অভিযোগের ব্যাখ্যা দিলেন বেশি, স্বীকার করলেন কম

প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ৪ সিইও। ছবি : ইন্টারনেট
Evaly in News page (Banner-2)

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিক ও ডেমক্র্যাট দলের নীতি নির্ধারকদের বিভিন্ন প্রশ্নে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ৪ সিইও।

শুনানিতে ফেইসবুক সিইও মার্ক জাকারবার্গ, অ্যামাজনের সিইও জেফ বেজস, অ্যাপলের সিইও টিম কুক ও গুগলের সিইও সুন্দর পিচাইকে আলাদা আলাদা করে জেরা করেন কংগ্রেসের হাউজ জুডিশিয়ারি সাবকমিটি অব অ্যান্টিট্রাস্টের সদস্যরা।

শুনানিতে ৪ কোম্পানির সিইওর বক্তব্য নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো-

জেফ বেজস

বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজস প্রথমবারের মতো শুনানিতে অংশ নেন। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে নিজস্ব ব্যাখ্যা দেন তিনি। তবে শুনানির প্রথম ২ ঘণ্টায় কোনো কংগ্রেস সদস্য স্বপ্রণোদিত হয়ে তাকে প্রশ্ন করেননি।

নিজেদের পণ্যের দাম কম রাখা, প্রচারণা বেশি চালানো ও থার্ড পার্টি বিক্রেতাদের বিক্রি সংক্রান্ত তথ্য নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে জেফ বেজসকে জেরা করা হয়। বেজস বলেন, অফারের বাইরে নিজস্ব পণ্য কখনও লসে বিক্রি করেনি অ্যামাজন। অন্য কোম্পানির বিক্রি সংক্রান্ত তথ্য দেখার বিষয়ে বলেন, এই ধরণের কর্মকাণ্ড অ্যামাজনে নিষিদ্ধ। তবে কর্মীরা এই নিয়েমর লঙ্ঘন করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

ই-কমার্স জায়ান্টটির বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, বিক্রেতাদের কাছ থেকে অধিক হারে অর্থ নিয়েছে অ্যামাজন। ৫ বছর আগে কোম্পানিটি প্রতিটি পণ্য থেকে বিক্রেতাদের কাছ থেকে ১৯ শতাংশ কেটে রাখতো। বর্তমানে তারা কাটছে ৩০ শতাংশ। গত বছর কোম্পানিটির মোট আয়ের ২১ শতাংশই আসে বিক্রেতাদের ফি থেকে। অধিক হারে ফি নেওয়ার বিষয়ে বেজস বলেন, বিক্রেতারা আগের চেয়ে অ্যামাজনে বেশি ব্যয় করছেন। আগে পণ্য স্টোর করার ব্যবস্থা ছিলো না আমাদের। এখন, পণ্য মজুদ রাখা এবং তা ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে অ্যামাজনের উপর ভরসা রাখছেন থার্ড পার্টি বিক্রেতারা। তাই তাদের ফিও বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, যারা ওয়্যারহাউজে পণ্য রাখার জন্য অ্যামাজনে অর্থ খরচ করছেন তাদের পণ্য‌ই সাজেশনে বেশি থাকছে। এমনটা ঘটছে মার্কেট প্লেস অ্যালগোরিদমের কারণে।

মার্ক জাকারবার্গ

ভুয়া তথ্য সম্বলিত পোস্টে এনগেজমেন্ট বেশি হয় তাই সেগুলো সরানো হয় না- এমন অভিযোগ রয়েছে ফেইসবুকের বিরুদ্ধে।

রিপাবলিকান সদস্য ডেভিড সিসিলাইন বলেন, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন খেলে করনাভাইরাস মুক্ত হওয়া যাবে এবং মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই- এমন তথ্য সম্বলিত কনটেন্টের রিচ অনেক বেশি ছিলো। ভুল তথ্য দুটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাতে ৫ ঘণ্টা সময় নেয় ফেইসবুক।

এ বিষয়ে জাকারবার্গ বলেন, অনেক মানুষ কনটেন্ট দুটি শেয়ার করে। কনটেন্ট দুটি নীতিমালা লঙ্ঘন করায় আমরা তা সরিয়ে নেই।

জবাবে ডেভিড সিসিলাইন তাকে মনে করিয়ে দেন, ৫ ঘণ্টার ব্যবধানে ২ কোটি মানুষ দেখার পর পোস্ট দুটি সরানো হয়েছে।

ফেইসবুকের বিরুদ্ধে আরেকটি অফিযোগ হলো, কোনো অ্যাপ নির্মাতা কোম্পানি অ্যাপ বিক্রিতে রাজি না হলে সেটার ফিচার ক্লোন করে বাজারে ছাড়ার হুমকি দিয়েছে ফেইসবুক।

প্রমাণ স্বরূপ ইনস্টাগ্রামের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কেভিন সিস্ট্রোম ও স্ন্যাপচ্যাটের সিইও ইভান স্পিজেলের সঙ্গে জাকারবার্গের কিছু ম্যাসেজ পড়ে শোনান রিপাবলিকান সদস্য প্রমিলা জয়াপাল।

এ বিষয়ে জাকারবার্গ বলেন, হুমকি বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন তা বুঝতে পারছি না। ওই সময়ে (২০১২ সাল) আমরা ফেইসবুক ক্যামেরা নামের একটি অ্যাপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এটা গোপন ছিলো না, সবাই জানতো। তাই ইনস্টাগ্রামের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি অনুমিতই ছিলো। কোনোভাবেই এটা হুমকির মধ্যে পড়ে না।

২০১২ সালে ফেইসবুকের কাছে ইনস্টাগ্রাম বিক্রি করেন কেভিন। তবে স্ন্যাপচ্যাট বিক্রি করতে রাজি হননি ইভান।

টিম কুক

অ্যাপ নির্মাতাদের অভিযোগ, অ্যাপ স্টোর থেকে যা আয় হয় তার ৩০ শতাংশ কেটে রাখে অ্যাপল। এ অভিযোগের ব্যাখ্যায় টিম কুক তিনি বলেন, অ্যাপ স্টোর থেকে বিক্রি হওয়া ৮৪ শতাংশ অ্যাপ থেকে কোনো ফি নেওয়া হয় না। বাকি ১৬ শতাংশ অ্যাপ ৩০ বা ১৫ শতাংশ হারে ফি দিয়ে থাকে।

এয়ারবিএনবি ও ক্লাসপাস নামের দুটি অ্যাপে সম্প্রতি ভার্চুয়াল এক্সপেরিয়েন্স সুবিধা যুক্ত করা হয়। এতে অ্যাপ দুটির কাছে অধিক অর্থ দাবি করে অ্যাপল। এ বিষয়ে রিপাবলিকান সদস্য হ্যাঙ্ক জনসন প্রশ্ন তোলেন, মহামারীর মধ্যে ডিজিটাল এক্সপেরিয়েন্স যুক্তের অজুহাতে অতিরিক্ত ফি আদায় ন্যায়সঙ্গত কিনা। জবাবে টিম কুক বলেন, ডিজিটাল সেবা নিতে গেলে তা আমাদের কমিশন মডেলের মধ্যে পড়বে।

এছাড়াও, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেদের স্ক্রিন টাইম অ্যাপ আনার পর থার্ড পার্টি স্ক্রিন টাইম অ্যাপ সরানোর অভিযোগও আছে অ্যাপলের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে ইউরোপিয়ান কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন কয়েকজন অ্যাপ ডেভেলপার। বিষয়টি নিয়ে টিম কুক বলেন, বাচ্চাদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় অ্যাপগুলো সরানো হয়। নীতিমালায় পরিবর্তন এনে ৬ মাস পর ৩০টি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ পুনরায় অ্যাপ স্টোরে ফেরানো হয়।

সব অ্যাপ ডেভেলপারদের জন্যই এক নিয়ম মানা হয় বলে জানান টিম কুক।

সুন্দর পিচাই

সারা বিশ্বের সার্চ মার্কেটের ৯০ শতাংশ গুগলের দখলে রয়েছে। একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কোম্পানিটি। এ অভিযোগের জবাবে সুন্দর পিচাই বলেন, সার্চ করা বাদেও গুগলের অসংখ্য সেবা নিচ্ছেন ব্যবহারকারীরা।

জবাবে রিপাবলিকান সদস্য ডেভিড সিসিলাইন বলেন, ৬৩ শতাংশ সার্চেের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদেরকে গুগলেরই নিজস্ব ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়াও, তিনি বলেন, সার্চ লিস্ট থেকে নাম সরানোর হুমকি দিয়ে ইয়েল্প নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিতে চেয়েছে গুগল। এটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণ নয়।

দুটি অভিযোগই অস্বীকার করেন পিচাই। তিনি বলেন, ব্যবহারকারীদেরকে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট বেছে দেওয়াই গুগলের প্রধান উদ্দেশ্য।

ট্রাফিক সার্ভেইলেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুগল প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর ক্ষতি করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পিচাই বলেন, ডেটা পর্যবেক্ষণ করে আমরা ট্রেন্ড বোঝার চেষ্টা করি এবং তা পণ্যের উন্নয়নে কাজে লাগাই যাতে ব্যবহারকারীরা উপকৃত হন।

ভিডিও কনফারেন্সে সাড়ে ৫ ঘণ্টা ধরে চলে শুনানি। ডেভিড সিসিলাইন জানান, পরবর্তীতে শুনানির রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, এই কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী। তাদের কিছু ক্ষমতা কমাতে হবে, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, শতাব্দী পুরানো অ্যান্টি ট্রাস্ট আইন এই ডিজিটাল যুগেও কার্যকর।

পলিটিকো, বিবিসি, দ্য ভার্জ ও অবজারভার অবলম্বনে এজেড/ জুলাই ৩০/২০২০/১৩

আরও পড়ুন –

জেরার সম্মুখীন হবেন ৪ সিইও 

অ্যাপ স্টোর থেকে উবারকে সরানোর হুমকি! 

অ্যামাজন কর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ 

অ্যামাজনের সার্ভারে ৪০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁস 

অ্যামাজনে হাজার হাজার নিষিদ্ধ, ক্ষতিকর, লেবেলহীন পণ্য

*

*

আরও পড়ুন