বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণে `অপ্রত্যাশিত' উদ্বেগ, কৌশলী বাংলাদেশ

আল-আমীন দেওয়ান : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের কার্যক্রম এগোচ্ছিল পরিকল্পনা মতোই।

এই স্যাটেলাইট নির্মাণ-উৎক্ষেপণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান গ্লাভকসমসে’র সঙ্গে সহযোগিতা স্মারকও হয়ে গেছে।

লক্ষ্য ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ আকাশে উড়বে বাংলাদেশের দ্বিতীয় এই স্যাটেলাইট, যেটি আর্থ অবজারভেটরি স্যাটেলাইট হতে যাচ্ছে।

Techshohor Youtube

কিন্তু সে পরিকল্পনায় অপ্রত্যাশিতভাবে এক উদ্বেগ এসে হাজির। যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জের। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যা, নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্লাভকসমসে’র সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ প্রকল্পের ‘সম্ভাব্য ভবিষ্যত জটিলতাগুলো’ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।

কী ভাবছেন নীতি-নির্ধারক ও বিশ্লেষকরা ?

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা সারা দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন নই, আমরা মাথা লুকিয়েও রাখি না। পুরো পরিস্থিতি গভীরভাবে দেখা হচ্ছে।

‘ এটি আন্তর্জাতিক ঘটনা, আমাদের কাছেও অপ্রত্যাশিত। কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখতে হবে। সারা পৃথিবীর পরিস্থিতি দেখবো তারপর আমরা সামনে পা ফেলবো’ বলছিলেন মন্ত্রী।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, সবার আগে দেশ। দেশের স্বার্থ যেভাবে সুরক্ষিত হয় সেটিই করা হবে। এখানে কোনো আপস আমরা আগেও করিনি এখনও নয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এর চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘এটি খুব ভ্যালিড কনসার্ন। আমরা এটি নিয়ে উদ্বেগে আছি।’

‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি পরিস্থিতি কোন দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্তে যাইনি’ বলছিলেন বিএসসিএল চেয়ারম্যান।

শাহজাহান মাহমুদ বলেন, কোনো পরিস্থিতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ প্রকল্প ঝুঁকিতে ফেলার সুযোগ নেই। দেশ প্রথম, সেক্ষেত্রে বিকল্প ভাবতে হলে ভাবা হবে।  

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটেটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর টেকশহর ডটকম বলেন, এই পরিস্থিতেতে এগুনো মনে হয় না প্রাকটিক্যাল আর উচিত হবে।

‘আর এটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলে পরবর্তীতে করতে হবে। এখন এটি যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দেয়া। সরকারকে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে ’ বলছিলেন তিনি।

আর যদি প্রকল্পটি এখনই জরুরি হয় তাহলে বিকল্প ভাবার পরামর্শ এই বিশ্লেষকের।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৩ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) এবং পাবলিক ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিপিপি) সভা শেষে রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য প্রশ্নে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা মনে করছি না যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। যদি তাই হয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা হবে ।

গ্লাভকসমসের সঙ্গে যে চুক্তি :

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ব মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রসকসমসের সাবসিডিয়ারি এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি (বিএসসিএল) কার্যালয়ে সহযোগিতা স্মারকে সই করে দুই দেশ।

বিএসসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: শফিকুল ইসলাম এবং গ্লাভকসমসের মহাপরিচালক দিমিত্রি লস্কুতন নিজ নিজ পক্ষে এই স্মারকে সই করেন। যেখানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার উপস্থিত ছিলেন।

বিএসসিএল চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদের সভাপতিত্বে ওই স্মারক সই অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব মো: খলিলুর রহমান, বাংলাদেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সেন্ডার ভিকেনতেভিচ মান্তিতস্কি এবং অনলাইনে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান ও গ্লাভকসমসের মহাপরিচালক দিমিত্রি লস্কুতব অংশগ্রহণ করেন।

আরও আগ্রহ ছিলো যাদের :

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণে চীনের রাষ্ট্রযাত্ত কোম্পানি চায়না গ্রেটওয়াল, ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস ও এয়ারবাসের আগ্রহ ছিলো।

থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ করেছে।

রুশ কোম্পানি গ্লাভকসমসের সঙ্গে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর

কী লাভ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এ ?

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ধরন নিয়ে বলা হচ্ছে এটি নিম্ন আর্থ অরবিট (লিও) পর্যবেক্ষণের হবে। এমন স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত ৫০০-৮০০ কিলোমিটার উপরে প্রদক্ষিণ করে।

কৃষিভূমি ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও খরার পূর্বাভাস, তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, উদ্ভিদ-বনাঞ্চলের ধরন-পরিবর্তন, ভূমি গবেষণা, বিভিন্ন রকমের মানচিত্র তৈরি ও হালনাগাদকরণ, তাৎক্ষণিক যেকোনো জরুরি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ দূষণ, সমুদ্রে জাহাজ পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের জরিপসহ প্রতিরক্ষায়ও সুবিধা পাওয়া যাবে এ স্যাটেলাইট হতে।

বিএসসিএল বলছে, এ স্যাটেলাইট হতে এসব সেবা বিভিন্ন দেশে নিতে পারে। দেশের বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তর-সংস্থা তো আছেই। স্যাটেলাইটটির পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের রিপোর্টে বিশ্ববাজারে এমন স্যাটেলাইটের চাহিদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বানাতে ও উৎক্ষেপণে খরচ কতো ?

স্যাটেলাইটটির জন্য সবমিলে ঠিক কতো খরচ হবে তা এখন চূড়ান্ত হয়নি বলে বলছে বিএসসিএল। গ্লাভকসমসের সঙ্গে সহযোগিতা স্মারকে ৪৩৫ মিলিয়ন বা ৩ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার মতো একটি ধারণা এসেছে। তবে পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান এই খরচ সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার মধ্যে রাখার কথা বলছে।

বিএসসিএলও বলছে, খরচ ৩ হাজার কোটির মধ্যে থাকবে।

মহাকাশে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জের :

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছে।

নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্সসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, যুদ্ধের জের মহাকাশেও পড়েছে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে রাশিয়ার জন্য বহু আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও।

পাল্টা পদক্ষেপে গেছে রাশিয়াও। রাশিয়াও বলছে, তারা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বিষয়ে আর কোনো সাহায্য করবে না। এরপর যদি স্টেশন নিয়ন্ত্রণ হারায় তাহলে তার দায় তাদের নয়। স্টেশনটিকে কক্ষপথে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থার।

রাশিয়া আমেরিকান কোম্পানির কাছে রকেট ইঞ্জিন বিক্রি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। স্থগিত হয়ে গেছে ব্রিটিশ সরকারের আংশিক মালিকানাধীন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কোম্পানি ওয়ানওয়েবের স্যাটেলাইট লঞ্চিং। কারণ রাশিয়ান রকেট। শুধু একটি নয়, রাশিয়ার রকেটের উপর নির্ভরশীল ওয়ানওয়েবের ভবিষ্যতের সবগুলো স্যাটেলাইট লঞ্চিং স্থগিত হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার সরবরাহ করা ১২২টি আরডি-১৮০ ইঞ্জিন রয়েছে। এখন এসব রকেট ইঞ্জিনগুলোর যেগুলো চালু আছে সেগুলোতে আর কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা বা সেবা না দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে রাশিয়া।

এরআগে চিপ আমদানির নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিলো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মহাকাশ এজেন্সি। বিশেষ ওই মাইক্রোচিপ আমদানিতে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সমস্যার মধ্যে পড়েছে রাশিয়া। নতুন করে এই সমস্যা বাড়াবে বৈ কমছে না বলেই আভাস ।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার মহাকাশ এজেন্সি পশ্চিমা মহাকাশ অংশীদারদের হতে আলাদা হয়ে যাচ্ছে এবং কাকতালীয়ভাবে নিজেদের মহাকাশ কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব রাশিয়ার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট প্রকল্প বা কার্যক্রমগুলোর উপর পড়বে।

*

*

আরও পড়ুন