ফাইভজি স্পেকট্রামের নিলামে যেতে অপারেটররা দ্বিধাদ্বন্দ্বে , বিটিআরসি অনড়

আল-আমীন দেওয়ান : ফাইভজি স্পেকট্রামের নিলামের জন্য আরও সময় চাইছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। আপত্তি তুলছে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণেও ।

বিটিআরসি ২০২২ সালের ৩১ মার্চ এই নিলামের তারিখ চূড়ান্ত করে আবেদন আহবান করেছে, বিস্তারিত নির্দেশনাও জারি করেছে।

এখন অপারেটরগুলো বলছে, এতো অল্প সময়ে এতো বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কঠিন। এছাড়া নিলামে স্পেকট্রামের দাম ও কিছু শর্তে তাদের আপত্তির জায়গা রয়েছে। তারা আলোচনা করতে চান।

Techshohor Youtube

এদিকে ঘোষিত সময়েই নিলাম অনুষ্ঠানে অনড় বিটিআরসি। যদিও ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অপারেটরগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে এ নিলাম একবার পিছিয়ে নেয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেছেন, অপারেটরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই ফাইভজি নিলামের বিষয়ে এগুনো হয়েছে। তাদের নীতিমালা দেয়া হয়েছে, যেখানে তাদের দাবিগুলো বিবেচনা করা হয়েছে। দামসহ অন্যান্য বিষয়গুলোও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।

‘অপারেটরগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে, তাদের বিনিয়োগকারীদের দিক হতেও আমরা সাড়া পেয়েছি। ৩১ মার্চ নিলাম অনুষ্ঠিত হচ্ছে’ বলছিলেন তিনি।

ছয় মাসের মধ্যে ফাইভজি সেবা চালুর ‘রোলআউট অবলিগেশন’ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সেবা চালুর জন্য স্পেকট্রাম দেয়া হলো, স্পেকট্রাম তো ব্যবহার করতে হবে। সব বিবেচনায় নেয়া হয়েছে বলেই স্পেকট্রাম নেয়ার পরদিনই সেবা চালু করতে বলা হয়নি, ছয় মাসের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়েছে।

বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র টেকশহর ডটকমকে জানান, নিলাম করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

অপারেটরদের আপত্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকার যেটি নির্ধারণ করে দেবে সেটিই হবে। আপত্তি তুলে কোনো কাজ হবে না। সরকারের অনুমোদন নিয়েই আমরা এটি করছি। নিলামে তারা অংশগ্রহণ করবে আশাকরি।

এবারে ‘রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অকশন-২০২২’ নামে নিলামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিলামে প্রতি মেগাহাটর্জ স্পেকট্রামের ফ্লোর প্রাইস বা বেইজ প্রাইস থাকছে ৬ মিলিয়ন ডলার, টাকার হিসাবে যা ৫১ কোটি ৯০ লাখের একটু বেশি।

এতে স্পেকট্রাম ক্রয়কারীদের জন্য ফাইভজি সেবা চালুর জন্য ৬ মাসের রোলআউট অবলিগেশন দেয়া হয়েছে। নিলামের দিন হতে এই সময় ধরা হবে।

রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘তরঙ্গ নিলামের নীতিমালা হাতে পেয়েছি, কিন্তু এখনও ফাইভজি নীতিমালা পাইনি। ফাইভজি নীতিমালা না দেখে এবং যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ না করে এতো কম সময়ের মধ্যে এতো বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে যাওয়া আমাদের জন্য কঠিন।’

‘কমিশনের প্রতি আমাদের আহবান, প্রথমে আমাদের ফাইভজি নীতিমালাটি প্রদান করা এবং তারপর একটি কার্য‌কর নিলাম অনুষ্ঠানের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পর্যাপ্ত সময় দেয়া হোক’ উল্লেখ করেন তিনি।

সাহেদ আলম বলেন, ‘নিলামে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে আমরা জানিয়েছি, ফাইভজি স্পেকট্রামের নিলামকে টুজি, থ্রিজি বা ফোরজি স্পেকট্রামের আদলে বিবেচনা করা ঠিক হবেনা। এটা মাথায় রাখতে হবে, প্রত্যাশিত ফাইভজি সেবা চালু করতে বিপুল পরিমাণ স্পেকট্রাম প্রয়োজন।’

‘একটি কার্য‌কর সেবা চালু করতে যে পরিমাণ স্পেকট্রাম প্রয়োজন প্রস্তাবিত মূল্যে সে পরিমাণ স্পেকট্রাম কেনা রবির পক্ষে সম্ভব হবে না’ বলছিলেন তিনি।

গ্রামীণফোনের ভারপ্রাপ্ত চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার হোসেন সাদাত টেকশহরডটকমকে বলেন, নিলামের নির্দেশনা পর্যালোচনা করছে গ্রামীণফোন। তবে এ বিষয়ে তাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে যেতে চান তারা।

‘গ্রামীণফোন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সঠিক আলোচনার মাধ্যমে স্পেকট্রামের দাম এবং শর্ত নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব, যা ভবিষ্যতে এ খাতের উন্নয়ন সহায়ক হবে’ উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলালিংকের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি কর্মকর্তা আংকিত সুরেকা টেকশহর ডটকম বলেন, তারা বিশ্বাস করেন নিলামের জন্য যে তারিখ দেয়া হয়েছে সেটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এরকম নিলামের জন্য অনেক প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের প্রয়োজন হয়।

‘আমরা মাত্র ২০ দিনের মতো কার্যদিবস পাচ্ছি প্রস্তুতির জন্য যেখানে প্রয়োজন কমপক্ষে ছয় মাস। এছাড়া ২০২১ সালে স্পেকট্রাম কেনায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বাংলালিংক। অপারেটরটি এখনও বিনিয়োগ করে চলেছে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও স্পেকট্রাম রোলআউটে। গ্রাহকরা যার সুবিধা পেতে শুরু করেছে ’ বলেছিলেন তিনি।

আংকিত বলেন, এই অবস্থায় এক বছরের মধ্যে আরও একটি বড় বিনিয়োগ ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়ীক প্রেক্ষাপট- উভয় দিকেই চ্যালেঞ্জিং। এই নিলাম ভবিষ্যত প্রযুক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে যেখানে সরকারি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নানা আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন।

‘আমরা আশাকরছি বিটিআরসি উদ্ভুত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবতার নিরিখে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নেবে’ উল্লেখ করেন তিনি।

এবারে মোট ১৮ ব্লকে স্পেকট্রাম নিলাম হবে। এরমধ্যে ২ দশমিক ৩ গিগাহার্টজ বা ২৩০০-২৪০০ মেগাহার্টজে ৬টি ব্লক এবং ২ দশমিক ৬ গিগাহার্টজে বা ২৫০০-২৬৯০ মেগাহার্টজে ১২ টি ব্লক রয়েছে।

২৩০০-২৪০০ মেগাহার্টজে প্রতি ব্লকে ১০ মেগাহার্টজ করে স্পেকট্রাম নিলাম হবে। ২৫০০-২৬৯০ মেগাহার্টজেও প্রতি ব্লকে ১০ মেগাহার্টজ করে স্পেকট্রাম উঠবে।

‘বিড আর্নেস্ট মানি রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকা । যা অপারেটরগুলোকে জমা দিতে হবে ২৩ মার্চের মধ্যে।

এছাড়া স্পেকট্রাম ক্রয়মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ নিলামের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার দিন হতে ৬০ দিনের মধ্যে দিতে হবে ক্রেতাকে। আর অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ অর্থ ৯ বছরে সমান কিস্তিতে দেয়া যাবে।

নিলাম নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে ৮ মার্চের মধ্যে অপারেটরগুলোকে জানাতে হবে। নিলাম নিয়ে অপারেটরগুলোর সঙ্গে প্রস্তুতি বৈঠক হবে ১০ মার্চ।

আর ১৪ মার্চের মধ্যে নিলামে অংশগ্রহণের আবেদন জমা দিতে হবে এবং যোগ্য অংশগ্রহণকারীর তালিকা প্রকাশ করা হবে ১৬ মার্চ। নিলাম পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন নিয়ে আলোচনা ২১ মার্চ।

*

*

আরও পড়ুন