২৬ হাজার ল্যাপটপ কেনার দরপত্র, ‘কারসাজির’ অভিযোগ

Evaly in News page (Banner-2)

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২৬ হাজার ল্যাপটপ, স্পিকার ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনার দরপত্রে ‘সিন্ডিকেট কারসাজির’ অভিযোগ উঠেছে।

দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের ঠেকাতে এই ‘সিন্ডিকেট কারসাজির’ অভিযোগ তুলেছেন সরকারের টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দেশীয় উদ্যোক্তারাসহ স্বয়ং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ওই প্রাইমারি এডুকেশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম-৪’ বা প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-৪ এর আওতায় গত ৮ নভেম্বর তিনটি আলাদা দরপত্র আহবান করা হয়। যেখানে প্রতিটি দরপত্রে পাঁচ লটে ২৬ হাজার ইউনিট করে ল্যাপটপ, স্পিকার ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনা হবে।

আর এতে অভিযোগ হলো, সিন্ডিকেট কারসাজি করে দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের আটকে দিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দিতে সে অনুযায়ী দরপত্র সিডিউল দেয়া হয়েছে।

এ নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রাক দরপত্র সভায় দেশীয় শিল্প উদোক্তারা উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যেখানে তাদের কথা বলতে না দেয়ার চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন।

টেশিস ছাড়া ওই বৈঠকে ডাটা সফট, ওয়ালটন, ফ্লোরা টেলিকম, ফ্লোরা লিমিটেড, গ্লোবাল ব্র্যান্ড, স্মার্ট টেকনোলজিস, থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ইতোমধ্যে টেশিস লিখিত অভিযোগ দিয়েছে, ডিও লেটার পাঠিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহরডটকমকে বলেন, ‘দরপত্রে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে সেগুলোতে পুরোপুরিভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া এবং কতগুলো বিশেষ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অংশগ্রহণ করাও সম্ভব না।’

‘যেমন এখানে এফসিসির শর্ত দেয়া হয়েছে। এটি আমেরিকান একটি স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন বডি। আমাদের বলা যেতো বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড লাগবে কিনা, তাহলে বলা যেতো ঠিক আছে এটি লাগবে? কেনো এখানে আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড দেখানো হচ্ছে? তার মানে এখানে কিছু রয়েছে!’

‘বলা হচ্ছে বিপুল পরিমান টাকার অর্ডার থাকতে হবে। আমরা মাত্র নতুন প্রডাকশনই শুরু করেছি আর আপনি আমাকে সুযোগই দেবেন না যে, আমরা টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে পারি’ বলছিলেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘তাহলে তো মুশকিল। তার মানে খুব স্পষ্ট যে দেশীয় যে প্রোডাকশন আছে সে প্রোডাকশনের চাইতে বিদেশীরা যেনো বেশি দামে সিন্ডিকেট করে সাপ্লাই দিতে পারে তার ব্যবস্থা করছেন।’

শুধু টেশিস নয় দেশের স্থানীয় সব শিল্পোদ্যাক্তাদের জন্য এখানে অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এখন ডিও লেটার পাঠিয়েছি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে, ওনার সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা অপেক্ষা করবো তারা এই সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এবং এটি আমি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত নিয়ে যাবো।’

‘দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করতে না পারা দুর্ভাগ্যজনক। টেশিস না হয় সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিপিএম করলো না কিন্তু ওপেন টেন্ডারে অংশ নেয়ার অধিকার তো তারা হরণ করতে পারে না।’

‘আমার কাছে সরকারের মন্ত্রিসভার অনুশাসন আছে যেখানে বলা আছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পাবে। উল্টো অগ্রাধিকার তো দূরের কথা ন্যায্য অধিকারই দেয়া হচ্ছে না’ উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘অফিসিয়াল প্রতিবাদ করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে যদি পরিবর্তন না করে তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে জানাবো।’

টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হায়দার চৌধুরী টেকশহরডটকমকে জানান, ‘আমরা লিখিত আপত্তি দিয়েছে। টেশিস এখন ভাল ও মানসম্মত ল্যাপটপ তৈরি করতে পারছে। টেশিস ইতোমধ্যে তার প্লান্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে, ৬৯ জন দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। এখন এমন কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে টেশিস অংশগ্রহণ করতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন (এফসিসি) ক্লাস বি সার্টিফিকেটের শর্ত দেয়া হয়েছে। সেটা আমেরিকানদের বিষয়। তো আমাদের দেশীয় কোম্পানিকে কেনো সে সার্টিফিকেট বাধ্য করা হবে?’

‘পাঁচটি লটে ২৬ হাজার ল্যাপটপ, স্পিকার ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর টেন্ডারের জন্য ১ দশমিক ৫ গুণ সাপ্লাই সনদ দেখা হবে। তার মানে ৪০ হাজার ল্যাপটপের সনদ লাগবে। যদিও টেশিস ইতোমধ্যে ৮০ হাজার ল্যাপটপ সরবরাহ করেছে। কিন্তু এর আগে তো মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের এত বাল্ক পরিমান সরবরাহের সুযোগ আসেনি। প্রধানমন্ত্রী যখন গ্রামে-গঞ্জে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ-মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সেক্ষেত্রে এখন বড় ধরনের সাপ্লাইয়ে আবশ্যিকতা এসেছে। তাহলে এর আগে এত সাপ্লাইয়ের অভিজ্ঞতা কোত্থেকে থাকবে’ বলছিলেন টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিনি বলেন, ‘কথা হলো আমার ল্যাপটপ প্লান্ট রয়েছে, সংযোজন করছি, এখানে অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেখানে এই প্রজেক্টর সংযোজন করে দেয়া তো একদম সহজ কাজ। তাহলে এই শর্ত কার জন্য।’

‘তারপর যেখানে শুধু ল্যাপটপ সাপ্লাই ১৩৪ কোটি টাকার সেখানে ব্যাংক সলভেন্সি চাচ্ছে ১৪৪ কোটি টাকার। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টেরও একইরকম বিষয়। সব মিলে ৩০০ কোটি টাকার ব্যাংক সলভেন্সি লাগবে। আমি সরকারি প্রতিষ্ঠান আমি কীভাবে এত টাকা ব্যাংক সলভেন্সি দেখাবো।’

‘এখন তো মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে বিল্টইন স্পিকার রয়েছে। সেখানে আলাদা স্পিকারের জন্য কেনো বাড়তি ১৭ দশমিক ৭  কোটি টাকা খরচ করবেন। তাহলে এখানে সরকারি এই টাকার অপচয় কেনো? উল্লেখ করেন তিনি।

‘তারপর উইন্ডোজ ১০ এ অ্যান্টিভাইরাস তো আছেই। আবার অ্যান্টিভাইরাস নিয়ে সাত-আট কোটি টাকা কেনো খরচ করবেন? তার মানে যাদের কাছ হতে ধারণা নেয়া হয়েছে তারা অ্যান্টিভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছে।’

এগুলো করা মানে দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের থামিয়ে দেয়া, বলছিলেন তিনি।

প্রাক দরপত্র বৈঠকের উল্লেখ করে ফখরুল হায়দায় চৌধুরী বলে, ‘দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের তো কথা বলতেই দেয়া হচ্ছিলো না।’

‘একজন উদ্যোক্তা বৈঠকে বললেন, আমেরিকা হতে এসে এখানে হাইটেক পার্কে কারখানা করেছি। এখন কী তিনি আবার আমেরিকা চলে যাবেন’ বৈঠকের  ঘটনা তুলে ধরে বলছিলেন তিনি।

‘তিনি নিজে বিষয়টির রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং সবাইকে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিতে কথা বলেছেন। এরপর সবাই কথা বলতে পেরেছেন’ উল্লেখ করেন টেশিস ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

‘বৈঠকে প্রকল্পের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উত্থাপিত এসব অভিযোগ শুনেছেন এবং তারা বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন’ বলেন তিনি।

এই দরপত্র নিয়ে টানাহেঁচড়া আরও ৯ মাস আগে হতে। চলতি বছরের ৭ মার্চ এর প্রথম দরপত্র আহবান করা হয়। এরপর ১৯ এপ্রিল সেটি আবার বাতিল করা হয়।  

এডি/২০১৯/নভে২৫/২৩০০

*

*

আরও পড়ুন