Header Top

মন্দ ছন্দে দ্বন্দ্বে বছর গেল টেলিকমের

Evaly in News page (Banner-2)

আব্দুল্লাহ আল মামুন : দেশে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন মোবাইল অপারেটরদের ফোরজির লাইসেন্স দেওয়া হয় তখন তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায় সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে। লাইসেন্স বিতরণের সঙ্গে সঙ্গেই তারা ফোরজির সেবা দেওয়া শুরু করে। মনে আছে, ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত লাইসেন্স প্রদান অনুষ্ঠানেই পাওয়া যাচ্ছিল দ্রুত গতির ফোরজির সিগনাল।

ভাবা যায়, মাত্র কয়েক বছর আগে যেখানে ৩২ হাজার কোটি টাকা খরচ করে থ্রি-জির সেবা দিয়ে মোট বিনিয়োগের তিন ভাগের এক ভাগ অর্থও আসেনি সেখানে আবার নতুন প্রযুক্তির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে দ্বিধা করেনি অপারেটররা। বলাই বাহুল্য, এটা সম্ভব হয়েছে বাজারে অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণেই।

কে কত উৎকৃষ্ট মানের সেবা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে এই ব্রত নিয়ে যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল অপারেটরগুলো তা এক বছরের বেশি টেকেনি। সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হলো যে অপারেটররা নিজেরা আর কোন মোবাইল টাওয়ার বসাতে পারবে না। এর আগে বছর দশেক আগে যেমন নিজেদের বসানো ফাইবার ক্যাবল তুলে দিতে হয়েছিল ট্রান্সমিশন কোম্পানির হাতে তেমন টাওয়ার তুলে দিতে হবে নতুন টাওয়ার কোম্পানির হাতে।

সরকার চাইলে হয়ত এটা করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন কারও ব্যবসায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়। এখানেও তাই হলো— টাওয়ার কোম্পানি আর মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে বোঝাপোড়া হচ্ছে না। সেটা হয়ত একটা সময় ঠিক হয়ে যাবে। অনেক বড় বিনিয়োগের ব্যপার, বোঝাপোড়া হতে সময় লাগতেই পারে। কিন্তু গোল বাঁধলো, যখন মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে এই বাধা আসলো। গত এক বছর কোনো টাওয়ার বসলো না। নতুন টাওয়ার না বসালে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হবে কীভাবে?

অথচ এই মোবাইল অপারেটররাই কিন্তু সরকারকে একক শিল্প হিসেবে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দিয়ে আসছে। তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক বা তারও বেশি সরকারের ঘরেই চলে যায়। এমন কী, কোনো কোম্পানি লাভ করতে না পারলেও মোট আয়ের দুই শতাংশ সরকারের কাছে দিতে হয়। আর লাভ করলে দিতে হয় লাভের ৪০ শতাংশ।

এদিকে দেশের বৃহত্তম দুই অপারেটর গ্রামীণফোন আর রবির অডিটের নিষ্পত্তি যখন হচ্ছে না তখন সরকার তথা নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের ব্যান্ডউইথের ব্যবহার সঙ্কুচিত করলো। কী হলো এতে? গ্রাহকেরা সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলেন। এরপরের ঘটনার ব্যপ্তি আরও বেশি। এবার ওই দুই অপারেটরের বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনা হলো; বন্ধ হয়ে গেল সকল প্রকার নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা অনাপত্তি সনদ প্রদান।

দেশে মোবাইল শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। অথচ গ্রাহক বেড়েই চলেছে। বাড়বে নাই বা কেন, দেশ তো এগিয়ে চলছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে। বঞ্চিতের সংখ্যাও কিন্তু বেশ বেড়ে গেল। গ্রাহকেরা তো বটেই, যেসব বহুজাতিক কোম্পানি অপারেটরদের নানা রকম যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার সরবরাহ করে তাদের বিক্রি গেল থেমে। পাশাপাশি এই কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করতে দেশে গড়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত ছোট কোম্পানিগুলোও হলো ক্ষতিগ্রস্ত। শত শত কর্মীকে কতদিন বসিয়ে খাওয়াবেন আপনি? ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে, তাতে কি ছেদ পড়তে যাচ্ছে?

ভালো গেল না বছরটা মোবাইল খাতের জন্য। এক বিবৃতিতে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ (অবঃ) জানান, ‘বিগত ২০১৯ সালকে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য একটি হতাশার বছর বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই সময়ে মোবাইল খাতে পর পর এমন অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে যা আগে কখনোই ঘটেনি। বছরের প্রথম দশ মাসে নতুন ৭০ লাখ ভয়েস ও ৮০ লাখ ইন্টারনেট (ডাটা) গ্রাহক যুক্ত হলেও শিল্পের আর্থিক অবস্থা বরং আরও দুর্বল হয়েছে।’

tower-techshohor
টেলিকম অপারেটরদের বিটিএস। ছবি : সংগৃহীত

শুধু কী তাই? টেলিযোগাযোগ খাত যেখানে আগে থেকেই করের বোঝায় ভারাক্রান্ত বছরের মাঝামাঝি বাজেটে এসে তা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো। পণ্যের দাম বাড়লে তার ব্যবহার কমে যায়। টেলিকম সেবা চাল-ডাল বা পানি ও বিদ্যুতের মতো জরুরি জিনিস। তাই মূল্য বৃদ্ধি হলে তার চাপ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপরেই পড়ে সবচেয়ে বেশি। এবারো তাই হলো।

এস এম ফরহাদ আরো বললেন, বছরের মাঝামাঝি জাতীয় বাজেটে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর কর বৃদ্ধি করা হয়; উপরন্তু লাভের মুখ দেখেনি এমন কোম্পানির সর্বনিম্ন কর্পোরেট কর অন্তত আড়াই গুণ বাড়ানো হয়— এটা ছিল মোবাইল খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। অপরদিকে দুই অপারেটরের কাছে বিটিআরসির অডিট দাবি সংক্রান্ত জটিলতা পুরো শিল্পখাতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এই জটিলতা টেলিযোগাযোগ যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী (ভেন্ডর) ও স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহকেও (ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ) ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসে।

এছাড়াও টাওয়ারকো লাইসেন্সধারীরা যেহেতু এখন পর্যন্ত তাদের কাজ শুরু করতে পারেনি তাই গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অপারেটররা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে পারেনি। এর প্রভাব এই খাতের সেবার সার্বিক মানের উপর গিয়ে পড়েছে।’’

বাজার যত মুক্ত হয়েছে তত ব্যবসার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে ঘটছে উল্টো ঘটনা। আশপাশের দেশগুলোতেই মোবাইল অপারেটররা সাবমেরিন কেবল, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশনের সম্প্রচার বা ব্রডব্যন্ড লাইনের সেবা দিচ্ছে। অপর দিকে আমাদের এখানে অপারেটরদের কাছে থেকে একের পর এক সেবা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে ওয়ারিদ টেলিকম দেশ থেকে চলে গেছে, এয়ারটেল রবির সঙ্গে যুক্ত (মার্জ বা একীভূতকরণ ) হয়েছে, এনটিটি ডোকোমো রবিতে তাদের অংশ কমিয়ে এনেছে। মোবাইল অপারেটরদের এই মন্দাবস্থা চলতে থাকলে আদতে কার ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি কেউ কি ভেবে দেখেছি?

নতুন নতুন প্রযুক্তি আসার আগে আগে সবসময়ই শোনা গেছে যে বাইরে থেকে নতুন অপারেটর আসছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসেনি। যে রাস্তা তৈরি করে তাকে তার কাজটা ঠিক মতো করতে না দিলে ক্ষতি তার তো বটেই, বাকি সবারই হয়। সেটা সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল সেবার স্বাভাবিক গতি রোধ করা হলে দেশের জনগণই ভুগবে সবচেয়ে বেশি।

লেখক একজন কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০১৭ সাল থেকে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)-্র্এ কর্মরত আছেন। দীর্ঘ এক যুগের মতো সংবাদ মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও আজকের কাগজে ।

এমটবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি গ্রামীণ ইন্টেল স্যোসাল বিজনেস লিঃ (বর্তমান নাম – টেকনোলজি ফর স্যোসাল ইমপ্যাক্ট) এ উপ-মহাব্যবস্থাপক হিসেবে পিআর ও ব্র্যান্ড এর দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে কাজ করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইজিএস-এ।

(লেখার বিষয়বস্তু, মতামত, ভাষা কিংবা মন্তব্য সবটাই লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে টেকশহরের কোনো দায় নেই)।

*

*

আরও পড়ুন