শেষ পর্যন্ত প্রশাসক বসছে জিপি-রবিতে

Evaly in News page (Banner-2)

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি আদায়ে শেষ পর্যন্ত জিপি-রবিতে প্রশাসক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। 

প্রশাসক বসানোর অনুমতি চেয়ে বিটিআরসির পাঠানো চিঠির বিষয়ে সম্মতিসূচক সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। 

বিটিআরসি কমিশন বৈঠকের সিদ্ধান্ত শেষে মঙ্গলবার ওই চিঠি টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠায় আর ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পজিটিভ বিভাগ । বৃহস্পতিবার এই বিষয়ের চিঠি বিটিআরসিতে যেতে পারে।   

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহরডটকমকে বলেন, ‘এখন দুই পক্ষের কেউ এসে বলতে পারবে না যে, প্রশাসক বসিয়েন না। কারণ আমরা আমাদের সব চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনোটিই যদি কাজ না করে এবং সবটিই যদি ব্যর্থ হয় তাহলে এখন প্রশাসক বসানো ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই।’ 

তিনি বলেন, ‘সচিব বা ওই পর্যায় বা দায়িত্বশীল কেউ যাবে প্রশাসক হিসেবে, তবে এটি এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। প্রশাসকের দায়িত্ব হবে শুধু টাকা তোলা।’ 

‘তবে হ্যা, এরমধ্যেও যদি তারা টাকা দেয় তাহলে প্রশাসক বসবে না’ উল্লেখ করেন মন্ত্রী। 

মোস্তাফা জব্বার বলেন, পাওনাটা ১৯৯৭ সাল হতে, এর মানে হলো পাওনার হিসাব ২২ বছর জুড়ে। তারমধ্যে থেকেও যে নানাভাবে মামলা-মোকদ্দমা, টালবাহানা, দেন-দিচ্ছি-দেবো এইসব করতে করতে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আসছে। 

‘এরমধ্যে গত জানুয়ারি হতে অপারেটর দুটির সঙ্গে আমার ও বিটিআরসির দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। সেখানে কেউ কোনোভাবে জড়িত হওয়ার আগেই আমরা বলেছি একটা টোকেন অ্যামাউন্ট দিয়ে আপনারা আলোচনায় বসেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরা এই প্রস্তাবে কোনো ধরনের সাড়া দেয়নি’ বলছিলেন মন্ত্রী। 

‘এমনকি সর্বশেষ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের উদ্যোগের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয়েছিলো যে, এই টোকেন মানি গ্রামীণফোন দেবে ২০০ কোটি আর রবি দেবে ৫০ কোটি। এটি যদি দেয়া হয় তাহলে দুই পক্ষে অডিটর ডেকে নেগোশিয়েশনে যাওয়া হবে। এটিও তারা দেয়নি’ উল্লেখ করেন তিনি। 

মোস্তাফা জব্বার বলেন, তারা কোনো কথাই মানবে না, এটা তো হতে পারে না। এই জিপি গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ হতে প্রফিটের ৫৭ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। সেই হিসাব যদি করা হয় তাহলে এখানে অন্যান্য বিষয়গুলো সে এভাবে ইগনোর করে যেতে পারে না। 

প্রশাসক বসানোর বিষয়ে যা বলছে দুই অপারেটর :

গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরির অ্যান্ড অ্যাক্টিং হেড অব কমিউনিকেশন হোসেন সাদাত টেকশহরডটকমকে জানান, ‘বিটিআরসির কাছ থেকে কোনো রকম নির্দেশনা না পাওয়ায় আমরা অনুমান নির্ভর কিছু বলতে চাই না। বিটিআরসির ভিত্তিহীন এবং বিবাদমান নিরীক্ষা সংক্রান্ত দাবিটির গঠনমূলক সমাধানের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সদয় নির্দেশনা ও সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।

‘স্বচ্ছ, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সময়োচিত সমাধানের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে আমাদের বিবেচনাধীন আছে । আমরা সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে নতুন কিছু নির্দেশনা পেয়েছি যা বিষয়টিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। দু:খজনক বিষয় হচ্ছে, বিটিআরসির ভিত্তিহীন বিধিনিষেধ ও লাইসেন্স সংক্রান্ত কারণ-দর্শানোর নোটিশটি এখনও বলবৎ আছে। এর ফলে গ্রামীণফোনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও গ্রাহকসেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে’ উল্লেখ করেন তিনি। 

রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম টেকশহরডটকমকে বলেন, বিতর্কিত নিরীক্ষা আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা আমরা এখনো পাইনি। তাই এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে একটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বিচারাধীন কোনো বিষয়ের ওপরে এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আরোপ আইনানুগ নয় বলে আমরা মনে করি।

‘আর বিচারাধীন বিষয় চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সে বিষয়ে প্রশাসক নিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অবকাশ রাখে। আমরা মনে করি, প্রশাসক আরোপের মতো কোনো সিদ্ধান্ত এ দেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে’ উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা। 

বিটিআরসির পাওনা দাবি যত :

বছরের পর বছর ধরে অডিট করা নিয়ে নানা জটিলতা, আইন-আদালতের পর শেষ পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে করানো অডিটে বিটিআরসি গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করে। একই সঙ্গে রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা দাবি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির।

পাওনা দাবি আদায়ে বিটিআরসির ব্যবস্থামূলক যেসব পদক্ষেপ :

২০১৯ সালের এপ্রিলের শুরুতে পাওনা দাবি পরিশোধে অপারেটর দুটিকে চিঠি দেয় বিটিআরসি। এরপর নানা দেন-দরবার, অপারেটর দুটির ব্যাখা, আলোচনার পর কোনো পথ না বের হলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। 

৪ জুলাই গ্রামীণফোনের জন্য বরাদ্দ ব্যান্ডইউথ ক্যাপাসিটি ৩০ শতাংশ এবং রবির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ব্লক করে দেয় বিটিআরসি। ততদিনে অডিট চূড়ান্তের এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে ।

তবে ব্যান্ডউইথ ব্যবহার সীমিত করায় সেটি গ্রাহকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে – বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে এনওসি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। ২২ জুলাই অপারেটর দুটিকে দেয়া হয় এই নির্দেশনা।  

আর এনওসি বন্ধের ফলে অপারেটর দুটির সব প্যাকেজ অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি বন্ধ, নেটওয়ার্ক বিস্তারের অনুমোদনও বন্ধ হয়ে যায় এমনকি ব্যাংক লোন বা কোনো ক্ষেত্রে অন্য কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করাও। 

এতেও দাবি আদায় না করতে পেরে ৫ সেপ্টেম্বর  লাইসেন্স (টুজি-থ্রিজি) কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে ১ মাসের সময় দিয়ে দুই অপারেটরকে শোকজ নোটিশ দেয় বিটিআরসি।

হঠাৎ দৃশ্যপটে অর্থমন্ত্রী :

অপারেটর দুটির কিছু পদক্ষেপ ও শোকজ নোটিশ পাওয়ার পর জটিলতা আরও বাড়লে ১৮  সেপ্টেম্বর বিটিআরসির এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের দিন অর্থমন্ত্রী বিষয়টি সুরাহা করতে উদ্যোগী হন। বিটিআরসিতে হতে যাওয়া ওই সংবাদ সম্মেলন অনুুুষ্ঠিত হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। 

ওইদিন বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানান তিন সপ্তাহের মধ্যে এই পাওনা জটিলতার একটি সুরাহা হয়ে যাবে। 

সেখানে তিনি বলেছিলেন, দুই পক্ষকেই ছাড় দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আর কোনো বিরোধ নয়। মামলা প্রত্যাহার করবে অপারেটর ‍দুটি। তারা সবকিছু ভুলে যাবেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। 

এসবের বিপরীতে যা করেছে দুই অপারেটর :

ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি ব্লকের পর সংবাদ সম্মেলনে আসে জিপি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিআরসির পাওনা দাবির বিষয়টি সুরাহা করতে আরবিট্রেশন বা সালিশের প্রস্তাব রাখে।

কোনো সংবাদ সম্মেলন না করলেও রবিও এই আরবিট্রেশন বা সালিশ চায় বলে জানায়। 

এরপর যখন এনওসি বন্ধ হলো আবারও সংবাদ সম্মেলনে আসে জিপি। এবার বিটিআরসির এই উদ্যোগকে জবরদস্তি উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানায় তারা। 

এখানেও রবি কোনো সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা না করলেও বিষয়টিতে বিবৃতি দিয়ে বলে জানায় এটি সমস্যা সমাধানে সহায়ক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। তারা বলে আলোচানার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে না বের করে এনওসি বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত গ্রাহকস্বার্থসহ টেলিযোগাযোগ খাতের সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

এই অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে আদালতে চলে যায় তারা। 

এবার লাইসেন্স বাতিলের কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দেয় দুই অপারেটর।  ৩ অক্টোবর বিটিআরসিকে দেয়া ওই নোটিশে তারা বলে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন তাই এই বিষয়ে বিটিআরসি এমন কারণ দর্শানো নোটিশ দিতে পারে না আর টেলিযোগাযোগ আইনের ২৬ ধারা বাদ দিয়ে ৪৬ ধারায় চলে গেছে বিটিআরসি।

২৬ ধারা অনুযায়ী পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) অ্যাক্টে পাওনা আদায়ে মামলা করতে পারতো বিটিআরসি । সেটি না করে ৪৬ ধারায় লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপে চলে গেছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এখানে অন্য লাইসেন্সিংয়ের মতো আচরণ তাদের সঙ্গে করা হয়নি বলে উল্লেখ করে অপারেটর দুটি।

শেষ চেষ্টাতেও কিছু না হওয়া : 

অর্থমন্ত্রীর তিন সপ্তাহের উদ্যোগে দফায় দফায় দীর্ঘ সময়ের বৈঠকে শেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, শুরুতে টোকেন মানি হিসেবে গ্রামীণফোন দেবে ২০০ কোটি আর রবি দেবে ৫০ কোটি। এটি তারা দিলে দুই পক্ষে অডিটর ডেকে নেগোশিয়েশনে যাওয়া হবে।

কিন্তু এতে মত দেয়নি দুই অপারেটর। এর মধ্যে তিন সপ্তাহও শেষ হয়ে যায়। ফলে এই আলোচনাও ঝুলে যায়। 

এডি/২০১৯/২১৩০/অক্টো১৬

*

*

আরও পড়ুন