Techno Header Top and Before feature image

বাংলাদেশের এনিগমা সিস্টেমের জাক্সা জয়, এবং পেছনের গল্প

জাপানে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এনিগমা সিস্টেম’! তাদের সাফল্যের গল্প জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

আগে ‘জাক্সা’ চিনে নেওয়া যাক

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জাপান এরোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) কিবো আরপিসি প্রোগ্রামিং চ্যালেঞ্জ আয়োজন করে থাকে।যারা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (আইএসএস) স্বক্রিয়ভাবে চলাচলকারী রোবটের (এসট্রোবি এবং ইনটবল) জন্য প্রোগাম লেখার কাজ করে তাদের নিয়ে হয় এই আয়োজন।

কিবো মূলত জাক্সার গবেষণা মডিউল। এস্ট্রোবি কিবো মডিউলের একটি রোবট। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা দলগুলোকে, এই রোবটটি যাতে সুনিপুণভাবে সবচেয়ে কম সময়ে কাজ করতে পারে সেজন্য প্রোগ্রাম রচনা করতে বলা হয়। যেই দল এই বিষয়গুলোর সবোর্চ্চ পারদর্শিতা নিশ্চিত করতে পারবে তারাই হবে জয়ী।

মোট তিনটি ধাপ রয়েছে এই প্রতিযোগিতায়। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপের রোবটিক অপারেটিং সিস্টেমের উপর বানানো সিমুলেশনে সম্পন্ন হয়। প্রত্যেকটি দলকে জাভা প্রোগ্রামিং ভাষায় প্রোগাম লিখতে হয়েছে সিমুলেশনের জন্য- যেটি হুবুহু আসলটি মত করে কাজ করবে। কিন্তু শেষ ধাপের প্রোগ্রামটি সরাসরি ‘এসট্রোবি’ রোবটে চালানোর জন্য আইএসএসে পাঠানো হয়।

অপেক্ষা, তবে আক্ষেপ নয়

জাক্সা তাদের আয়োজনের প্রথম বছর বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতায় সুযোগ দেয় নি। কিন্তু এমআইটি এবং নাসায় কর্মরত বাংলাদেশী মিজানুল চৌধুরী জাক্সাকে বাংলাদেশকে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ততদিনে এই প্রতিযোগিতার প্রথম আসর শুরু হয়ে গেছে। জাক্সা বাংলাদেশকে পরিদর্শক হিসেবে সুযোগ দেয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মিজানুল চৌধুরী এবং তার তনয়া জাবা জেমিন মিলে স্টেমএক্স৩৬৫ প্রতিষ্ঠা করেন যা একটি বৈশ্বিক শিক্ষা এবং জ্ঞান অনুশীলন প্রতিষ্ঠান। সেখানে বাংলাদেশের দলগুলো তাদের তৈরি প্রোগ্রামগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ পায়।

কত ধাপ পেরিয়ে…

মোট তিনটি ধাপে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আইট্রিপলই রাস স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের ‘এনিগমা সিস্টেম’ প্রথম ধাপে অর্থাৎ ন্যাশনাল রাউন্টে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয়া দলকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়। ন্যাশনাল রাউন্ডে এনিগমা সিস্টেমের পয়েন্ট ছিল ৫৮। এরপর ১৮ জুলাই দ্বিতীয় রাউন্ড বা প্রোগ্রামিং কনটেস্ট রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, সিংগাপুর, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড,মালয়েশিয়া, জাপান এবং ইন্দোনেশিয়া মোট ৯টি দেশ এই রাউন্ডে অংশগ্রহণ করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে দলগুলোকে স্পেসের অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রোগ্রামগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। এই রাউন্ডে থাইল্যান্ডের ইন্ডেন্টেশন ইরর ৮৮.২২ নিয়ে প্রথম, তাইওয়ানের জেমিনি পিওয়াইটিডাব্লিও ৭১.৭৭ নিয়ে দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের এনিগমা সিস্টেম ৫৯.২৮ নিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করে। সর্বশেষ ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় ২৪ অক্টোবর ২০২১। এ রাউন্ডে এনিগমা সিস্টেম (বাংলাদেশ) ১৯.১৬ পেয়ে দ্বিতীয় এবং ইন্ডেন্টেশন ইরর (থাইল্যান্ড ) ২৮.৮৬ পয়েন্ট পেয়ে প্রথম হয়। স্টেমেএক্স এবং বাংলাদেশের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী অর্জন।

কী ছিল তাদের প্রজেক্ট?

প্রজেক্ট সম্পর্কে তারা বলেন,‘আমরা যে প্রোগ্রামটি তৈরি করেছি তা JAXA-এর নির্দেশাবলীর একটি সেট অনুসরণ করে করা হয়েছে। অ্যাস্ট্রোবি রোবটটি অ্যান্ড্রয়েড এবং লিনাক্সে চলে বলে আমাদের অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট এবং জাভা প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছিল। প্রতিযোগিতার জন্য JAXA-এর দেওয়া কিছু প্রাথমিক তথ্য ব্যবহার করে, আমরা Astrobee-কে একটি QR কোড পড়তে, পরবর্তী পয়েন্ট সম্পর্কে তথ্য বের করার জন্য প্রোগ্রাম করেছি। তারপর, 8টি ভিন্ন ভিন্ন এলোমেলো বাধা প্যাটার্ন এড়িয়ে, অ্যাস্ট্রোবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪টি AR ট্যাগ খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আপনি লক্ষ্যের উপর লেজারটিকে যত কাছাকাছি করবেন তত বেশি পয়েন্ট পাবেন, তারপরে আরও বাধা এড়িয়ে যাবেন, বি পয়েন্টে পৌঁছাবেন এবং মিশন সমাপ্তির বার্তা পাঠাবেন। লেজারের নির্ভুলতা এবং টাস্ক সম্পূর্ণ করতে সময় অনুযায়ী ফাইনাল স্কোরিং দেয়া হয়।

প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা

টিম এনিগমা সিস্টেমের নেতৃত্বে ছিলেন মোঃ হাসিবুল ইসলাম, পরামর্শ দিয়েছেন রাজীন বিন ইসা এবং IEEE RAS BRACU SBC এর সদস্যরা। দলের সকল সদস্য STEMX365 এর ছাত্র। প্রতিযোগিতায় তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বলেন,‘ আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল শিক্ষণীয়। আমাদেরকে কোয়াটারনিয়ন কোঅর্ডিনেট সিস্টেম এবং ত্রিকোণমিতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে হয়েছিল। মহাকাশে, সবকিছুই ভাসমান এবং সুনির্দিষ্টভাবে একটি বস্তুকে গতিশীল করতে কোয়াটারনিয়ন স্থানাঙ্ক সিস্টেম এবং ত্রিকোণমিতি প্রয়োজন। তাই অ্যাস্ট্রোবিকে সুনির্দিষ্ট অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাধাগুলি এড়িয়ে এবং লেজারকে টার্গেট করার জন্য আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সঠিকভাবে গণনা করতে হয়েছে। তদুপরি, QR কোডগুলি পড়ার জন্য কেবল একটি লাইব্রেরি ব্যবহার করে সাহায্য না করার কারণে এটি পড়তে ৩ মিনিটের বেশি সময় নেয়, ফলে সেই সময় কমাতে আমাদেরকে একটি ভাল ইমেজ প্রোসেসিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করতে হয়েছিল। এরপর AR ট্যাগের জন্য কাজ করা হয় এবং লেজার ব্যবহার করে লক্ষ্যকে টার্গেট করা হয়। সুতরাং, আমরা এই প্রতিযোগিতায় অনেক অনেক সময় দিতে হয়েছে এবং এটির সুফল আমরা ভালো ফলাফলের মাধ্যমে পেয়েছি।’

*

*

আরও পড়ুন