Header Top

বাংলা ডোমেইনের করুণ হাল

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : অবহেলার ভাগ্য কাটলো না বাংলা ডোমেইন ডটবাংলার।

এক এক করে বছর যায় বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার জাতীয় পরিচয়ের এই মাধ্যম যেন আরও হারিয়ে যায়।

অথচ ওয়েব ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে লেখা ইউআরএল বা ইউনিফর্ম রিসোর্স লোকেটর বাংলায় লেখার এই অধিকার পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে অর্ধযুগেরও বেশি সময়।

অনুমোদন পাওয়ার প্রায় সাড়ে তিন বছর হতে চললো বাংলাদেশে এই ডটবাংলা ডোমেইনের ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।

দেখা যাক ডটবাংলার ব্যবহারের সরেজমিন :

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ডোমেইনে প্রথম ওয়েবসাইট করে দেশীয় মোবাইল ব্র্যান্ড উই। যদিও এখন এর ডোমেইন আর সক্রিয় দেখা যায় না।

এর বাইরে সরকারের এটুআইয়ের সম্পত্তির হিসাব সংক্রান্ত ওয়েবসাইট উত্তরাধিকার.বাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের বিপিআই.বাংলা, বেসরকারি একটি উদ্যোগের কৃষি.বাংলা ওয়েবসাইট সক্রিয় দেখা যায়। তবে হালনাগাদসহ সক্রিয় ওয়েবসাইটের সংখ্যা নামমাত্র।

বাংলা উইকিপিডিয়ার উইকিপিডিয়া.বাংলা এবং উইকিমিডিয়া.বাংলা চালু করা হয়। কিন্তু এই দুটি ডোমেইন অ্যাড্রেসবারে লিখে সার্চ করলে যে ওয়েবসাইট আসে তা ইংরেজি ডোমেইনে যাওয়া। বিটিসিএল.বাংলা ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাই। ডটবাংলা ডোমেইন নেয়া কিছু ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়। এগুলোর এই ‘সক্রিয়তা’ প্রশ্নবিদ্ধ।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ইএমআরডি.বাংলা এবং জ্বালানিওখনিজসম্পদ.বাংলা ডোমেইন চালুর নোটিশ পাওয়া যায়। প্রায় একই সময়ে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের জন্য চারটি ডটবাংলা ডোমেইন সংরক্ষণে নোটিশ দেয়া হয়।

এগুলো নাম হচ্ছে, আইনমন্ত্রণালয়.বাংলা, লেজিসলেটিভবিভাগ.বাংলা, বাংলাদেশেরআইন.বাংলা, বাংলাদেশেরকোড.বাংলা।
কিন্তু অ্যাড্রেসবারে কার্যত এসব ডোমেইন কাজ করে না, ওয়েবসাইট মেলে না। এরমধ্যে রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুব্যত্রাম.বাংলাও।

এগুলো গত এক বছর আগেও এমন ছিল। ডটবাংলায় সরকারি দপ্তরের অনেক ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়।

তবে ডটবাংলা ডোমেইন নেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর সংস্থার নামই বেশি। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে নির্দেশনা দিয়ে নিজ নিজ নামে ডটবাংলা ডোমেইন নিতে বলা হয়েছে। আসলে এমন করে সরকারি দপ্তরগুলোই কোনোরকম এই ডটবাংলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

বিটিসিএল ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জানায়, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে তাদের ডটবাংলা ডোমেইন সক্রিয় ৫৯৫টি।

ব্যবহার বাড়াতে যত পদক্ষেপ :

ডটবাংলা চালুর এক বছর পর অবস্থা বেগতিক দেখে ২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ওই সময়ের বিটিসিএলের এমডি মাহফুজ উদ্দিন আহমেদ ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবকে চার পৃষ্ঠার চিঠি দেন।

ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘পরিতাপের বিষয় এই যে, ডোমেইন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক সুবিধা প্রণয়ন করা সত্ত্বেও .বাংলা ডোমেইন সরকারি, বেসরকারিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেন বা নিবন্ধনে এখনও আশানুরুপ সাড়া পড়েনি বললেই চলে।’

তাই তারা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এই ডোমেইন বাস্তবায়নে প্রশাসনিক নির্দেশনা চান।

ওই চিঠিতে এসব বিষয়ে ৫টি প্রস্তাব দেয়া হয়। এরমধ্যে ৫ নম্বর প্রস্তাব ছিল দপ্তরগুলোতে ডটবাংলা বাস্তবায়নে বিটিসিএলের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাও সার্বিক সহযোগিতা করবেন।

ওই চিঠির প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৪ অক্টেবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসককে তাদের অধীনস্থ সকল দপ্তর, সংস্থাকে বিটিসিএলের ডটবিডি ও ডটবাংলা ডোমেইন বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশন এবং ডাইনামিক ওয়েবসাইট তৈরির নির্দেশনা প্রদান করে।

এরপর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে মোস্তাফা জব্বার এই ডোমেইন যাতে প্রতিষ্ঠিত হয় তার উদ্যোগও নেন।  সব ডোমেইন এক ক্যাটাগরি করে দেন।  বিটিসিএলের রাখা ডোমেইনের দাম ২৫ হাজার হতে তিনি ৮০০ টাকায় নামিয়ে নিয়ে আসেন।

এছাড়া ডোমেইনের জন্য অনলাইনে আবেদন, বরাদ্দ ও পেমেন্টের ব্যবস্থাও করার নির্দেশনা দিয়ে দেন তিনি।

কিন্তু এরপরও এই ডোমেইনের দায়িত্বে থাকা বিটিসিএল এটি জনপ্রিয় করতে পারেনি, এটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য করতে পারেনি।

ব্যর্থতা কোথায় ?

ডটবাংলা অনুমোদনে কার্যকর ভূমিকা রাখা বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘের ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফোরামে (আইজিএফ) মাল্টি স্টেকহোল্ডার এডভাইজারি গ্রুপের সদস্য সুমন আহমেদ সাবির বিষয়টি নিয়ে টেকশহরডটকমকে বলেছিলেন, শুধু চালু করে রেখে দিলে মানুষ কেনো এটি ব্যবহার করবে। ডটবাংলার ব্যবহারই দেখা যায় না। কিছু ডোমেইন শুধু নিবন্ধন করে রেখে দিয়েছে।

‘ডটবাংলার জন্য কার্যকর প্রচার-প্রচারণা ও প্রমোশন নেয়া হয়নি। শুধু ডোমেইন নিবন্ধন করে ফেলায় এক ধরণের গিমিক তৈরি করা ছাড়া কাজের কিছু হয়নি। যেখানে লাখ লাখ ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন হয় সেখানে এই শ’ পাঁচেক ডোমেইন কোনো নাম্বারই না’ বলছিলেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও বাংলায় লিখে কোনো ওয়েবসাইট খোঁজার বিষয়টি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে দেখা যায় না। বাংলা ডোমেইনে প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট তৈরি না হলে ব্যবহারকারীরা এটি করবেন না এটাই স্বাভাবিক। তৈরি করতে হবে প্রয়োজনীয়তাও। কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণায় গুরুত্ব না দিলে এটি তো এমনি জনপ্রিয় হবে না বা মানুষের কাছে যাবে না।

সেই প্রয়োজনীয়তা তৈরির ইকোসিস্টেমই করা যায়নি।

নীতি-নির্ধারকরা যা বলছেন :

বাংলা ডোমেইনের এমন অবস্থার বিষয়ে ক্ষোভ স্বয়ং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের। যখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন না তখনও ডটবাংলা অনুমোদনে সোচ্চার ছিলেন, এটি রক্ষায় তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

মোস্তাফা জব্বার বুধবার বলেন, আমরা বাংলা ভাষায়  পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র দেশ। ডটবাংলা তো মানুষের কাছে এভেইলেবল করতে হবে, মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে।

বিটিসিএলের ব্যর্থতার কথা তুলে উষ্মা প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, এটিকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সব রকম চেষ্টা করা হবে।

বিটিসিএলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ রফিকুল মতিন বৃহস্পতিবার টেকশহরডটকমকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ডটবাংলাকে জনপ্রিয় করতে নতুন করে পরিকল্পনা নিচ্ছেন এবং কার্যকর উপায় দেখছেন।

ডটবাংলার সংগ্রামের কথা :

ইন্টারনেটে বাংলার জন্য এই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডটবাংলার জন্য আইক্যানে অনলাইনে আবেদন করেন। বাংলাদেশের আবেদনের পর সংস্থাটি বাংলা ভাষাকে মূল্যায়ন করে।

২০১১ সালে ইন্টারন্যাশনালাইজড ডোমেইন নেইমে (আইডিএন) লেখার ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায় বাংলাদেশ। এরপর ইন্টারনেট অ্যাসাইনড নাম্বারস অথোরিটির (আইএএনএ) অনুমোদনও মেলে।

এর আগে ২০০৯ সালের ৩০ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আইক্যানের বার্ষিক সম্মেলনে আইডিএন কান্ট্রিকোড টপ-লেভেল ডোমেইনে বিভিন্ন নন-ল্যাটিন ভাষা সংযুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই বছরের ১৬ নভেম্বর এই সংযুক্তির জন্য প্রথম আবেদন জমা পড়ে। এতে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে সেই ভাষাকে নন-ল্যাটিন এবং রাষ্ট্র অথবা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের স্বীকৃত ভাষা হতে হবে। সেইসাথে কিছু কারিগরি বিষয়ও উতরে যেতে হয়।

সে হিসেবে আবেদন করা ও অনুমোদন নিতে খুব বেশি দেরি করেনি বাংলাদেশ। অথচ এই ডটবাংলার দায়িত্ব কে নেবে সে বিষয়ে আইডিএনের কাছে আবেদন করে তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি অবশিষ্ট ছিলো। কিন্তু ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তই নেয়া হয়নি।

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ, ২০১৬ সাল। শ্রীলংকার কলম্বোয় চলছিল এপনিকের সম্মেলন। সেখানে অংশ নিতে ছিলেন ইন্টারনেট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির। এই ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ এপিনিকের সম্মেলনে আইক্যানের যে টেকনিক্যাল বডির প্রতিনিধিরা এসেছিলেন তাদের সঙ্গে বিডিনগ ও এপনিকের সংঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশীদের নিয়ে বৈঠক করেন।

বৈঠকে টেকনিক্যাল কিছু বিষয় উঠে আসে যার জন্য বিষয়টি আটকে ছিল। আইক্যান তখন স্বাধীন। যুক্তরাষ্ট্রের কমার্স হতে এটি মুক্তি পেয়েছে তার ক’দিন আগেই। ফলে এটি ইউএস কমার্সের অধীনে ছিল না আর। তা নিয়ন্ত্রণ করছিল ইন্টারনেট কমিউনিটি।

আইক্যানের সঙ্গে বৈঠকে তারা সমস্যা চিহ্নিত করে বিটিসিএলের সঙ্গে কথা বলেন। সমস্যাগুলো ঠিক করতে পরামর্শ দেন। বিটিসিএল তা ঠিক করার পর আসে সেই কাঙ্খিত ক্ষণ, ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর আইক্যানের আনুষ্ঠানিক প্রসাশনিক অনুমোদন মেলে।

এরপর আইক্যানের ওয়েবসাইটে রুট জোন ডাটাবেইজে স্পন্সরিং অর্গানাইজেশনে ডটবাংলার স্ট্যাটাসে ঝুলে থাকা ‘নট অ্যাসাইন’ উঠে স্পন্সর অর্গানাইজেশন হিসেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং ডোমেইন ম্যানেজার হিসেবে বিটিসিএলের নাম বসে।

২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই ডোমেইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । এরপর সাধারণ মানুষের জন্য ডটবাংলা উম্মুক্ত করে দেয়া হয় ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ।

আরও পড়ুন –

অবশেষে মিলল ডটবাংলা চালুর অনুমোদন 

ডটবাংলা চালু 

ক্যাটাগরি থাকছে না ডটবিডি ও ডটবাংলা ডোমেইনে

*

*

আরও পড়ুন