Techno Header Top and Before feature image

গাজীপুরের কারখানায় উৎপাদনে নোকিয়া, বছরে ৫০ লাখ হ্যান্ডসেট

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটির ৫ নম্বর ব্লকে যখন গাড়ি পৌঁছলো তখন শেষ বিকেল।

যে ভবনটির সামনে নামলাম, সেখানে আপনিও খানিক থমকে দাঁড়াবেন। হয়তো বিশ্বাস হতে সময় নেবে, বিশ্বে মোবাইল ফোন বাজারের এক সময়ের শীর্ষ কোম্পানি, মহারথী নোকিয়ার কারখানা কী সাড়ম্বরে এখন আপনারই দেশে।

গোধূলী আলোয় ভবনচূড়ায় নোকিয়া নামটি আমাকেও ফিরিয়ে নেয় তার অতীত সম্রাজ্যে, যেখানে একমাত্র রাজার নামটি নোকিয়া।

হাইটেক সিটির এই ব্লকটিতে ৫ একর জায়গার মধ্যে গড়ে উঠেছে নোকিয়ার কারখানা। ভাইব্র্যান্ট সফটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড এই কারখানা করেছে, এটি যুক্তরাজ্যের ভাইব্র্যান্ট সফটওয়্যার এবং বাংলাদেশের ইউনিয়ন গ্রুপের যৌথ উদ্যোগ।

কারখানার ভেতরে যখন পা রাখলাম তখন কর্মীদের ছুটির ঘন্টা পড়বে বলে ।

এখন ১২ টি প্রডাকশন লাইনে কাজ চলছে। এর মধ্যে হ্যান্ডসেট সংযোজন হচ্ছে ৮টি লাইনে আর ৪ টি লাইনে প্যাকেজিং।

ভাইব্র্যান্ট সফটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের হেড অব ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট কর্মকর্তা নাউফ হাসান রিতুন টেকশহর ডটমককে বলছিলেন, আর ৭ মাসের মধ্যে এই প্রডাকশন লাইন তারা ১৬টিতে নিয়ে যাবেন। যেখানে ১২ টি থাকবে সংযোজন ইউনিট আর ৪টি প্যাকেজিং।

তিনি বলছিলেন, এখনকার প্রডাকশন লাইনে তারা প্রতি মাসে আড়াই লাখ হ্যান্ডসেট উৎপাদন করতে পারেন। ২০২২ সালের মার্চ নাগাদ এটি ৫ হতে ৬ লাখ হবে। সে হিসেবে বছরে দেশের এই কারখানা হতে অন্তত ৫০ লাখ হ্যান্ডসেট উৎপাদন করবেন তারা।

চলতি বছরের মার্চে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে সেপ্টেম্বরে উৎপাদন শুরু হয় কারখানায়। নভেম্বরে দেশে উৎপাদিত ‘মেইন ইন বাংলাদেশ’ লেখা নোকিয়া হ্যান্ডসেট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা তাদের।

শুরুতে আসছে ৩.৪ এবং জি ১০ মডেলের হ্যান্ডসেট দুটি। দুটি মডেল মিলিয়ে ৩০ হাজার ইউনিটের মতো বাজারে আসবে বলে জানান কারখানা কর্তৃপক্ষ। এখন স্মার্টফোন দিয়ে শুরু হয়েছে, আসছে বছরের জানুয়ারি হতে ফিচার ফোনও উৎপাদন করবেন তারা।

বর্তমানে এই কারখানায় কাজ করছেন সাড়ে তিন’শ কর্মী । এসব কর্মীর সবাই বাংলাদেশী। এই ডিসেম্বরেই তাদের কর্মী সংখ্যা হয়ে যাবে সাড়ে ছয়’শ।

কারখানা দেখতে দেখতে জানা গেলো, তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিগগির এসকেডি (সেমি নক ডাউন) হতে সিকেডি (কমপ্লিট নক ডাউন) করতে। মানে এখন হ্যান্ডসেটের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট আমদানি করে এই কারখানায় সংযোজন করার কাজটি হচ্ছে আর ৭-৮ মাসের মধ্যে ওসব কম্পোনেন্টের বেশিরভাগ এখানেই তৈরি করবেন তারা।

নাউফ হাসান রিতুন বলছিলেন, দেশে উৎপাদনের ফলে গ্রাহকরা অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী দামে হ্যান্ডসেট কিনতে পারবেন। এছাড়া ভবিষ্যতে তারা এখান হতে রপ্তানিও করবেন।

২০১৭ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজলায় বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটির ৫ নম্বর ব্লকে ৫ একর জায়গা বরাদ্ধ নেয় ভাইব্র্যান্ট সফটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড।

সে সময় ভাইব্র্যান্ট ৪৫ মিলিয়ন ডলার বা বর্তমান হিসেবে ৩৮২ কোটি টাকা বিনিয়োগের উল্লেখ করেছিলো। যেখানে সাইবার সিটি, ডেটা সেন্টার, মোবাইল এবং স্মার্ট ডিভাইসসহ এটিএম কার্ড, স্মার্টকার্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কথা জানিয়েছিলো।

ভাইব্র্যান্ট কর্তৃপক্ষ জানালেন, তারা হ্যান্ডসেটের পাশাপাশি এসব প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনায়ও এগিয়ে যাচ্ছেন। নোকিয়া মোবাইল প্রযুক্তির রূপান্তরের প্রতিযোগিতায় সম্রাজ্য হারিয়ে ২০১৪ সালে মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। বছর দু’য়েকের মধ্যে ফিনল্যান্ডের কোম্পানি এইচএমডি গ্লোবাল নোকিয়া হতে ব্র্যান্ড লাইসেন্স ও মাইক্রোসফট হতে ব্যবসা কিনে নেয়। ২০১৬ সালের শেষ দিকে নোকিয়ার নামে ফিচার ফোন এবং এক বছর পরে স্মার্টফোনও আনতে শুরু করে তারা।

আর সেই হতে হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন না হলেও মোবাইল ফোন বিশ্বে ভালো অবস্থান তৈরিতে তাদের চেষ্টা লক্ষণীয়। বাংলাদেশে করা কারখানা ও ভবিষ্যত বাজার ঘিরে তাদের পরিকল্পনা সে চেষ্টারই ইঙ্গিত দেয়।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিক-নির্দেশনায় সরকার মোবাইল ফোন উৎপাদনে এবং মোবাইল যন্ত্রাংশ আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ছাড়সহ নানা সুবিধা দেয়। বিপরীতে হ্যান্ডসেট আমদানিতে শুল্ক বাড়ায়। ফলে স্থানীয়ভাবে দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোর কারখানার করার হিড়িক পড়ে যায়।

২০১৮ সালে দেশে কারখানা স্থাপন করে সেখানে সংযোজিত হ্যান্ডসেট বাজারে এনেছে ওয়ালটন, সিম্ফনি, স্যামসাং, আইটেল-ট্র্যানসান ও ফাইভস্টার।

এই পাঁচ কোম্পানির পরে লাভা, ওকে মোবাইল, উইনস্টার, ভিভো, অপো, রিয়েলমি দেশে কারখানা করে। এছাড়া সম্প্রতি নোকিয়া ছাড়াও কারখানা করে শাওমি।

*

*