রিভিউ আপিল : ৫৭৫ কোটি টাকা দিতে চায় জিপি

গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয় জিপি হাউজ। ছবি : টেকশহর
Evaly in News page (Banner-2)

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : উচ্চ আদালতের  ২০০০ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশনার বিরুদ্ধে রোববার রিভিউ আবেদন করেছে গ্রামীণফোন।

অপারেটরটি এই ২০০০ কোটি টাকার পরিবর্তে প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকা দিতে চেয়েছে।  আর এই টাকা তারা এক বছরে ১২টি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করতে চায়।

বিটিআরসির করা অডিট আপত্তিতে জিপির কাছে মোট পাওনা দাবি ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিটিআরসির অংশ ৮৪৯৪ কোটি আর এনবিআরের অংশ ৪০৮৬ কোটি টাকা।

গ্রামীণফোনের ডাইরেক্টর ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত টেকশহরডটকমকে জানান, ‘ বিটিআরসির পাওনা দাবি করা প্রায় ৮৪৯৪ কোটির টাকার মধ্যে মূল টাকা হলো ২২৯৯ কোটি টাকা, বাকি ৬১৯৪ কোটি টাকা সুদ। পাওনা নিয়ে মতবিরোধের মধ্যে এখন আইন অনুযায়ী এই মূল টাকার ২৫ শতাংশ হিসেবে প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকা জমা দেয়ার আবেদন করা হয়েছে রিভিউয়ে।’

তিনি বলেন ‘ এখন যে নির্দেশনা রয়েছে সেখানে ২০০০ কোটি টাকা দেয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে অনেক বেশি মনে হয়েছে। এটি মূল পাওনা দাবির ৮৭ শতাংশ’

‘আমরা ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বরের আপিল বিভাগের নির্দেশনার সার্টিফাইড কপি পেয়েছি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর। নিয়ামানুযায়ী এক মাসের মধ্যে রিভিউ আপিল করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রোববার তা করা হয়েছে’ বলছিলেন হোসেন সাদাত।

২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বরের আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রয়ারি ২০০০ কোটি টাকা জমা দেয়ার সময়সীমা শেষ হবে।

হোসেন সাদাত বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে একটি অংকের টাকা ডিপোজিটের পর অডিট আপত্তির বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা করছেন তারা। অডিট আপত্তির বিষয়টি নিস্পত্তি হলে পরে  ডিপোজিট করা এই টাকা সমন্বয় হবে।

‘আর ডিপোজিট হিসেবে টাকা জমা দেয়ার পর অপারেটরটির নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি, নেটওয়ার্ক বিস্তারের অনুমোদন, প্যাকেজ, ব্যাংক লোন, বিভিন্ন চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমে এনওসি নিয়ে গ্রাহক সেবা ও ব্যবসায় গতি সঞ্চার করা হবে’ বলছিলেন তিনি।

পাওনা দাবি আদায়ে ২০১৯ সালের ২২ জুলাই অপারেটরটিকে এনওসি দেয়া বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি।

জিপির কাছে পাওনা নিয়ে আগে যা ঘটেছে :

গ্রামীণফোনের জন্ম থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অডিট করে বিটিআরসি। বেসরকারি অডিটদের করা ওই নিরীক্ষায় অপারেটরটির কাছে ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কমিশনের পাওনা বলে উঠে আসে।

মূল ঘটনা শুরু হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলের শুরুতে পাওনা দাবি পরিশোধে জিপিকে বিটিআরসি চিঠি দেয়ার পর।

এরপর নানা দেন-দরবার, অপারেটরটির ব্যাখা, আলোচনার পর কোনো পথ না বের হলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

ওই বছর ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের জন্য বরাদ্দ ব্যান্ডইউথ ক্যাপাসিটি ৩০ শতাংশ ব্লক করে দেয় বিটিআরসি।

তবে ব্যান্ডউইথ ব্যবহার সীমিত করায় সেটি গ্রাহকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে – বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে এনওসি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। ২২ জুলাই অপারেটরটিকে দেয়া হয় এই নির্দেশনা।

আর এনওসি বন্ধের ফলে অপারেটরটির সব প্যাকেজ অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি বন্ধ, নেটওয়ার্ক বিস্তারের অনুমোদনও বন্ধ হয়ে যায় এমনকি ব্যাংক লোন বা কোনো ক্ষেত্রে অন্য কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করাও।

এতেও দাবি আদায় না করতে পেরে ৫ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স (টুজি-থ্রিজি) কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে ১ মাসের সময় দিয়ে অপারেটরটিকে শোকজ নোটিশ দেয় বিটিআরসি।

এরপর অক্টোবরের মাঝামাঝিতে সিদ্ধান্ত হয় অপারেটর দুটিতে প্রশাসক বসানোর।

বিটিআরসির এসব পদক্ষেপের বিপরীতে বসে থাকে না অপারেটরটিও। তারা অবশ্য  এই পাওনাকে অযৌক্তিক বলে আসছে শুরু হতেই।

ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি ব্লকের পর সংবাদ সম্মেলনে আসে জিপি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিআরসির পাওনা দাবির বিষয়টি সুরাহা করতে আরবিট্রেশন বা সালিশের প্রস্তাব রাখে।

এরপর যখন এনওসি বন্ধ হলো আবারও সংবাদ সম্মেলনে আসে জিপি। এবার বিটিআরসির এই উদ্যোগকে জবরদস্তি উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানায় তারা।

এরমধ্যে ২৬ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে আদালতে চলে যায় জিপি।

এবার লাইসেন্স বাতিলের কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দেয় তারা।

৩ অক্টোবর বিটিআরসিকে দেয়া ওই নোটিশে তারা বলে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন তাই এই বিষয়ে বিটিআরসি এমন কারণ দর্শানো নোটিশ দিতে পারে না। টেলিযোগাযোগ আইনের ২৬ ধারা বাদ দিয়ে ৪৬ ধারায় চলে গেছে বিটিআরসি। এখানে অন্য লাইসেন্সিংয়ের মতো আচরণ তাদের সঙ্গে করা হয়নি বলে উল্লেখ করে জিপি।

এসবের মধ্যে সমস্যা সমাধানে প্রথমে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা আলাদা পদক্ষেপ নেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সুরাহা হয়নি। বিষয়টি গড়ায় আইন-আদালতে।

এদিকে বিষয়টি এতটাই বড় হয়ে যায়, অডিট আপত্তির পাওনা নিয়ে আরবিট্রেশনের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে উকিল নোটিশ পর্যন্ত দিয় গ্রামীণফোনের মূল কোম্পানি টেলিনর।

এছাড়া বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি নিয়ে যেতে পারে এমন কথা জানায় অপারেটরটি।

এদিকে আদালত গ্রামীণফোনের আবেদনে বিটিআরসির এনওসি বন্ধের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ দেয় ১৭ অক্টোবর। বিটিআরসি এর বিরুদ্ধে আপিল করে ১৯ অক্টোবর। শেষে ২৪ নভেম্বর আপিল বিভাগ আপিল বিভাগ গ্রামীণফোনকে দুই হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে আদেশ দেন।

ওই আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় তিন মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করতে পারলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে বিটিআরসি।

আর রোববার (২৬ জানুয়ারি) এই আদেশের রিভিউ আপিল করলো গ্রামীণফোন।

এডি/২০২০/ডিসেম্বর২৬/১৬০০

*

*

আরও পড়ুন