ক্লাউড শুধুই স্টোরেজ নয়...

Evaly in News page (Banner-2)

ক্লাউড প্রযুক্তি কী, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর ব্যাপকতা এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট নিয়ে টেকশহরের মুখোমুখি হয়েছেন হুয়াওয়ে টেকনোলজিস বাংলাদেশের মার্কেটিং ডিরেক্টর এস এম নাজমুল হাসান। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আল-আমীন দেওয়ান।

টেক শহর : ক্লাউড কী ?

এস এম নাজমুল হাসান :  ক্লাউড টার্মটি এসেছে মেঘের ধারণা থেকে। মেঘ যেমন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে কিন্তু সবসময়ই আকাশে পাওয়া যাচ্ছে,  ক্লাউডও ঠিক তেমনি।

শুরুর দিকে যদিও মূল ব্যবহার ছিলো ডাটা স্টোরেজ  কিন্তু ক্লাউডে যে শুধু স্টোরেজ হচ্ছে সেটাই নয়। এখানে ডাটা প্রসেসিংও হচ্ছে। তাই আরেকটু সঠিক হবে যদি বলা হয় – ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’। সহজভাবে বলা যেতে পারে, কম্পিউটারে যে কাজগুলো করা হচ্ছে তার সবই ক্লাউডে করা যাবে। যেমন, একটা কম্পিউটার বা সার্ভার কিনতে গেলে মনে করা হয়  সিপিইউ, প্রসেসর, মাদারবোর্ড, র‍্যাম, হার্ড ড্রাইভ ও নেটওয়ার্ক এমন অনেক কিছুই।  ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একইরকম। কিন্তু পাবলিক বা হাউব্রিড ক্লাউডে এগুলো কোনটিরই কেনার প্রয়োজন হবে না। বরং চাহিদা অনুযায়ী নামমাত্র খরচে এই কম্পিউটিং সিস্টেম ব্যবহার করে আবার ক্লাউডে ফিরিয়ে দেয়া যাবে।

টেক শহর : পাবলিক ক্লাউড আর হাইব্রিড ক্লাউড কী? কোনটির কী সুবিধা?

এস এম নাজমুল হাসান : পাবলিক ক্লাউড সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যে কেউ পাবলিক ক্লাউড সেবা ব্যবহার করতে পারে। এক্ষেত্রে ক্লাউড রিসোর্স থার্ড পার্টি ক্লাউড সেবাদাতার অধীনে থাকবে।

পাবলিক ক্লাউডে সব হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যারসহ অন্যান্য অবকাঠামোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনাও থাকবে ক্লাউড সেবাদাতার অধীনে। পাবলিক ক্লাউড ব্যয় সাশ্রয়ী এবং ব্যবহারকারীর রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা নেই। পাবলিক ক্লাউডে কম্পিউটিং অবকাঠামো (আইএএএস), প্ল্যাটফর্ম (পিএএএস) কিংবা সরাসরি সফটওয়্যার (এসএএএস)ব্যবহার করা যাবে। হাইব্রিড ক্লাউডের ক্ষেত্রে ক্লাউড রিসোর্স শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাই ব্যবহার করবে। হাইব্রিড ক্লাউডে সেবা ও অন্যান্য অবকাঠামো সুবিধা প্রাইভেট নেটওয়ার্কে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে এবং ক্লাউডের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শুধু ওই প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার করবে।

হাইব্রিড ক্লাউড ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লাউড রিসোর্স কাস্টোমাইজ করে নিতে পারবে। যদি প্রতিষ্ঠানের সেবার পরিধি অনেক বেশি হয়, তবে তারা হাইব্রিড ক্লাউড ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো হাইব্রিড ক্লাউড তৈরি করে দেশেই কিছু সার্ভার রাখবেন এবং সেটা যুক্ত করা যাবে এক বা একাধিক পাবলিক ক্লাউড প্রোভাইডারের সাথে।

যেমন হুয়াওয়ে ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এ ক্লাউড সেবা নিয়ে তৈরি হয়ে আছে। যদিও ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশের টেলিকম অপারেটরদের প্রায় সবাই হুয়াওয়ের ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে এবং পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু উল্ল্যেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানও ক্লাউডের সেবা নিচ্ছে। ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিষ্ঠানই নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে এবং সেই সঙ্গে টাইম টু মার্কেট (টিটিএম) কমিয়ে আনতে পারবে এবং খরচও কমে আসবে অনেকাংশেই।

টেক শহর : পাবলিক ক্লাউডের ‍সুবিধাগুলো কীভাবে ব্যবহার হতে পারে ?

এস এম নাজমুল হাসান : দৈনন্দিন জীবনে ক্লাউড সেবা উপভোগ করা হচ্ছে। সেটা ভেহিকেল ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা এমন অনেকক্ষেত্রেই। এসব সেবা পেতে ফোন কিংবা কম্পিউটার থেকে গ্রাহক যে রিকোয়েস্ট করছেন, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো ক্লাউডেই প্রসেসিং হচ্ছে। এক্ষেত্রে, একজন ভোক্তা হিসেবে সেবাটা পাওয়া, আর যে প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে তারাও ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ‘অন-ডিমান্ড’ সেবা দিতে পারছে। ইদানিং ক্লাউড সেবা ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সরকারের করোনাভাইরাসের ওয়েবসাইট ও অ্যাপের কথা। এই অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের তথ্য রয়েছে ঢাকারই এক ক্লাউড প্রোভাইডারের ডাটা সেন্টারে। তাই, এর ব্যবহারকারী দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকেন না কেনো এর সেবা উপভোগ করতে পারছেন। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্টার্টআপ বা এসএমই ইকোসিস্টেমে আমূল পরিবর্তন সম্ভব। এতে প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হবেন। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন ব্যয়ভার কমবে ও পরিচালন দক্ষতা বাড়বে এবং অন্যদিকে গ্রাহক বা ভোক্তা পর্যায়ে হবে সেবার মানোন্নয়ন।

টেক শহর : বাংলাদেশে ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রেক্ষাপট কেমন ?

এস এম নাজমুল হাসান :  আসলে এই ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অপরিসীম। একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে – ধরুন, আপনি নিজেই একজন উদ্যোক্তা। প্রযুক্তিনির্ভর কিছু করতে গেলেই আপনাকে নানারকম হার্ডওয়্যার ডিভাইস কিনতে হবে। ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণে খরচ, সফটওয়্যার, আন্টিভাইরাস অনেক রকম চিন্তাভাবনা। কিন্তু এসব কেনার কয়েকমাস পরেই সেই ডিভাইস পুরোনো হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং নতুন সেবার চমক নিয়ে আসতে অনেক ক্ষেত্রেই আবার ডিভাইস আপগ্রেড করতে হচ্ছে। ক্লাউড সেবা এ প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দেবে। ফলে ব্যক্তিগত কিংবা স্বল্প পুঁজির স্টার্টআপ অথবা দেশজুড়ে থাকা ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই ক্লাউড হবে অত্যন্ত সহায়ক। স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাখাত, ই-কমার্স সেবা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যবস্থা (ইআরপি, সিআরএম, প্রভৃতি) ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে, টোটাল কস্ট অব ওনারশিপ (টিসিও) অনেকাংশে কমে আসবে, বাড়বে সময়ের সাথে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সবসময় মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা। সর্বোপরি, প্রযুক্তিমনা তরুণরা যারা দেশের শক্তির এক বিরাট উৎস তারা ফ্রিল্যান্সিং ও ক্লাউড প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের জন্য আরও কাজ করার সুযোগ পাবে।

টেক শহর :  ক্লাউডে তথ্য নিরাপত্তা কীভাবে সুরক্ষিত করা হয়ে থাকে?

এস এম নাজমুল হাসান :  ক্লাউডে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নিজেরাই তাদের সার্ভার তৈরি করে নেবেন। হুওয়ায়ে ক্লাউড ওয়েব পোর্টালে গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী র‍্যাম, প্রসেসর, হার্ডড্রাইভ, নেটওয়ার্ক সব নিজের মতো সাজিয়ে নেয়া যাবে। সেখানে সিকিউরিটি প্রোটোকল বা অ্যালগরিদম দিয়ে দেয়া যাবে। এর ফলে পুরো জিনিসটাই ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকছে। প্রতিটি ইন্টারফেসে ব্যবহারকারী নিজেই প্রয়োজন অনুযায়ী সিকিউরিটি সার্ভিস কনফিগার করতে পারবেন। আর নিজেই সবকিছু করার ফলে পুরো ব্যবস্থাটাই থাকছে নিরাপদ। ক্লাউডে যেহেতু অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান একসাথে সেবা নিচ্ছে তাই উন্নত মানের সর্বাধুনিক ফায়ারওয়ালের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। যেটা হয়তো একার পক্ষে ব্যবহার করা অনেক বেশি খরচের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতো।

টেক শহর : কোভিড ১৯ এর সময়ে ক্লাউড কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

এস এম নাজমুল হাসান : উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা সবসময়ই প্রয়োজন, কিন্তু এই মহামারির সময়ে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। হুয়াওয়ে ইতোমধ্যেই কোভিড-১৯ নিরীক্ষায় ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমাধান এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে দিয়েছে। এটি দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্টদের কাজে এবং নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ঠিক একইভাবে সামগ্রিক উপায়ে চিকিৎসাখাতে সাশ্রয়ী উপায়ে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নে ক্লাউড প্রযুক্তি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

পাশাপাশি ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবনী উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। কোভিড-১৯ এর বিস্তারের কারণে ই-লার্নিং এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কিন্তু এখন ভাবতে হবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অনেক ব্যয়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে কিন্তু এর সহজ এবং কার্যকরী সমাধান সম্ভব। ক্লাউডের মাধ্যমে সমন্বয়মূলক শেখার পরিবেশ তৈরি করা যাবে।

এছাড়াও শিল্পখাতের উন্নয়নে, বিশেষ করে পোশাক খাতে ক্লাউড সেবা ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্লাউডের মাধ্যমে অটোমেশন প্রক্রিয়া অনেক সহজলভ্য হবে।  এতে বর্তমানের সঙ্কটকালে এ খাতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

টেক শহর : ক্লাউডে হুয়াওয়ের বিশেষত্ব কী ?

এস এম নাজমুল হাসান : হুয়াওয়ে গত ৩০ বছরের এন্টারপ্রাইজ অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রাহকদের কাছে ক্লাউড সেবা দিচ্ছে। হুয়াওয়ের ক্লাউড ডাটা সেন্টারের ভৌত অবকাঠামো, চিপসেট, সার্ভার, মিডলওয়্যার, সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশনের পুরো সিস্টেমটাই হুয়াওয়ে তৈরি করছে। এ ধরনের এন্ড-টু-এন্ড সক্ষমতা অন্য আর কোনো ক্লাউডে নেই। বরং তাদের অনেকেই হুয়াওয়ের উন্নত সার্ভার, হাই-এন্ড রাউটার কিংবা এ.আই ক্লাস্টারের একনিষ্ঠ ব্যবহারকারী।

হুয়াওয়ে সম্পূর্ণভাবে গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠান এবং তাদের ব্যাবসায়িক সফলতা গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যনির্ভর নয়। হুয়াওযের আরও একটা বড় সুবিধা হচ্ছে ‘ইকোনোমি অব স্কেল’। বিভিন্ন ক্ষেত্রে হুয়াওয়ে নিজেরাই চিপসেট ও প্রযুক্তি তৈরি করছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত ব্যবহারের পাশাপাশি ক্রমাগত উন্নতি সাধন করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি অনেক সাশ্রয়ী দামে এ সেবা দিতে পারছে। পৃথিবীর প্রায় ১৪০টি দেশে হুয়াওয়ে ক্লাউড সেবা দিচ্ছে।

*

*

আরও পড়ুন