অ্যাপ, ওয়েবসাইটে দুর্লভ ট্রেনের টিকিট ফেইসবুকে বিক্রি চড়া দামে

ছবি : ফেইসবুক থেকে নেওয়া

ইমরান হোসেন মিলন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ভোর পাঁচটার পর থেকেই অপেক্ষা করছেন রফিকুল ইসলাম। ৬টায় বাংলাদেশ রেলওয়ে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু করলে টিকিট কাটবেন তিনি।

সকাল ৬টা। চেষ্টা শুরু করেন টিকিট প্রাপ্তির। কিন্তু ওয়েবসাইট এবং রেলওয়ের অ্যাপ রেলসেবায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না। বার বার সাইট আনরিচেবল দেখাচ্ছিল। সময় গড়াতে থাকে। প্রতি মিনিটে রিলোড দিয়ে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনে চলতে থাকে তার টিকিট প্রাপ্তির যুদ্ধ।

এভাবে সময় গড়াতে গড়াতে ভোর থেকে সকাল আটটা বেজে গেল। কিন্তু তার সেই সোনার হরিন ট্রেনের টিকিট অধরা রইলো। ঠিক যখন তিনি ওয়েবসাইট ও অ্যাপসে প্রবেশ করতে পারলেন তখন সেখানে বার্তা দেখায় অনলাইনে বিক্রির টিকিটের কোটা শেষ। মানে ১০ আগস্টের আর কোন ট্রেনের টিকিট নেই।

এমন চিত্র শুধু রফিকুল ইসলামের নয়। হাজার হাজার টিকিট প্রত্যাশী এভাবে শত চেষ্টা করেও পাচ্ছেন না অনলাইনে ট্রেনের টিকিট। রেলওয়ের ই-টিকিটিং পার্টনার সিএনএস বিডি নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। আর অ্যাপ রেল সেবা আসার পর টিকিট প্রত্যাশীদের সেই অভিযোগ আরও বেশি হয়েছে তাদের সার্ভার অব্যবস্থাপনার জন্য।

টিকিট না পাবার পর এখন টিকিট প্রত্যাশীদের প্রশ্ন, অনলাইনে যে টিকিট থাকে, সেগুলো তাহলে কে পায়?

অবশ্য ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রির পর প্রথম দিনে ২৯ জুলাই ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছিলেন, প্রথম দিন সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত অনলাইনে সাড়ে সাত হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে। আর এবার অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটে টিকিট প্রাপ্তিতে ভোগান্তি কম হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন।

কিন্তু পরের দিন থেকেই সেই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। ৩০ জুলাই ৮ আগস্টের টিকিট, ৩১ জুলাই ৯ আগস্টের এবং ১ আগস্ট ১০ আগস্টের অগ্রিম টিকিট ছাড়া হয়েছে। সেই প্রতিটি দিনই আগ্রহী টিকিট প্রত্যাশীরা টিকিট পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখা গেছে, অ্যাপে টিকিট পারসেজ লোড হলেও যাত্রার তারিখ বা গন্তব্য লোড হয় না। আবার সেগুলো হলেও তার পেমেন্ট করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গেলে অনেক সময় দেখা গেছে সার্ভার সাপোর্ট করছে না। যখন প্রবেশ করা গেছে তখন আর কোন টিকিট নেই বলে দেখিয়েছে।

ফেইসবুকে টিকিট কালোবাজারি

তবে অনেকেই টিকিট না পেলেও ফেইসবুকের কিছু রেলওয়ে সম্পর্কিত গ্রুপে খুব চড়া দামে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ফ্যান গ্রুপ সবচেয়ে বড় ফেইসবুক গ্রুপ। যেখানে টিকিট প্রাপ্তি নিয়ে অনেক অভিযোগ লিখেছেন ফেইসবুক ব্যবহারকারীরা। যদিও গ্রুপের অ্যাডমিন টিকিট কেনাবেচা নিয়ে কোন পোস্ট করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছেন সদস্যদের। কিন্তু বেচাকেনার পোস্ট না দিলেও অনেকেই টিকিট অপ্রাপ্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেখানে।

এছাড়াও ফেইসবুকে রয়েছে ‘ট্রেন টিকিট বায়িং অ্যান্ড সেলিং ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি গ্রুপ। যেখানে অন্তত ১৭ হাজার সদস্য রয়েছেন। সেখানেই চলছে ব্ল্যাকার এবং বোকারদের টিকিট কালোবাজারি। সেখানে নামে বেনামে ফেইসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হচ্ছে বিভিন্ন রুটের ট্রেনের টিকিট বিক্রির কথা। পরে যারা আগ্রহী তাদের ইনবক্সে নক করার অনুরোধ জানাচ্ছেন সেই আইডি গুলোর মালিকরা।

এমন একটি টিকিট বিক্রির পোস্ট করেছিলেন জাফরিনা জান্নাত শামীম নামের এক ফেইসবুক আইডি থেকে। তিনি ঢাকা টু রাজশাহী একটি সিল্ক সিটি ট্রেনের এসি টিকিট বিক্রির কথা বলেছিলেন পোস্টে। পরে তাকে ইনবক্সে নক করলে বলেন, তিনি একাধিক টিকিট দিতে পারবেন। তবে তিনি ৬৫৬ টাকার পরিবর্তে সেই টিকিটের দাম চান ১৮০০ টাকা।

তিনগুণ দাম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন। তিনি এক দালালের কাছ থেকে টিকিট কিনিছেন বেশি দামে, তাই দাম বেশি। তিনিও কি দালাল? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, না, তবে অন্যদের হেল্প করছি।

পরে ওই আইডি থেকে বিভিন্ন গ্রুপে একইভাবে টিকিট বিক্রির জন্য পোস্ট দেওয়া হয়।

এছাড়াও ফেইসবুকে ‘ট্রেন/বাস টিকিট এক্সচেঞ্জ/ সেল গ্রুপ’ নামের গ্রুপ থেকে রাহুল দীপ, রেহনুমা বুশরা, ইঞ্জি, রুহুল আমিনসহ আরও অসংখ্য আইডি থেকে ট্রেন, বাসের টিকিট কালোবাজারি করা হচ্ছে বলে গ্রুপে অনেক সদস্য অভিযোগ করেছেন।

গ্রুপগুলোতে সদস্যরা অবাক হয়ে জানতে চান, এতো টিকিট তাহলে ব্ল্যাকাররা পাচ্ছে কিভাবে?

হচ্ছে প্রতারণা

ফেইসবুকে ঈদ যাত্রার টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয়ও নিচ্ছেন অনেক প্রতারক। টিকিট দেবার নাম করে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নিয়ে আর টিকিট দিচ্ছেন না সেসব প্রতারকরা।

ফেইসবুকে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরমান রবিন। তিনি টেকশহরডটকমকে বলেন, ফেইসবুকে তিন একটা ট্রেনের টিকিট কেনন। কিন্তু প্রথমে টিকিটের অর্ধেক টাকা বিকাশ করতে বলা হয়। কিন্তু টাকা পাবার পর অপর প্রান্ত থেকে আর কোন সাড়া আসেনি। এমনকি ফেইসবুক আইডিও ডিঅ্যাক্টিভ করে দেন ওই প্রতারক।

গত ঈদের আগেও ফেইসবুকে টিকিট কিনে অনেকে যাত্রী পরে দেখেন টিকিটগুলো কম্পিউটার ফটোশপে এডিট করে দেয়া। যা দেখতে হুবহু আসলের মতো মনে হলেও সেগুলো নকল। যদিও ফেইসবুকে টিকিট বিক্রির ওই গ্রুপগুলোতে এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন অ্যাডমিনরা।

ইএইচ/ আগস্ট ০১/ ২০১৯/ ১৬৩৫

আরও পড়ুন –

রেল যাত্রীদের গলার কাঁটা সিএনএসবিডি!

এলো ‘রেলসেবা’ অ্যাপ

*

*

আরও পড়ুন