অবৈধ জ্যামার বুস্টারের অবাধ কেনাবেচা-ব্যবহার, নিরুপায় মোবাইল অপারেটররা

ই-কমার্সসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে বিক্রি হচ্ছে জ্যামার-বুস্টার, ছবি : টেকশহর

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : অবৈধ জ্যামার-বুস্টারসহ বেতার যন্ত্রপাতির অবাধ ব্যবহার নিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

অপরদিকে বিটিআরসিসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পদক্ষেপও একই সময়ের। কিন্তু বছরের পর বছর যেন বেড়ে চলেছে এসব অবৈধ নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতির কেনাবেচা ও ব্যবহার।

অপারেটরগুলো বলছে, এসব ডিভাইস কলড্রপসহ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের মানসম্মত সেবায় অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। যেখানে কলড্রপসহ সেবার মান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়তে হয় তাদের। অথচ এসব বাধার বিষয়ে তারা করতে কিছু পারে না, সেবার মান ঠিক রাখতে এখানে নিরুপায় তারা।

Techshohor Youtube

কোথায় মিলছে ?

বাংলাদেশে চোরাই পথে, অবৈধভাবে ঢুকছে এসব পণ্য আবার বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। সম্প্রতি বিটিআরসি-আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই দেখায় যায় বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে মিলছে এগুলো। বিভিন্ন শপিংমল ও প্রযুক্তিপণ্যের বাজারগুলোতেও মিলছে।

ক্লিকবিডি নামে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে দেখা যায়, বিভিন্ন ক্যাটাগরির জ্যামার, বুস্টার বিক্রির জন্য প্রদর্শিত হচ্ছে। যেখানে টুজি, থ্রিজি, ফোরজি, ওয়াইফাই ব্লুটুথ জিপিএস সিগন্যাল ব্লকার, জ্যামার, ড্রোন সিগন্যাল জ্যামার মিলছে।

দেশের অন্যতম ই-কমার্স দারাজে দেখা যাচ্ছে এখনও মোবাইল সিগন্যাল বি বুস্টারসহ বিভিন্ন নেটওয়ার্কিং ডিভাইস বিক্রি হচ্ছে। যেগুলো কিনতে পারছে যেকেউ।

বঙ্গস্টল ডটকম নামে একটি ই-কমার্সে দেখা যাচ্ছে শক্তিশালী জ্যামার বিক্রির বিজ্ঞাপন।

বেশ পরিচিত মার্কেটপ্লেস বিক্রয়ডটমকে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দামের ও ক্যাটাগরির বুস্টার বিক্রির অনেক বিজ্ঞাপন।

সইমবিডি নামের প্লাটফর্মে দেখা যায় বিভিন্ন রেঞ্জের শক্তিশালী জ্যমার ।

এভাবে বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম, ফেইসবুক ও ইউটিউবেও দেখা যাচ্ছে এসব অবৈধ যন্ত্রপাতির বিকিকিনি।

এছাড়া স্টেডিয়াম মার্কেট, গুলিস্তান, ফার্মেগেট, পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ও মার্কেটে মিলছে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটব জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণেও এসব মার্কেট ও এলাকা রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন ই-কমার্স প্লাটফর্ম।

কোথায় ব্যবহার হচ্ছে ?

মোবাইল অপারেটররা বলছেন, পুরান ঢাকায় ব্যাপকভাবে বুস্টার-রিপিটারের ব্যবহার রয়েছে। ঢাকার মধ্যে পল্লবী থানার বড় একটি এলাকায়, বনানীর দুটি আবাসিক এলাকা, মহাখালী ডিওএইচএস, নিকুঞ্জ, পুরানা পল্টন, বনশ্রী ও ধানমণ্ডিতে এই জ্যামার বুস্টার-রিপিটারের ব্যবহার রয়েছে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মসজিদ মন্দিরসহ উপাসনালয়গুলোতে এর ব্যবহার হচ্ছে । ঢাকার বাইরেও কিছু এলাকায় নেটওয়ার্ক বাড়াতে অনেক বাড়িতেই দেখা যাচ্ছে বুস্টারের ব্যবহার করতে।

প্রায় সাড়ে তিন’শর মতো স্পট পেয়েছে অপারেটররা যেখানে এসব ডিভাইসের কারণে নেটওয়ার্ক সেবা ঠিকঠাক রাখতে পারছে না অপারেটররা।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজ, মার্কেটপ্লেস বিক্রয়ডটকমসহ অনলাইনে বুস্টার বিক্রি, ছবি : টেকশহর

কী বলছে অপারেটররা ?

গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, টেলিটক সবারই এ বিষয়ে বক্তব্য একই। গ্রামীণফোনের ভারপ্রাপ্ত চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার হোসেন সাদাত, রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এবং বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তৈমুর রহমান বিভিন্ন সময়ে বারবার এ বিষয়ে নিজেদের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কথা বলে চলেছেন।

তারা বলছেন, গ্রাহক একটি কল করার পর রিসিভারের কাছে যাওয়া পর্যন্ত তারা ছাড়াও এনটিটিএন, আইআইজি, আইসিএক্স, আইজিডব্লিউসহ অনেকগুলো পক্ষ জড়িত। জ্যামারসহ অনাকাংখিত বেতার তরঙ্গ অনেক কলড্রপ, ডেটা ধীর, নয়েজের অন্যতম কারণ। অথচ এখানে এসব বাধার বিষয়ে সরাসরি কিছু করার কোনো ক্ষমতা অপারেটরদের নেই।

মোবাইল অপারেটদের সংগঠন এমটব মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এস এম ফরহাদ টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী জ্যামার, রিপিটার বা বুস্টার জাতীয় রেডিও ইকুইপমেন্ট অবৈধভাবে আমদানি করা বা স্থাপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব রেডিও ইকুইপমেন্ট যত্রতত্রভাবে ব্যবহারের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্কে ইন্টারফিয়ারেন্স তৈরি হয়। ফলে কল ড্রপসহ নেটওয়ার্কের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর :

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটরদের এ বিষয়ে আমরা কনসার্ন।

‘ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। বিটিআরসি আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে। অবৈধ এসব যন্ত্রপাতি জব্দ করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা চলতে থাকবে।’ উল্লেখ করেন তিনি।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, তারা জানিয়েছে তাদের সমস্যার কথা। বিটিআরসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। অপারেটররা যেন নেটওয়ার্ক মানসম্পন্ন রাখে। এজন্য তাদের সব ধরণের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জ্যামার-বুস্টার ব্যবহারের চিত্র, ছবি : মোবাইল অপারেটরদের জরিপ প্রতিবেদন

মোবাইল অপারেটরদের ওয়ার্কপ্লান ?

অবৈধ জ্যামার, বুস্টার-রিপিটারের ব্যবহার ঠেকাতে একটি ওয়ার্কপ্লান তৈরি করে মোবাইল ফোন অপারেটরা। যা বাস্তবায়নে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়া হয়। রেগুলেটরি এবং কমিউনিকেশন দুটি ভাগে কাজ করার বিষয়ে উল্লেখ করে তারা।

ওয়ার্কপ্লানে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়ার বিষয় বলা হয়েছে। ডিএমপি, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বিজিএমই, ডিওএইচএস, ই-ক্যাবসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সভা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া।

আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিটিআরসির বৈঠক, যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য অপারেটরগুলো সরবরাহ করবে।

এছাড়া গণমাধ্যমে প্রতিবেদন, প্রচার-প্রচারণা, এসএমএস, সভা-সেমিনারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এরমধ্যে ১৭ এপ্রিল অ্যামটব বিটিআরসিকে আবারও চিঠিও দেয় যে, তারা বিভিন্ন প্লাটফর্মে অবাধে বিক্রি হওয়া এসব যন্ত্রপাতির বিক্রি বন্ধ চায়। যেন মানুষ এগুলো কিনতে না পারে। এতে ব্যবহার বন্ধ হবে। ব্যাপক সচেতনতা, প্রচারণা এবং অভিযান চান তারা। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অপারেটরগুলো সব পক্ষ মিলে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে তারা।

অবৈধ জ্যামার-বুস্টার কেনা ও ব্যবহারে সর্তক করে বিটিআরসির বিজ্ঞপ্তি, ছবি : বিটিআরসির ফেইসবুক পেইজ

বিটিআরসির পদক্ষেপ ?

সেই ২০১৮ সালের নভেম্বরে অপারেটদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে বিটিআরসি। এরআগে অবশ্য আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি অভিযানে জ্যামারসহ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়।

তবে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত সমস্যার প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের নভেম্বরেই নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি জনস্বার্থে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশে অনুমতিছাড়া এসবের ব্যবহার বন্ধ করতে বলে।

ওই বিজ্ঞাপনে ‘এসবের কারণে মোবাইল অপারেটদের নেটওয়ার্ক তরঙ্গে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে, কলড্রপ হচ্ছে, ইন্টারনেটের গতি কমছে এবং সংযোগ পেতে গ্রাহকের সমস্যা হচ্ছে। তাই কডলেস টেলিফোন সেট, ওয়াকিটকি সেট, নেটওয়ার্ক আটকানো জ্যামারসহ বিভিন্ন বেতার যন্ত্রপাতি আমদানি, কেনাবেচা ও ব্যবহারে বিরত থাকতে বলা হলো’ উল্লেখ করে তারা।

শুধু বিজ্ঞাপন নয়, এরপর আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানও চালায় নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। ওই বছরের ডিসেম্বরে অবৈধ এসব যন্ত্রপাতি জব্দ হয়, গ্রেপ্তারও হয় সংশ্লিষ্টরা।

এরপর মাঝেমাঝেই অভিযানে এসব যন্ত্রপাতি জব্দ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু এই বছরের পর বছরেও এর বিকিকিনি ও ব্যবহার কমিয়ে আনা যায়নি।

সম্প্রতি আবারও বেশ তৎপর হয়েছে বিটিআরসি । এসব যন্ত্রপাতি কেনাবেচা ও ব্যবহার ঠেকাতে জনসচেতনতা এবং সতর্কতায় এসএমএস পাঠাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে তারা।

১১ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও থানার তেজকুনিপাড়া এলাকা ও পল্টন থানার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় দুটি অভিযানে অনুমোদনবিহীন অবৈধ নেটওয়ার্ক জ্যামার, বুস্টার ও রিপিটার জব্দ করাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিটিআরসি বলছে, তারা সতর্ক করছেন, সচেতনতা বাড়াচ্ছেন। অভিযান চলতে থাকবে।

*

*

আরও পড়ুন