Techno Header Top and Before feature image

বছরটি ছিলো ‘ভার্চুয়াল’

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : করোনার এ বছরটিকে যদি অন্য নামে উল্লেখ করতে হয় তাহলে ‘ভার্চুয়াল-২০২০’ হিসেবে আলোচনায় থাকবে সালটি। কারণ যে নিউ নরম্যাল লাইফে নতুন পৃথিবী সেখানকার বেশিরভাগ জুড়েই ভার্চুয়াল দুনিয়া।

বাংলাদেশ কতোটা অভ্যস্ত ছিলো এই ভার্চুয়াল বছরে ? করোনার হানা মোকাবেলায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নির্ভরতা ও অর্জনে কী কী আলোচিত ছিলো বছরজুড়ে ? 

জুম-ওয়েবিনার, হোম অফিস-ভার্চুয়াল কর্মক্ষেত্র : বছরটিতে মানুষের মুখে মুখে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল জুম-ওয়েবিনার ও হোম অফিস, অনলাইন ক্লাস। মানুষের নিত্য জীবনযাত্রায় ভার্চুয়াল নির্ভরতা প্রবল হয়ে উঠে।           

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল সভাসহ দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের জুম অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরগুলো বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে তাদের কার্যক্রম চালাতে শুরু করে। করোনার শুরুর ৭ মাসে ১০ লাখ ই-ফাইলের কাজ সম্পন্ন করে সরকার।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু করে হোম অফিস। গ্রামীণফোন, রবি, ইউনিলিভারসহ বড় বড় অধিকাংশ কোম্পানিগুলো, ব্যাংক তাদের কর্মীদের করেনার কারণে হোম অফিসে পাঠায়। গ্লাক্সোস্মিথক্লিন বাংলাদেশ লিমিটেড বা জিএসকে বাংলাদেশ, গ্রামীণফোনের মতো নিবন্ধিত কোম্পানিগুলো ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএমও করে। সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অলনাইনে তাদের ক্লাস, শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে থাকে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডাক্তাররা রোগী দেখতে শুরু করেন। 

এফ-কমার্স, ই-কমার্সে নির্ভরতা : বছরটিতে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সে মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে ব্যাপক। করোনায় লকডাউনের মধ্যে মানুষ দৈনন্দিন বাজারসদাই হতে শুরু করে সবরকম কেনাকাটায় ভরসা করেছে এই অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে। 

এই সময়ে এফ-কমার্স খাতের উল্লম্ফন ঘটে। দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করেন এমন নারী উদ্যোক্তাদের ফোরাম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স এ মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে লাখো উদ্যোক্তা নিজেদের বিকিকিনি নিয়ে যুক্ত হন। কয়েক হাজার সদস্যদের ফেইসবুকভিত্তিক এ ফোরামটি খুব অল্প সময়ে ১০ লাখের বেশি সদস্যের ফোরাম হয়ে যায়।  

ই-ক্যাব বলছে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মধ্যে গত ৮ মাসে ই-কমার্স সেক্টরে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। যেখানে এক লাখ পণ্য ডেলিভারি হয়েছে প্রতিদিন, ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। 

ভার্চুয়াল ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড : করোনার চ্যালেঞ্জ উতড়ে অনুষ্ঠিত হয় ডিসেম্বরের শুরুতে আয়োজন করা হয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মহোৎসব ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০২০। 

বৈশ্বিক এই মহামারীতে পুরো পৃথিবী যেখানে টালমাটাল সেখানে ভার্চুয়ারি এই আয়োজন সম্পন্ন করে সরকার। এতে অ্যাপে পুরো প্রদর্শনী ঘুরে আসতে পারতেন এখন দর্শনার্থী। 

৯ হতে ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ছিলো ‘সোশ্যালি ডিসট্যান্স, ডিজিটালি কানেক্টেড। ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে এর উদ্বোধন করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ।

আয়োজনের মধ্যে ছিলো বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের অংশগ্রহণে মিনিস্ট্রিরিয়াল কনফেরেন্স। কনফারেন্সে মূল বক্তা হিসেবে কিনোট উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ। অনুষ্ঠিত হয়েছে বিষয়ভিত্তিক ২৪টি সেমিনারই ভার্চুয়ালি অনুষ্তি হয়। 

ফ্রিল্যান্সারদের পরিচয়পত্র : ফ্রিল্যান্সারদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে এ বছরে পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে ভার্চুয়াল আইডি কার্ড পোর্টালের উদ্বোধন করেন।

ফ্রিল্যান্সারদের এই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

চলতি বছরের ২৫ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার ৭ দিনের মধ্যের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ২০২০-২১ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সভায় এই কার্ড প্রদান কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এরপর দেশের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারকে ভার্চুয়াল কার্ড দেয়ার পোর্টাল চারু করা হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ সহায়তা এবং হাইটেক পার্কে অগ্রাধিকার পাবেন ফ্রিল্যান্সাররা।

উইটসায় বাংলাদেশের ছয় প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার : তথ্যপ্রযুক্তির অলিম্পিক খ্যাত ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (ডব্লিউসিআইটি) সম্মেলনে উইটসা গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স পুরস্কার পপায় বাংলাদেশের ছয় প্রতিষ্ঠান।

নভেম্বর অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিস অ্যালায়েন্সের (উইটসা) এই সম্মেলনে ৪টি বিভাগে রানার-আপ এবং ২টি বিভাগে মেরিট পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো।উইটসার এই গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২০ এ মোট ১০টি বিভাগে ১০ চ্যাম্পিয়ন ও রানার-আপ এবং ২১টি মেরিট পুরস্কার ছিলো।রানার-আপ পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, কোভিড ১৯ টেক সলিউশনস ফর সিটিজ অ্যান্ড লোকালিটিজ বিভাগে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের এটুআই প্রকল্প এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি লিমিটেড।প্রাইভেট পার্টনারশিপ বিভাগে সরকারের ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ একাডেমি (আইডিয়া) প্রকল্প। ইনোভেটিভ ই-হেলথ সলুসনস বিভাগে মাইসফটের মাই হেলথ বিডি এবং ভার্চ্যুয়াল হসপিটাল অব বাংলাদেশ।
ই-এডুকেশন অ্যান্ড লার্নিং বিভাগে বিজয় ডিজিটাল। এছাড়া মেরিট পুরস্কার পেয়েছে ডিজিটাল অপরচুনিটি অর ইনক্লুশন বিভাগে নগদ এবং সাসটেইনেবল গ্রোথ বিভাগে ডিভাইন আইটি লিমিটেডের প্রিজম ইআরপি।

বাংলাদেশে ফেইসবুকের মামলা : ফেইসবুক ডটকম ডটবিডি (facebook.com.bd) উদ্ধারে দেশের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেইসবুকের মামলা বছরের শেষ দিকে বেশ আলোচিত ঘটনা।

২৩ নভেম্বর ঢাকা জেলা জজ আদালতে ট্রেডমার্ক অ্যাক্ট ৯৬ ও ৯৭ ধারায় এবং ফৌজদারি আইনের ১৫১ ধারায় এসকে সামসুল আলম নামে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ মামলা করে ফেইসবুক। মামলা নম্বর ৪১/২০২০ ।

মামলায় এই ডোমেইন ‘দখলকারীর’ বিরুদ্ধে ৫০ হাজার ডলার (৪৪ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি ডোমেইনটি যাতে ব্যবহার ও হস্তান্তর না করতে পারে সে জন্য এর উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিলো বিশ্বখ্যাত সোশ্যাল মিডিয়াটি। এরপর এই ডোমেইন ব্যবহারে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।

২০২১ সালের ৯ মার্চ মামলার পরবর্তী তারিখ দেয়া হয়েছে । সে পর্যন্ত ডোমেইন ব্যবহারের এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এছাড়া এই নিষেধাজ্ঞা কোনো স্থায়ী করা হবে না- বিবাদীদের সেই ব্যাখ্যা দিতে বলে আদালত।

এসকে সামসুল আলম ডোমেইনটি নিয়ে তা ৬মিলিয়ন ডলার বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপনও দিয়ে রেখেছেন।

এডি/২০২০/ডিসেম্বর২৭/১৭৪০

*

*

আরও পড়ুন