ডেটা সুরক্ষায় সচেতনতার বিকল্প নেই

Evaly in News page (Banner-2)

বাংলাদেশের ডেটা ঝুঁকি, সরকারের করণীয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি যুদ্ধ, অপারেটিং সিস্টেমের চ্যালেঞ্জ, হুয়াওয়ের ভবিষ্যত ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় টেকশহরের মুখোমুখি হয়েছেন মাইক্রোসফটের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা মোশতাক শাকিল আহমেদ। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আল-আমীন দেওয়ান।

মোশতাক শাকিল আহমেদ মাইক্রোসফটের মর্ডান ওয়ার্কপ্লেস সাপোর্টের গ্লোবাল লিড। তিনি কোম্পানিটির গ্লোবাল রিসোর্স স্ট্যাট্রেজি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, লোকেশন ম্যানেজমেন্ট, মার্জার-অ্যাকুজিশন এবং সাপ্লায়ার প্লানিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেখেন।

চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৯৬ সালে ম্যাকনিকা ডিএইচডব্লিউতে সফটওয়্যার ডেভলমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। তিন বছর এখানে কাজ করার পর সিনিকসফট ইনকর্পোরেশনে এশিয়া বিজনেসের কিউএ ম্যানেজমেন্ট দেখেন দুই বছর।

২০০১ সালে শাকিল আহমেদ যোগ দেন মাইক্রোসফটে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে উইন্ডোজ কোর অপারেটিং সিস্টেম ডিভিশনের টেস্ট অ্যান্ড সাসটেইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গ্রুপ ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন। এখানে কাজ করেন ৭ বছর। ২০০৭ সালে প্রোডাক্ট ডেভেলমেন্টের ডিরেক্টর, ২০১০ সালে এশিয়া সিনিয়র ডিরেক্টর হিসেবে এশিয়ার কনজ্যুমার সাপোর্ট বিভাগের নেতৃত্বে আসেন। ২০১৪ সালের কোম্পানিটির বৈশ্বিক সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান হন। বাংলাদেশের এই কৃতি সন্তান নিজ আগ্রহে উইন্ডোজে বাংলা যোগ করতে কাজ করেছেন।

টেকশহর : প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যবসায়িক আধিপত্যের জেরে এখন রাজনৈতিক ডামাডোলও প্রবলভাবে সামনে চলে আসছে। চীন-আমেরিকার মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর এমন ব্যবসায়িক যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো বিশেষ করে যারা ডিজিটাল সোসাইটি ও অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাবনার বিষয় কী হতে পারে?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : ইন্ড্রাস্ট্রিটা এখন একটা পলিটিক্যাল সিচুয়েশনের মধ্যে পড়েছে। আমেরিকা ভার্সেস চায়না। এটা একটা শুরু। এখন সমস্ত ডেটা গভর্ন্যান্স এবং ইন্টারনেটে আমেরিকার যে আধিপত্য এটার উপর চ্যালেঞ্জ আসবে। সেই চ্যালেঞ্জটা আসবে রাশিয়া চায়না একটা গ্রুপ, ইউরোপ আরেকটা গ্রুপের মধ্যে।

বাংলাদেশের মতো ডেভেলমেন্ট কান্ট্রির দেশের, যারা ডিজিটাল চিন্তাভাবনা করছে তাদের এখন কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যত ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। অথচ আমাদের গর্ভমেন্ট ক্লাউড নেই, ডেটা গর্ভন্যান্স নেই। যখনই বলা হচ্ছে, সবাই বলে আছে। আসলে নেই।

আমাদের কনজিউমার ডেটা, কান্ট্রি পপুলেশন প্রোফাইল সেটা চলে গেছে দেশের বাইরে। এই ডেটা যদি চলে যায় তাহলে অপারেটিং সিস্টেম কার হলো, কী হলো, সেটা একটা সমস্যা কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এই যে ডেটা আমরা দিয়ে দিচ্ছি যা পরে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। এটা কিন্তু ভবিষ্যতে ভোগাবে।

অপারেটিং সিস্টেম হলো ক্লাইন্ট আর ব্যাকএন্ডটা হলো সার্ভার। সব কিছুর শেষে আছে ডেটা গভর্ন্যান্স। মোবাইল ফোনের অপারেটিং সিস্টেমের চেয়ে মানুষের ব্যবহার অনেক বড়। এখন ডেটাই পাওয়ার, এটা ফিউচার কারেন্সি।

টেকশহর : এই ডেটা বলতে কোন ধরণের ডেটা বা তথ্যের কথা বলছেন ?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : ইন্টারনেটে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষগুলোর যে প্রোফাইল, এদের কীসে আগ্রহ, তারা কোথায় ক্লিক করে, কোন সার্চে তাদের প্রয়োজন, তাদের প্রতিদিনের কনর্ভাসেশন-এগুলোতে তো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

দেখা যায় সব কনজিউমারদের এই ডেটায় নিয়ন্ত্রণ নেই। যখন শুরু করা হয়েছে তখন পিসি ইউজার নিয়ে কথা হতো, পরে দেখা গেলো মোবাইল ইউজারদের ইন্টারনেট ব্যবহারে বিপ্লব ঘটে গেলো। এই যে সময়টা চলে গেছে এর মাঝখানে আমাদের সমস্ত ডেটাগুলো দিয়ে দিয়েছি। যেগুলো দিয়ে একটা ম্যাসিভ অ্যানালিটিক্স কাজ করে। সেটা মনে হয় না আমরা বুঝতে পারছি সেই প্রথম থেকেই।

খুব ডেভেলপ দেশগুলোতেও কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ডেটা দিয়ে অনেক বড় ঘটনা ঘটেছে। আরব বসন্তের বিশাল কিছু উদারহণ রয়েছে। এসব ডেটার কথাই বলা হচ্ছে। তাই এই ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি জরুরি।

টেকশহর : তাহলে কার কী করণীয় ?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : এখন যেহেতু একটা সময় আসছে। এটার জন্য অত্যন্ত সুদক্ষ একটা টেকনোলজি গ্রুপ দরকার। যারা গভর্মেন্ট ক্লাউড কন্ট্রোলে থাকবে। যেমন আমাদের একটা সন্ত্রাসী হামলা হলো আমাদের ফেইসবুকের কাছে ডেটা চাইতে হয় তারপর অপেক্ষা করতে হয়, এটা তো ঠিক না। যখন গভর্মেন্ট ক্লাউড থাকবে তখন এটা নিজেরাই করে ফেলা যাবে।

এটার জন্য অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ফলো করতে হবে, চেষ্টা করতে হবে অন্য দেশগুলো যে রুলস অব ল ফর্ম করেছে সেগুলো অ্যাডাপ্ট করা। এগুলো অনেক দেশেই রয়েছে ইউরোপের অনেক দেশেই রয়েছে। চায়না কিন্তু একটা বড় মডেল। তারা কীভাবে তাদের পপুলেশন ডেটা কন্ট্রোল করে। দেড় বিলিয়ন জনগণের ডেটা, সেটা কিন্তু প্রথম থেকেই ওরা কাউকে দেয়নি।

টেকশহর : চীন বা আমেরিকার মতো স্থানীয় ইনোভেশন ও সেবার তুলনায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এখনও সেভাবে কোনো উদ্যোগ স্বর্য়সম্পূর্ণ না। ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন ও ডিজিটাল অগ্রগতিতে বৈশ্বিক প্লাটফর্ম ব্যবহার বন্ধের কোনো সুযোগও নেই। সেক্ষেত্রে পলিসি কেমন হবে ?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : দেশের বাইরে প্লাটফর্ম অবশ্যই থাকবে। এটা করা যেতেই পারে কারণ আমরা তো ডিসকানেক্ট হতে পারবো না। কিন্তু সেখানে অ্যাকসেস রাখবে সরকার। সেখানে নেগোশিয়েশন রাখতে হবে।

এখানে পলিসি ঠিক করতে হবে। কী ধরনের ডেটা নেয়া যাবে বা যাবে না, একটা প্রোফাইল কতখানি রিড করবে বা করবে না। আবার ফরেন কোম্পানিগুলো কনজিউমারের ডেটা নিয়ে যে পরিমাণ মুনাফা করছে সেখানে সরকারের পাওনা বা অধিকারের বিষয়টিই নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি প্রাইভেসির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আসলে এর বিকল্প নেই। কম্পিউটার ব্যবহার, প্রাইভেসি নিয়ে ছোটবেলা হতেই বিষয়গুলোতে সচতেন করতে হবে। একেবারে প্রাথমিক পর্যায় হতে।

টেকশহর : হুয়াওয়ে নিয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক প্রযুক্তি যুদ্ধে আপনার পর্যবেক্ষণ কেমন?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : দুই পক্ষই বুঝতে পেরেছে যে তাদের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই হয়তো একটা সমঝোতার দিকে আসছে।

কিন্তু সব কিছুর জন্য সময় লাগে। প্লাটফর্ম তৈরি করতে তো লাগেই। হুয়াওয়ের আপারেটিং সিস্টেম শুধু চায়নায় বেশ চলতে পারে। সেখানে ওদের হোম স্টোর থাকবে। বাইরে যেতে গেলে সেটা আন্তর্জাতিকভাবে করতে হবে, ওদের ব্যাপক মার্কেটিং করতে হবে। যেটা আমেরিকান কোম্পানিগুলো আগেই বেশ ভালভাবে করেছে এবং একটা অবস্থান নিয়ে নিয়েছে।

কিন্তু প্রতিযোগিতা হবে না এটা চিন্তা করা ঠিক না। কারণ অ্যাপলের সামনে বলা হয়েছিল যে এশিয়ান স্যামসাং তাদের সঙ্গে পারবে না। কিন্তু স্যামসাং, হুয়াওয়ে দুটিই কিন্তু এশিয়ান মার্কেট। তারা অ্যাপলকে ঠিকই কোনঠাসা করে ফেলেছিল।

এটাতে অনেক কিছু শেখা উচিত। সেটা হলো অ্যাবসুলুড গ্যারান্টি নেই যে কে লিড করবে মার্কেট, কোন প্লাটফর্ম, কোন মার্কেট, কোন অ্যাপ।

আপনি যদি ইতিহাস দেখেন কনজ্যুমারদের লয়ালিটি বলতে কিছু নেই। ধরুণ আজকে আপনি অ্যাপল ইউজার, কয়েক বছর ইউজ করলেন না। এরপর  কোনো এক সময় কিছুদিন অ্যান্ড্রয়েড ইউজ করলেন। তখন আপনি আর আইওএসে ফেরত গেলেন না। কনজিউমার সবসময় অন্য কনজিউমার দিয়ে ইনফ্লুয়েন্স হয় এবং এই প্যাটার্নটা চেইঞ্জ হতে বেশি সময় লাগে না।

এই জন্য ভবিষ্যত কী হবে সেটা অনুমান করতে পারেন কিন্তু সেটা যে ঠিক হবে সেটার নিয়শ্চতা নেই। এখন হুয়াওয়ের অপারেটিং সিস্টেম যদি খুব ভালভাবে আসতে পারে যখন তাদের কাছে বায়াররা আসবে। কনজ্যুমারদের আরও মাল্টিপল অপশন থাকবে।

টেকশহর : অপারেটিং সিস্টেমের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো কী ? কম্পিউটারের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও মোবাইলের ক্ষেত্রে উইন্ডোজ যেমন তা পারেনি, কেনো?

মোশতাক শাকিল আহমেদ : মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমে উইন্ডোজ একচ্ছত্র আধিপত্য নিতে পারেনি তার কারণ হলো অ্যাপ্লিকেশন। মানুষ দেখে কত অ্যাপ্লিকেশন আছে, কত প্রয়োজনীয় অ্যাপ্লিকেশন আছে, কোনটা ফ্রি, কতগুলো স্থানীয়। অ্যাপ তো অনেক আছে কিন্তু কয়টা আর সেভাবে ব্যবহার হয়।

একটা ব্যবহারকারী ১৫টা হতে ২০টা অ্যাপ ব্যবহার করে। এখন ওই জিনিসগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

ধরেন গুগল ম্যাপ। এটি তৈরি করতে অনেক সময় লেগেছে। গাড়ির ভেতরে যে নেভিগেশন ছিল ওগুলোতে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হতো। এখন তো তা দরকার হয় না। মানুষ ফোনটাকেই মিরর হিসেবে নেভিগেশনে ব্যবহার করতে পারছে।

এ বিষয়গুলো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন একটা বড় কোম্পানির অর্থ সমস্যা নয়। তারা হয়তো কোনো ম্যাপ কোম্পানি কিনে নেবে, সেখানে আরও বিনিয়োগ করবে, উপযুক্ত করবে। আসলে ১৫ হতে ২০টা অ্যাপ নিয়ে কাজ করতে হবে। সেই অ্যাফোর্টটা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। বিষয় একটাই সময় লাগবে।

আর ট্রাস্টেরও প্রয়োজন আছে। ট্রাস্টিং ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। স্যামসাং হোম অ্যাপ্লায়েন্সে ছিল সেখান হতে তারা একে একে গ্যালাক্সি দিয়ে মোবাইলের বাজার নিয়ে নিল। এটা লং রানের বিষয়। এই সময়ে কে থাকবে কে থাকবে না, সেটা বলা যায় না, বলা কঠিন।

*

*

আরও পড়ুন