স্টিভ জবস অ্যাপলকে যেভাবে শিখরে তুলেছেন

অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। ছবি : ইন্টারনেট থেকে
Evaly in News page (Banner-2)

টেক শহর কনেটন্ট কাউন্সিলর : বেঁচে থাকলে আজ ৬৫ বছর পার করতেন অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্টিভ জবস।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে অ্যাপলকে তিনি তুলে এনেছেন শিখরে পৌঁছানোর রাস্তায়। তারই সেই রাস্তা ধরে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৮ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়।

আজকের সেই অ্যাপল এক দিনে এমন অবস্থায় পৌঁছায়নি। সেই পথ সহজও ছিল না। প্রধান নির্বাহীর বদল এবং অর্থনৈতিকভাবে একের পর এক খারাপ প্রান্তিকের মুখোমুখি হওয়াসহ একটা সময় এসে ডুবতে বসেছিল মার্কিন জায়ান্টটি। সেই অবস্থা থেকে নাটকীয় পরিবর্তন করেন স্টিভ জবস। অথচ সহপ্রতিষ্ঠাতা হলেও একটা সময় তাকে দূরে রেখেছিল অ্যাপল।

সেই পরিবর্তনের শুরু ১৯৯৬ সালে। তখনকার সিইও অ্যামেলিও গিল স্টিভ জবসের কম্পিউটার স্টার্টআপ ‘নেক্সট’ কিনে নেয়। একই সঙ্গে অ্যাপলে ফিরিয়ে আনা হয় স্টিভ জবসকে। নেক্সট কেনার উদ্দেশ্য ছিল অ্যাপলকে সুসংহত করা। 

আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডে ধর্মঘট ডেকে বসেন স্টিভ জবস। তাতে সিইও অ্যামেলিও অ্যাপল ছাড়তে বাধ্য হন। জবস সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অ্যাপলকে বাঁচাবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিতে হলেও তিনি অ্যাপলকে রক্ষা করবেন বলে পণ করেন।

১৯৯৬ সালের শেষ দিকে অ্যাপল স্টিভ জবসেকে কোম্পানিতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে। এমনকি দার স্টার্টআপ ‘নেক্সট’ ৪২৯ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় অ্যাপল। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে ম্যাক ওয়ার্ল্ড এক্সপো আয়োজনের মঞ্চে জবসকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যামেলিও গিল মূল বক্তা হিসেবে ডাকেন। সে সময় ম্যাক প্রেমীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের উৎসাহমূলক কথা বলেন জবস।

সে বছর অ্যাপল আনে কাটিং এজ পর্দার পিসি। সেটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যাংকগুলোতো তুমুল জনপ্রিয় হয়। যেখানে ১২ বছরে অ্যামেলিওর নেতৃত্বে কোম্পানি ধুঁকছিল, ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছিল সেখানে নতুন এই ঘোষণায় কিছুটা আশা দেকা যাচ্ছিল।

অবশেষে ১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই জবসকে অ্যাপলের অন্তবর্তীকালীন সিইও ঘোষণা করা হয়। পরে পূর্ণ প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন জবস। সে বছরই আগস্টে আরেকটি ম্যাকওয়ার্ল্ড এক্সপোতে মাইক্রোসফটের কাছ থেকে ১৫০ মিলিয়ন বিনিয়োগ নেবার কথা ঘোষণা করেন তিনি। জবস শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা যে ধরনের সহায়তা পেতে পারি, তার সবই এখন প্রয়োজন।

এমনকি ১৯৯৭ সালে অ্যাপল এমন একটি অবস্থায় পৌঁছায় যে, মাইক্রোসফটের অন্যতম প্রধান পার্টনার ডেলের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল বলেন, স্টিভ জবসের জায়গায় যদি তিনি হতেন তাহলে কোম্পানিটি বন্ধ করে দিয়ে যা পান সেটি তার শেয়ারহোল্ডারদের ফেরত দিতেন।

১৯৯৮ সালের প্রথম দিকেই আরেকটি ম্যাকওয়ার্ল্ড এক্সপো অনুষ্ঠিত হয় স্যান ফ্র্যান্সিসকোতে। সেখানে জবস তার ‘কি নোট’ উপস্থাপন শেষ করেন একটি কথা দিয়ে। ‘আরও একটি বিষয় আছে’ এরপর পর্দায় ভেসে ওঠে, ‘জবসের প্রোডাক্ট ডিরেকশন ও মাইক্রোসফটের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ। অ্যাপল পুনরায় লাভে ফিরেছে।’

এছাড়াও সে বছর জবস প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ পদে বিশ্বব্যাপী অ্যাপলের অপারেশন দেখার জন্য নিয়োগ দেন টিম কুক’কে। পরে কুকের পদবি হয় প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা বা সিওও।

দায়িত্ব নেবার পর কর্মীদের প্রতি মনোযোগ দেন স্টিভ জবস। কোম্পানিতে আনেন বড় ধরনের পরিবর্তন। তিনি অ্যাপলের ক্যাফেটেরিয়ায় ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন। কর্মীরা অ্যাপল ক্যাম্পাসে তাদের পোষা প্রাণী নিয়ে আসতে পারবেন বলেও জানান তিনি। আর এতে কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্যোম আসে।

মাইক্রোসফট থেকে বিনিয়োগ পাবার এক বছরের মাথায় অ্যাপল নতুন কিছু করে বসে। আগস্ট ১৯৯৮। অ্যাপল বাজারে ছাড়ে আইম্যাক। যেটা তাদের প্রথম অল-ইন-ওয়ান হাই পারফরমেন্স কম্পিউটার। যার কোড ডিজাইন করেন জবস এবং অ্যাপলে সদ্য যোগ দেওয়া মেধাবী ডিজাইনার জোনাথন আইভ।

সেই আইম্যাক প্রথমবারের মতো বিভিন্ন রঙে বাজারে ছাড়া হয়। আইভের করা সেই ডিজাইনে বিশ্ব কম্পিউটারের নতুন একটা ডিজাইনের স্বাদ পায়। আর এটি এমনই সাড়া ফেলে যে প্রথম ৫ মাসেই বিক্রি আট লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে যায়।

নতুন ম্যাক আনার পর জবস তার নাম দিতে চেয়েছিলন ‘ম্যাকম্যান’। কিন্তু অ্যাপলের বিজ্ঞাপনী সংস্থার এক্সিকিউটিভ কেন সেগাল এর নাম সাজেস্ট করেন ‘আইম্যাক’। এখানে ইংরেজি ‘আই’ অক্ষর দিয়ে কেন বুঝালেন  ‘ইন্টারনেট’।  আর সেটি ওয়েবে সংযুক্ত করতে মাত্র দুটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। জবসের মনে ধরলো সেই নাম। অ্যাপল তাই ‘স্বাতন্ত্র্যতা ও উদ্ভাবন’ হিসেবেই মনে করেন এই নামকে।

১৯৯৯ সালে অ্যাপল ‘আইবুক’ নামে এন্ট্রি লেবেলের ল্যাপটপ পরিচয় করিয়ে দেয়। এটি আইম্যাকের সফলতাকে আরও এগিয়ে নেয়।

২০০১ সাল। অ্যাপলের জন্য সবচেয়ে নাটকীয়তার বছর। সে বছর প্রতিষ্ঠানটি ‘ম্যাক ওএস এক্স’ অপারেটিং সিস্টেম উন্মোচন করে। অ্যাপল তখন ম্যাক ওএস ৮ এবং ৯, ওএস এক্সকে রিডিজাইন করে। যেটা ছিল ইউনিক্স ও বিএসডি প্রযুক্তর উপর নির্ভর করে তৈরি করা। আর এটা করতে সবচেয়ে বেশি সহায়তরা করে জবসের উদ্যোগ নেক্সট।

সেই অপারেটিং সিস্টেম আনার পর পিছন ফিরে দেখতে হয়নি অ্যাপলকে। ২০০১ সালেই অ্যাপল প্রথম তাদের রিটেইল স্টোর চালু করে ভার্জিনিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ায়।

সে বছরের অক্টবরেই স্টিভ জবস বাজারে ছাড়েন আইপড। যা একটি ডিজিটাল মিউজিক প্লেয়ার। এর মাধ্যমে এক হাজার গান ছোট একটি ডিভাইসে পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে মানুষ। যদিও এর শুরুটা একটু ধীর গতির ছিল। আর দাম শুরু হয়েছিল ৩৯৯ ডলার থেকে।

২০০৩ সালে অ্যাপল আইটিউনস মিউজিক স্টোর চালু করে। মূলত এর মাধ্যমে আইপডের চিন্তাকে ডিজিটালি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায় অ্যাপল। আর এর গান প্রতি তখন গুণতে হতো ০.৯৯ ডলার।

ক্যারিয়ারের যখন তুঙ্গে ছিলেন স্টিভ জবস ঠিক সেই সময়ে তিনি পান দুঃসংবাদ। ২০০৩ সালে শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে তার ডাক্তার জানান তিনি প্যানক্রিয়েটিক বা অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে কথাটি তিনি ২০০৪ সাল পর্যন্ত কর্মীদের কাছে গোপন রাখেন।

অন্যদিকে মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে অ্যাপল বড় ধরনের উলম্ফন করতে সক্ষম হয়। যেখানে ২০০৩ সালে অ্যাপলের শেয়ার প্রতি দাম ছিল ৬ ডলার তা ২০০৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ ডলারে।

এর মধ্যে ২০০৪ সালে জবস প্রোজেক্ট পার্পেল নিয়ে কাজ শুরু করেন। জবসের তত্ত্বাবধানে এবং আইভের মাধ্যমে কাজটি শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটি টাচ স্ক্রিন ডিভাইস তৈরি। জবস চেয়েছিলেন ট্যাবলেট তৈরি করতে। কিন্তু দুর্ঘটনা বা ঘটনাচক্রে সেটি হয়ে যায় স্মার্টফোন। চলতে থাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উন্নয়ন।

২০০৫ সালে মটোরোলা অ্যাপলের সঙ্গে পার্টনারশিপে ‘রকার’ নামের ফোন আনে। এটাই প্রথম ফোন যেখানে আইটিউন মিউজিক স্টোর থেকে মিউজিক প্লে করা যেত। তবে সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতায় মাত্র ১০০ গান স্টোর করা যেতো তখন।

২০০৬ সাল; জবসের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে বছর ইন্টেল প্রসেসরে নতুন ম্যাকবুক প্রো বাজারে ছাড়া হয়। একই সঙ্গে আনা হয় নতুন আইম্যাক। এর ফলে ম্যাকে উইন্ডোজ ব্যবহারের দরজা খুলে যায়।

সে বছরই নতুন আরেকটি স্টোর চালু করা হয় ম্যানহাটনে। যার পুরো ডিজাইন ছিল কাঁচের। এটি বিশ্বব্যাপী নজর কাড়ে। কিন্তু ততদিনে জবসের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে।

ওই বছরেই স্টিভ জবস তার কর্মীদের কাছে একটি ইমেইল করেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আমার টিম সম্পর্কে মাইকেল ডেলের ভবিষ্যৎবাণী সঠিক ছিল না। ঠিক আজকের দিনের শেষে যদি তুলনা করি তবে দেখবো, শেয়ারবাজারে ডেলের উপরে রয়েছে অ্যাপল। শেয়ারবাজার সবসময় ওঠানামা করে জানি। আগামীকাল যে এমনটাই থাকবে না সেটাও জানি। কিন্তু আমি মনে করি, এই  যে বৃদ্ধি এটা আমাদের কাজের প্রতিফলন’।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০০৭ সালে স্টিভ জবস উন্মোচন করেন নতুন এক দিগন্তের। যার নাম আইফোন। স্টাইলাস ছাড়াই টাচে খুব সহজেই কাজ করা শুরু হয় সেই ফোনে। সে বছরই ম্যাক ওয়ার্ল্ডে প্রথম ঘোষণা আসে মোবাইলে একটি পূর্ণাঙ্গ সাফারি ব্রাউজারের।

চমক কতটা অপেক্ষা করছিল সেটি হয়তো অ্যাপল নিজেও তখন কল্পনা করেনি। আইফোন বাজারে ছাড়ার মাত্র ৭৪ দিনের মাথায় ১০ লাখ ইউনিট বিক্রি হয়। ২০০৮ সালে অ্যাপল আইফোনের জন্য সবচেয়ে বড় আপডেট আনে। সেবছর তারা থ্রিজি কানেক্টিভিটি চালু করে, একই সঙ্গে চালু হয় জিপিএস। সেই সঙ্গে অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপল ছাড়াও অন্যান্য ডেভেলপারদের অ্যাপ পাওয়া শুরু হয়। সে বছরই অ্যাপ ডেভেলপারদের জন্য নতুন একটি ঘোষণা আসে বিনিয়োগের।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের ইভেন্টে স্টিভ জবস ‘কি নোট’ উপস্থাপনের পর নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানান।

২০০৯ সালে স্টিভ জবস অন্তবর্তীকালীন সিইও হিসেবে টিম কুককে দায়িত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি অসুস্থাজনিত ছুটি বাড়িয়ে নেন। তখন থেকেই অবশ্য টিম কুক অ্যাপলের সিইও’র দায়িত্ব পালন করছেন। আর ‘কি নোট’ উপস্থাপনের ভারও তার উপরেই পড়ে।

২০১০ সালে অ্যাপল প্রথমবারের মতো ‘আইপ্যাড’ নামে ট্যাবলেট নিয়ে হাজির হয়। যেটির কাজ অন্তত ২০০০ সাল থেকেই শুরু করে অ্যাপল।

২০১১ সালে চিকিৎসা ছুটিতে যাবার আগে নতুন দুটি পণ্যের ঘোষণা দেন স্টিভ জবস। একটি মার্চে আইপ্যাড ২ এবং জুনে আইক্লাউড সার্ভিস।

সে বছরই স্টিভ জবস সর্বশেষ জনসম্মুখে আসেন জুনে, যখন তিনি কুপার্টিনো সিটি কাউন্সিলে অ্যাপল ক্যাম্পাসের প্রস্তাব করেন। অ্যাপল পার্ক নামের স্পেসশিপ ক্যাম্পাসটি নির্মাণের পর ২০১৭ সালে চালু করা হয়।

২০১১ সালে ২৪ আগস্ট অ্যাপলের সিইও পদ ছেড়ে দেন জবস। তবে নিতে হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। খুব বেশি দিন তাকে সেই পদে থাকতে হয়নি। ৫ অক্টোবর ২০১১। ক্যান্সারের কাছে হার মানের জবস। একই সঙ্গে সমাপ্ত হয় অ্যাপলে জবস অধ্যায়।

এরপর পূর্ণকালীন সিইওর দায়িত্ব শুরু হয় টিম কুকের। স্টিভ জবস যাকে আস্থা করে তার তৈরি মহাসড়ক দেখিয়েছিলেন, তিনি অবশ্য রেখেছেন জবসের মান। প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পৌঁছে দিয়েছেন। যে যাত্রা শুরু করেছিলেন জবস, সেই পথে এখনো দাঁড়িয়ে টিম কুক।

ইএইচ/ ফেব্রু ২৫/ ২০২০/ ২০০০

*

*

আরও পড়ুন