কাজ চালাতে জঙ্গিদের ‘ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগ এরিকসনের বিরুদ্ধে

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ব্যবসা চালিয়ে যেতে কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা এবং আইএস জঙ্গিদের ‘ঘুষ’ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে  সুইডেনভিত্তিক টেলিকম কোম্পানি এরিকসনের বিরুদ্ধে ।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রয়েছে নানা দুর্নীতির অভিযোগ । এরআগে এরিকসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং একটি দেশের মন্ত্রীকে ‘ঘুষ’ দেয়ারও অভিযোগও এসেছে।

বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের কাছে ফাঁস হওয়া এরিকসনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ হয়েছে । প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ইরাকের ইসলামিক স্টেট (আইএস) নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়ে ঠিকাদারদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি ।

Techshohor Youtube

তদন্তে বলা হচ্ছে, আইএস অঞ্চলে একটি রুট ব্যবহার করার জন্য এরিকসন জঙ্গিদের ‘ঘুষ’ দিয়েছে এমন প্রমাণ রয়েছে ।

এরিকসনের অভ্যন্তরীন নথিতে দেখা গিয়েছে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন দেশে দুর্নীতি কর্মকান্ড এবং কয়েক মিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়ে আসছে এরিকসন। এর মধ্যে লেবাননের বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে কয়েকবছর ধরে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের উপহার সামগ্রী দেয়া হয় । যারমধ্যে দেশটির সাবেক টেলিকম মন্ত্রীকে স্টকহোমে বিলাসবহুল ভ্রমন বাবদ ৫০ হাজার ডলার দেয়া হয়েছে।

এরিকসন বিশ্বের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এবং যুক্তরাজ্যে ফাইভজি নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপনে কোম্পা অন্যতম ভূমিকা কোম্পানিটির অগ্রনী ভূমিকা রয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে চীনা টেলিযোগাযোগ কোম্পানি হুয়াওয়ের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যে জায়গা করে নিয়েছে এরিকসন।

কনসোর্টিয়াম অব ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) ফাঁস হয়ে যাওয়া নথির পরিপ্রেক্ষিতে এরিকসনের প্রধান নির্বাহী বোর্জে একহোম গত সপ্তাহে স্বীকার করেন যে, ইরাকে দ্রুত পরিবহন রুট পেতে তার কোম্পানি অর্থ প্রদান করেছে এবং আইএস সম্ভবত এই অর্থ গ্রহন করেছে। একহোমের এ মন্তব্যের পর এরিকসনের বাজারমূল্য ৫ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। 

দশটি দেশের দূর্ণীতি কার্যক্রম এবং ঘুষ নিয়ে তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান করেছিলো আইসিআইজে; যা বিবিসিসহ ২৯টি গণমাধ্যমের কাছে শেয়ার করা হয়।

২০১৪ সালে আইএস যখন ইরাকের দ্বিতীয় শহর মসুল দখল করে তখন এরিকসনের জেষ্ঠ্য আইনজীবি ইরাকে কোম্পানিটির কার্যক্রম বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ পরামর্শ গ্রহন করেননি। তারা এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘অকালপক্ক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন এ রকম কিছু করা হলে তা ইরাকে এরিকসনের ব্যবসাকে ধ্বংস করে ফেলবে।

কিন্তু প্রতিবেদনে দেখা যায়, আইএস নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কাজ অব্যাহত রাখার ফলে সেখানে ঠিকাদারদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারন জঙ্গি দলটি বেশ কয়েকজন কনট্রাক্টরকে অপহরন করে জিম্মি করে রেখেছে।

আইএস যখন ইরাকের শহর মসুলের দখল নেয় তখন সেখানে প্রকৌশলীদের একটি দলে কাজ করতেন আফান। তাকে এখানে কাজ চালিয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখার অনুমতি চেয়ে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে সন্ত্রাসী দলটি বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিলো। তিনি সেখানে পৌঁছানো মাত্রই পিকআপভর্তি একদল বন্দুকধারী তাকে অপহরন করে। এরপর এই কর্মকর্তার ফোন থেকে এরিকসনের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে আইএস যোদ্ধারা এবং এ অঞ্চলে কাজ করার জন্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার দিতে বলে কোম্পানিটিকে।

একটি ঘরের ভেতর আফানকে আটকে রাখা হয় এবং একপর্যায়ে এরিকসনের ম্যানেজার ফোররর রিসিভ করা বন্ধ করে দেয়। আফান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি আমাকে পরিত্যাগ করেন, ফোন বন্ধ করে দেন এবং উধাও হয়ে যান।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এরিকসনের ম্যানেজারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বিবিসি এবং আইসিআইজে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।

আটকের এক মাস পর ছাড়া পান আফান। যদিও তিনি বলেছেন এরিকসন তার খোঁজ নেয় নি কিন্তু কোম্পানিটির একজন পার্টনার জানিয়েছেন আইএসের ‘সঙ্গে ব্যবস্থা’ করে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে এবং কোম্পানিটি মুসলে তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছে। কোন ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো এ বিষয়ে কোম্পানিটি কিছু জানায় নি।

তবে আইএসের সঙ্গে কোম্পানিটির এটিই সম্ভাব্য যোগাযোগ নয়। কোম্পানিটির পরিবহন কনট্রাক্টররা সরকারি চেকপয়েন্ট এড়িয়ে আইএস অঞ্চলের মধ্য দিয়ে একটি রুট ব্যবহার করে যা ‘স্পিডওয়ে’ নামে পরিচিত। এরিকসনের তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এই রুট ব্যবহারের জন্য ঘুষ প্রদান করা হয় বলে তারা প্রমান পেয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসুলের একজন সরকারি কর্মকর্তাা জানিয়েছেন, এরিকসন খুব ভালো করেই জানে এখানে কি চলছে। আইএসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবে এখানে এমন কোন বিচক্ষণ ব্যক্তি নেই; তারা এ কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে করে। মসুলে যে কোন প্রকল্প বা কাজের জন্য যে কোন বিলের পারসেন্টেজ নেয় আইএস।

এরিকসন মোট পাঁচটি দেশে ব্যাপক দূর্ণীতির অভিযোগ এড়িয়ে যেতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০১৯ সালে এক বিলিয়ন ডলারে সমঝোতা করে । যদিও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিভাগ কোন মন্তব্য করেনি।

বিবিসি/আরএপি

*

*

আরও পড়ুন