Header Top

সরেজমিন : পিছিয়ে পড়ছে পাঠাও

Evaly in News page (Banner-2)

ইমরান হোসেন মিলন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : শুরুটা ছিল সম্ভাবনাময়। সাড়াও পেয়েছিল বেশ। বিদেশি ও দেশি রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে এগিয়েও গিয়েছিল পাঠাও। তবে সময়ের ফেরে এখন ভাটার টান পড়েছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুল বারী এখন রাইড শেয়ারিংয়ে মোটর বাইক ব্যবহার করেন বেশি। সুবিধামতো চারটি রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের একটি ব্যবহার করতেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার স্মার্টফোনে থাকা অ্যাপগুলোর মধ্যে থেকে পাঠাও আন-ইনস্টল করে দিয়েছেন। 

কেন আবদুল বারী পাঠাও নিয়ে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন তা অনুসন্ধান করেছে টেকশহরডটকম। এতে দেখা গেছে, শুধু তিনি নন- আরও অনেকে এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। অনেকে আবার ফােনে অ্যাপটি থাকলেও তারা পাঠাও ব্যবহার করছেন না।

হুট করে পাঠাও থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নানা কারণ উঠে এসেছে এ প্রতিবেদকের খোঁজখবরে।

কারণ হিসেবে আবদুল বারী জানিয়েছেন, পাঠাও রাইডের ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক সংবাদ দেখার পরই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজধানীর মোড়গুলোতে বাইকারদের দলবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ক’দিন আগেও অনেকটা বাসের হেলপারদের মতো যাত্রী ডাকতেন রাইড শেয়ারিংয়ে। কথা বলে দেখা গেছে, এদের বেশিরভাগই অ্যাপ হিসেবে ব্যবহার করতেন পাঠাও।

বেশ কিছু দুর্ঘটনার পর এখন অবশ্য সেই প্রবণতা কমেছে। রাইড শেয়ারিংয়ের বেশ কিছু বাইকারের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। এদের অধিকাংশই একসময় পাঠাও ব্যবহার করলেও এখন সেটি ছেড়ে অন্য কোম্পানির রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন।

ছবি : টেকশহর

এদের বেশিরভাগই বলেছেন, অনেকটা শঙ্কা থেকেই পাঠাও ব্যবহার কমিয়েছেন তারা। কমিশন বেশি হলেও নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে এ অ্যাপ ব্যবহার বন্ধ রেখেছেন বলে উল্লেখ করেন তারা।

এছাড়াও অনেক যাত্রী বলেছেন, বেশিরভাগ সময় আনাড়ি চালক, বাইক ডাকলেও ঘন ঘন কল কেটে দেওয়া, রিকোয়েস্ট নেওয়ার পর আসলেও রুট না চেনার মতো বিড়ম্বনার কারণে ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। 

জানতে চাইলে পাঠাওয়ের মার্কেটিং লিড সৈয়দা নাবিলা মাহবুব টেকশহরডটকমকে বলেন, সারা দেশে বাইক ও গাড়ি মিলিয়ে তিন লাখের বেশি নিবন্ধিত চালক রয়েছেন তাদের। এর অধিকাংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। 

এখন ঠিক কতজন বাইকার পাঠাও অ্যাপে রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছেন বা ব্যবহারকারী কত সে সম্পর্কে জানতে চেয়েও পাঠাও থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের চিত্র তাদের জন্য বেশ হতাশার।

দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থেকেছেন শামীম হাসান। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ফেরে গত বছর তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হন। দেশে এসে গত পাঁচ মাস তিনি রাইড শেয়ার করছেন। তিনি ব্যবহার করেন পাঠাও অ্যাপ।

পাঠাও ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় লার্নার দিয়ে তিনি পাঠাওয়ে নিবন্ধন করেছেন। লাইসেন্স হাতে পেলে তিনি অবশ্য কোম্পানি পাল্টাতে চান।

আরেক বাইকার রেজাউল ইসলাম টেকশহরডটকমকে জানান, তিনি তিনটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করেন। সেই তালিকায় এখন পাঠাওয়ের অবস্থান নিচের দিকে। সুজন হালদার নামের এক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি রাইড শেয়ার করেন। তিনিও দুর্ঘটনাসহ নানান নেতিবাচক খবরে পাঠাও অ্যাপ ডিজেবল করেছেন বলে জানান।

হেলাল উদ্দিন গত এক বছর থেকে ঢাকায় আছেন। হাজারিবাগের একটি মেস বাসায় থাকেন। পরিবার থাকে গ্রামে। রাইড শেয়ারিংয়ের আয় দিয়েই গত এক বছর সংসার চালাচ্ছেন তিনি। সকালে সূর্য উঁকি দেবার আগেই বেরিয়ে পড়েন। বাসায় ফেরেন দুপুরে।  পরে আরেক দফায় বের হন।

গ্রাম থেকে আসার পর প্রথমে তিনিও পাঠাওয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাস দুয়েক পর আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধন করেন। এদিক-সেদিক করে সুবিধা না হওয়ায় আগের তিনটি অ্যাপই বন্ধ করে দিয়েছেন হেলাল উদ্দিন। এখন বাইক নিবন্ধন করেছেন আরেকটি প্রতিষ্ঠানে। সেখাই থিতু থাকতে চান তিনি। 

কেন ছাড়ছে পাঠাও

২০১৫ সালে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শুরু করে পরে রাইড শেয়ারিং আনা পাঠাও এখন নাজুক অবস্থায় পড়েছে। সম্প্রতি বড় ধরেনর ছাঁটাই করার পর প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরাও অনেকটা আস্থাহীন হয়ে পড়েছেন, ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

বিনা নোটিশে এক সঙ্গে তিন শতাধিক কর্মী ছাঁটাইয়ের পর অনেকেই আবার পাঠাও ছেড়েছেন চাকরির নিরাপত্তাহীনতার কারণে। এসব খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো সদুত্তর দেয়নি কখনোই। ফলে সাধারণের মধ্যেও একধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। যার ফল অনেকটা ‘পাঠাও ছাড়’ ধরনের হয়েছে। 

ছবি : টেকশহর

বাইকাররা জানান, অনেকেই এখন পর্যাপ্ত রাইড রিকোয়েস্ট না পেয়ে অন্য অ্যাপে নিবন্ধন করছেন।

সালেকিন আহমেদ নামের এক বাইকার বলেন, প্রথম দিকে প্রচুর রিকোয়েস্ট আসলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। রুট পছন্দ না হলেও অনেক রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করেন তিনি।

তবে শুধু রিকোয়েস্ট কমে যাওয়া নয়, অনেকেই এখন পাঠাও ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু নেতিবাচক ঘটনার কারণে।

আবার অনেকে জানিয়েছেন, পাঠাও বাইকার হিসেবে নিবন্ধিত থাকলেও অ্যাপে যেতে চান না। লাভ বেশি বলে অ্যাপে দেখে খ্যাপে যাত্রী পরিবহন করেন।

পাঠাওয়ের মার্কেটিং লিড সৈয়দা নাবিলা মাহবুব টেকশহরডটকমকে জানান, রাইড শেয়ারিংয়ে তারা ২০ শতাংশ কমিশন নেন। বাকি ৮০ শতাংশ পায় চালকরা। পাঠাও-ই সবচেয়ে বেশি কমিশন দেয় বলে দাবি তার।

পাঠাওয়ে রাইড শেয়ার করতেন মিরপুরের মো. মিলন। গত ২৬ আগস্ট মধ্য রাতে খ্যাপে এক যাত্রীকে নিয়ে যাবার সময় মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারে তাকে গলায় ছুরিকাঘাত করে বাইক ছিনতাই করে সেই যাত্রী। পরে হাসপাতালে নিলে মো. মিলনের মৃত্যু হয়। 

এরপরও অনেকে লোভে পড়ে চুক্তিতে যান। এসব বন্ধ করতে বা নিয়ন্ত্রণে পাঠাওয়ের উদ্যোগের বিষয়ে নাবিলা বলেন, আসলে এটা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। 

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা চালকদের এসব বিষয়ে সচেতন করছেন। কেননা চুক্তিতে গেলে তা বাইকার ও যাত্রী উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই অ্যাপে যাওয়া উচিত।

ইতোমধ্যে পাঠাও খ্যাপে যাত্রী পরিবহণ নিরুৎসাহিত করতে নতুন ফিচারও এনেছে। পাঠাও পয়েন্টস নামের ওই ফিচার রাইড ব্যবহারকারী ও বাইকারদের খ্যাপে যাবার পরিমাণ কমাবে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।   

পুলিশের পাশাপাশি পাঠাও কর্তৃপক্ষও ‘খ্যাপ’ বন্ধে সতর্ক করে সচেতনতামূলক  কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানান  সৈয়দা নাবিলা মাহবুব।  

পাঠাওয়ের ইউজার অ্যাপ থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত অ্যাপটি ১০ লাখের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। পাঠাওয়ের দাবি এর পরিমাণ ৫০ লাখের বেশি। এখন পর্যন্ত অন্তত চার কোটি সফল ট্রিপ দিয়েছে বলে ওয়েবসাইটে বলেছে পাঠাও।  

ইএইচ/আরআর/এডি/২০১৯/৩০সেপ্টেম্বর/১৬৪৮

আরও পড়ুন : আরও ৫ রাইড শেয়ারিং লাইসেন্স

পাঠাওয়ের তথ্য চুরি : মোবাইল অ্যাপ ও প্রাইভেসি নিয়ে ভ্রান্তিবিলাস

*

*

আরও পড়ুন