণে বাজার প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে।

ইডটকো যেভাবে এসএমপি প্রক্রিয়ায় :

দেশে টাওয়ার ব্যবসায় ইডটকো ছাড়াও রয়েছে সামিট টাওয়ার, কীর্তনখোলা টাওয়ার এবং এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম। এই তিন কোম্পানি একসঙ্গে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, ইডটকোর কারণে বাজার অস্থিতিশীল এবং প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে।

কোম্পানিগুলো ওই চিঠিতে ইডটকোর বাজার শেয়ার এবং একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের অঙ্গসংগঠন হিসেবে অধিপত্য বিস্তারের বিষয়ে উল্লেখ করে। তারা বলছে, ইডটকো অস্বাভাবিক কম দামে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে বিভিন্ন প্যাকেজ দিয়ে আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে।

এরপর বিটিআরসি এই সম্পর্কিত একটি কমিটি করে দেয়। কমিটি এ বিষয়ে টাওয়ার শেয়ার কোম্পানির এসএমপির নির্ণায়ক ঠিক করে। যেখানে কোম্পানির টাওয়ার সংখ্যা, অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব এবং ৪০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

এবার দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলোর টাওয়ার, রাজস্ব, বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব শেয়ার, বাজার দখলসহ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে কমিটি।

এতে দেখা যায়, ইডটকোর টাওয়ার সংখ্যা ১২ হাজার ৮৯৬টি। যা বাজারের ৯২ দশমিক ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে সামিট টাওয়ারের ৫৮৪টি (বাজার শেয়ার ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ), কীর্তনখোলা টাওয়ারের ৯৭টি (বাজার শেয়ার ০ দশমিক ৬৯ শতাংশ), এবি হাইটেকের ৪০৬টি (বাজার শেয়ার ২ দশমিক ৯০ শতাংশ) টাওয়ার রয়েছে।

আয়ের হিসেবে দেখা যায় (২০২১ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে) ৩০৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা আয় করেছে ইডটকো। যা বাজারের ৯৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।

যেখানে সামিট টাওয়ারের ৮ কোটি ৮০ লাখ (বাজার শেয়ারে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ), কীর্তনখোলার ২৩ লাখ ২২ হাজার(০ দশমিক ০৭ শতাংশ) এবং এবি হাইটেকের ২ কোটি সাড়ে ৫ লাখ (০ দশমিক ৬৪ শতাংশ) আয়। 

এরপর কযেক দফা উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক শেষে বিটিআরসি দেখে এসএমপির নির্ণায়কে ইডটকো নির্ধারিত হয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রাখে বিষয়টি।

*

*

আরও পড়ুন