ইডটকোর এসএমপি ঠেকাতে মালয়েশিয়া সরকারের জোর লবিং

আল-আমীন দেওয়ান : মোবাইল টাওয়ার কোম্পানি ইডটকোর লাগাম টানার পদক্ষেপ ‘এসএমপি’ ঠেকাতে তৎপর মালয়েশিয়া সরকার।

যেখানে সরাসরি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়।

সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপি হলে নানা বিধি-নিষেধ আরোপ হতে পারে কোম্পানিটির উপর। ইতোমধ্যে ইডটকো’কে এসএমপি ঘোষণার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে গুছিয়ে এনেছে বিটিআরসি।  

Techshohor Youtube

ইডটকো ২০১১ সালে মোবাইল ফোন অপারেটর রবির সহযোগী কোম্পানি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি লিমিটেড’ নামে ব্যবসা শুরু করে। পরে ‘ইডটকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড’ নাম নিয়ে রবির শেয়ার হস্তান্তর শেষে আলাদা কোম্পানি হয়। রবি এবং ইডটকো দুটিই মালয়েশিয়ার কোম্পানি।

বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র টেকশহরডটকমকে জানান, ইডটকোর এসএমপি ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। এতে এখনও চূড়ান্ত কিছু হয়নি।

অনুসন্ধান : ইডটকোকে নিয়ে বিটিআরসিতে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার

ইডটকোকে এসএমপি ঘোষণার প্রক্রিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাসিম সম্প্রতি বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারের সঙ্গে অনলাইন সাক্ষাত করেন। একই দিনে তিনি সরাসরি দেশে ইডটকো প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার জানান, ২০১৫ সাল হতে বাংলাদেশে ইডটকো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সেটা ২০১৮ সালে টাওয়ার লাইসেন্স দেয়ার আগেই। মালয়েশিয়ান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা ইডটকো লিমিটেডে বিনিয়োগ করা।

‘এসএমপি ঘোষণার মাধ্যমে ইডটকোর বিনিয়োগ হুমকির মধ্যে পড়বে। বিষয়টি নিয়ে মালয়েশিয়ান সরকারের উদ্বেগ রয়েছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে’ উল্লেখ করেন হাজনাহ মো. হাসিম।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ :

এরমধ্যে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তাদের দপ্তরে আমন্ত্রণ জানান। 

যেখানে বিষয় ইডটকোর এই এসএমপি ।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের টাওয়ার ব্যবসায় এসএমপি নির্ধারণের বিষয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করে।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এসব বিষয় উল্লেখ করে বিটিআরসিতে চিঠি পাঠায়। এতে টাওয়ার ব্যবসায় এসএমপি নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।

বিটিআরসির অবস্থান :

মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাসিমের সঙ্গে বৈঠকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার এসএমপি নিয়ে ইডটকো’কে কোনো দুশ্চিন্তা না করতে আশ্বস্ত করেন ।

তিনি সেখানে বলেন, এসএমপি নির্ধারণে ইডটকো’র ব্যবসা বন্ধ হবে না। শুধু কিছু নিয়ম কানুন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এরআগে গ্রামীণফোনকে এসএমপি করা হয়েছে এবং তারা বাজারে বেশ ভালোভাবেই ব্যবসা করে যাচ্ছে।

এরপর বিটিআরসি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের চিঠিরও জবাব দেয়। সেখানে হাইকমিশনকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

বিটিআরসি হাইকমিশনকে জানায়, বাজারে একচোটিয়া আধিপত্য ঠেকানো এবং গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিতে এসএমপির গুরুত্ব রয়েছে। এসএমপি নির্ণায়ক নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিষয়টিও এতে উল্লেখ করে তারা।

বিটিআরসি বলছে, এসএমপি নির্ধারণে ইডটকোর ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে না। এসএমপির কারণে বাজার প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে।

মন গলাতে ডিও লেটার :

দেশে আরেক মালেশিয়ান কোম্পানি মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা বিটিআরসিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াতে ভূমিকার জন্য প্রশংসাসূচক ডিও চিঠি পাঠায় । এতে প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে অভিনন্দনও জানায় তারা। এতে রবি উল্লেখ করে, রবি আজিয়াটা মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারী হিসেবে ক্রমাগত বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। তারা এখানে বিনিয়োগ বাড়াতে ইডটকোর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের ডিজিটাল অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবদান বাড়াবেন।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ যা বলছে :

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলছেন, মালেশিয়ান হাইকমিশনারসহ তাদের প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে এসএমপি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। বাংলাদেশে ইডটকো যেভাবে ব্যবসা করে আসছে সেভাবেই ব্যবসা করতে থাকবে।

তিনি বলেন, দেশে গ্রামীণফোন এসএমপি হয়েছে। অপারেটরটি এখন বেশ ভালোভাবেই ব্যবসা করছে। এমনকি এসএমপির পর তাদের অনেক গ্রাহক বেড়েছে।

যেভাবে এসএমপিতে আটকে ইডটকো :

দেশে টাওয়ার ব্যবসায় ইডটকো ছাড়াও রয়েছে সামিট টাওয়ার, কীর্তনখোলা টাওয়ার এবং এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম। এই তিন কোম্পানি একসঙ্গে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, ইডটকোর কারণে বাজার অস্থিতিশীল এবং প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে।

কোম্পানিগুলো ওই চিঠিতে ইডটকোর বাজার শেয়ার এবং একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের অঙ্গসংগঠন হিসেবে অধিপত্য বিস্তারের বিষয়ে উল্লেখ করে। তারা বলছে, ইডটকো অস্বাভাবিক কম দামে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে বিভিন্ন প্যাকেজ দিয়ে আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে।

এরপর বিটিআরসি এই সম্পর্কিত একটি কমিটি করে দেয়। কমিটি এ বিষয়ে টাওয়ার শেয়ার কোম্পানির এসএমপির নির্ণায়ক ঠিক করে। যেখানে কোম্পানির টাওয়ার সংখ্যা, অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব এবং ৪০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

এবার দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলোর টাওয়ার, রাজস্ব, বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব শেয়ার, বাজার দখলসহ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে কমিটি।

এতে দেখা যায়, ইডটকোর টাওয়ার সংখ্যা ১২ হাজার ৮৯৬টি। যা বাজারের ৯২ দশমিক ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে সামিট টাওয়ারের ৫৮৪টি (বাজার শেয়ার ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ), কীর্তনখোলা টাওয়ারের ৯৭টি (বাজার শেয়ার ০ দশমিক ৬৯ শতাংশ), এবি হাইটেকের ৪০৬টি (বাজার শেয়ার ২ দশমিক ৯০ শতাংশ) টাওয়ার রয়েছে।

আয়ের হিসেবে দেখা যায় (২০২১ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে) ৩০৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা আয় করেছে ইডটকো। যা বাজারের ৯৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।

যেখানে সামিট টাওয়ারের ৮ কোটি ৮০ লাখ (বাজার শেয়ারে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ), কীর্তনখোলার ২৩ লাখ ২২ হাজার(০ দশমিক ০৭ শতাংশ) এবং এবি হাইটেকের ২ কোটি সাড়ে ৫ লাখ (০ দশমিক ৬৪ শতাংশ) আয়। 

এরপর কযেক দফা উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক শেষে বিটিআরসি দেখে এসএমপির নির্ণায়কে ইডটকো নির্ধারিত হয়।

সবশেষ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিক-নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।   

যত যুক্তি ইডটকোর :

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডটকোর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এসএমপি ঠেকাতে তাদের পক্ষে কৌশলগত বিভিন্ন পদক্ষেপ অব্যাহত আছে। তারা বিটিআরসির সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক দফায় আলোচনা করেছেন, কূটনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে।

তারা বলছেন, মালয়েশিয়ার ইডটকো গ্রুপ মনে করে মোবাইল অপারেটদের টাওয়ার রোলব্যাক করা আগে এসএমপির দরকার নেই। আর টাওয়ারের বাজার শেয়ার হিসেবে বাজারে যত টাওয়ার আছে সেটা ধরা উচিত, এখানে শুধু টাওয়ার কোম্পানিদের টাওয়ার ধরে বাজার শেয়ার নির্ধারণ ঠিক হবে না বলে মনে করেন তারা।

বাজারে তিন-চারটি শক্তিশালী কোম্পানি থাকলে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা কম বলেও তাদের ভাবনা।

প্রতিষ্ঠানটির এই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তারা, তাদের গ্রুপ প্রতিনিধিরা এসব বিষয়টি বিটিআরসিকেও জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের সত্যতাও মিলেছে অনুসন্ধানে।

ইডটকোর আনুষ্ঠানিক মন্তব্য :

এসএমপি ঘোষণার কার্যক্রম এবং তা ঠেকাতে মালয়েশিয়া দূতাবাস-সরকারে লবিং বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য ইডটকোর সঙ্গে যোগাযোগ করে টেকশহর ডটকম। যোগাযোগ করা হয় ইডটকোর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স এন্ড প্লানিং ডিরেক্টর ইসরাত জেরিনের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বিষয়ে বলার জন্য তিনি মুখপাত্র নন।

এরপর যোগাযোগ করা হয় কোম্পানিটির কর্পোরেট কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট আমিনা মুন্নী’র সঙ্গে। তিনি কোনো সাড়া দেননি। এবার ইডটকো’র নিযুক্ত পাবলিক রিলেশন কোম্পানি মাস্টহেড পিআর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, ইডটকো উল্লেখিত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।  

*

*

আরও পড়ুন