জিপির কোটির মাইলফলকে ৩০ লাখই ভূতুড়ে ফোরজি গ্রাহক

Evaly in News page (Banner-2)

আল আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের ফোরজি গ্রাহক বেড়েছে ৩২ লাখ! খোদ অপারেটরটির দেওয়া দুই ধরনের পরিসংখ্যান তাই বলছে।  

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল গ্রাহক বিচারে শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরটি ফােরজিতে এক কোটি গ্রাহকের মাইলফলকে পৌঁছানোর ঘোষণা দেয়। এ অর্জন উদযাপনে অনুষ্ঠানও করে তারা।

অথচ ৩১ মার্চ শেষ হওয়া বছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একমাত্র মোবাইল ফোন অপারেটরটি জানায় তাদের ফোরজি ব্যবহারকারী ৬৮ লাখ।

‘সাধারণ হিসাবে’ দেখা যাচ্ছে, ৩১ মার্চ হতে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৭ দিনে ৩২ লাখ ফোরজি গ্রাহক পেয়েছে জিপি ! এত অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের নতুন করে চতুর্থ প্রজন্মের সেবায় যুক্ত হওয়াকে বিস্ময়কর ঘটনা বলেই মনে করেছেন টেলিকম খাতের সংশ্লিষ্টরা।

বিশাল এ ঘাপলার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে দেখা গেছে, অপারেটরটির ফোরজি গ্রাহকের তথ্যে ৩০ লাখ ভূতুড়ে হিসাব রয়েছে।   

এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল রোববার চলতি বছরের এপ্রিল-জুনের দ্বিতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ে পর্ষদ সেবা ডেকেছে অপারেটরটি। এ প্রতিবেদন নিয়ে পরদিন সোমবার অনলাইনে ভিডিও সম্মেলন করবে জিপি। 

জিপি-gp-techshohor

বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক প্রতিবেদনে এক ধরনের এবং এর বাইরে ভিন্ন ধরনের তথ্য প্রকাশ অপারেটরটির এক ধরনের চালাকি। খুব অল্প সময়ে কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অর্জনের ঘোষণা দিয়ে সবাইকে চমকে দিতে চেয়েছিল তারা। তবে আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে এর মিল না থাকার বিষয়টিকে বড় ধরনের গরমিল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জানতে চাইলে গ্রামীণফোন এ হিসাবের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাতে হিসাবটা এতটা ‘সাধারণ’ থাকেনি। সবার আগে ফলাও করে মাইলফলক অর্জনের ক্ষেত্রে সক্রিয় মোবাইল সিম ও অকার্যকর মোবাইল সিমের কারিগরি ব্যাখ্যাকে পুঁজি করেছে অপারেটরটি।

হিসাবের এ ভূতুড়ে ফাঁকির মাধ্যমে অপারেটরটি শেয়ারহোল্ডারদের এক ধরনের তথ্য দিয়েছে এবং টেলিকম খাত চমক তৈরি করতে আরেক ধরনের তথ্য দিয়েছে। এমন বিভ্রান্তি তৈরি অনুচিত এবং তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গ্রামীণফোনের ডিজিএম এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন মুহাম্মদ হাসান এ বিষয়ে টেকশহরডটকমকে বলেন, ২০১৯ সালের এপ্রিলে তারা এক কোটি ‘গ্রাহক’ ফোরজিতে যুক্ত হওয়ার কথা বলেছেন। অন্যদিকে বছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে ৬৮ লাখ ‘সক্রিয় গ্রাহকের’ হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ব্যাখা অনুযায়ী, মাইলফলক অর্জন ও উদযাপনের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা জানানো হচ্ছে ‘ফোরজি গ্রাহক’ হিসেবে আর গ্রামীণফোনের আর্থিক প্রতিবেদনগুলোতে এই সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে ‘ফোরজি ব্যবহারকারী’ হিসেবে। তথ্যের বিরাট এ ফারাকের বিষয়ে আর্থিক প্রতিবেদনে কিছুই উল্লেখ করেনি অপারেটরটি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রামীণফোনের এই ‘শর্তযুক্ত’ হিসাব ধরেও গোলমালের চিত্র উঠে এসেছে।

অসঙ্গতি – আগের প্রান্তিকেও

নিয়মানুয়ায়ী একজন গ্রাহক টানা তিন মাস সিম ব্যবহার না করলে তিনি ‘নিস্ক্রিয় গ্রাহকের’ হিসাবে যুক্ত হন।

এ নিয়ম মেনে গ্রামীণফোনের বক্তব্য অনুযায়ী বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে , এপ্রিলে এক কোটি ‘গ্রাহকের’ মধ্যে থেকে ৩২ লাখ ‘গ্রাহক’ ২০১৮ সালের ৩১  ডিসেম্বরের আগে তাদের ‘ফোরজি গ্রাহক’ হয়েছিলেন।

যারা এই সময়ের পরে আর ‘ফোরজি ব্যবহারকারী’ ছিলেন না বলে ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে তারা ‘ব্যবহারকারী বা সক্রিয় গ্রাহক’ হিসাবে গণনায় পড়েননি।

অন্যদিকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চতুর্থ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুয়ায়ী ৩১ ডিসেম্বর শেষে ফোরজি ‘ব্যবহারকারী’ ছিলেন ৫৫ লাখ। ঘোষণা অনুয়ায়ী ‘গ্রাহক’ ছিল ৭০ লাখ।

তাহলে এ সময়ের পর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এক কোটি গ্রাহকের মাইলফলক স্পর্শ করতে অপারেটরটির লেগেছে ৩০ লাখ ‘গ্রাহক’। হিসাব বলছে, এসব গ্রাহক ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকে যোগ হওয়ার কথা। কিন্তু তিন মাসে নিস্ক্রিয় ব্যবহারকারীতে পরিণত হওয়ার সংজ্ঞা অনুয়ায়ী সেটি সম্ভব নয়। এমনটি হলে তারা আর্থিক প্রতিবেদনে ‘সক্রিয় গ্রাহক বা ব্যবহারকারী’ হয়ে যেতেন। সেক্ষেত্রে প্রথম প্রান্তিকে ‘সক্রিয় গ্রাহক’ সংখ্যা হতো ৯৮ লাখ।

এ ছাড়া ২০১৮ সালের সর্বশেষ প্রান্তিকের হিসাবেও জায়গা নেই এই ৩০ লাখ ‘গ্রাহকের’। কারণ তারা ওই প্রান্তিকে ‘গ্রাহক’ হলে তা আর্থিক প্রতিবেদনে ‘ব্যবহারকারী’ হিসাবে যুক্ত হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে ডিসেম্বরে ‘সক্রিয় গ্রাহক বা ব্যবহারকারীর’ সংখ্যা হয়ে যায় ৮৫ লাখ। জিপির আর্থিক প্রতিবেদনে যা উল্লেখ রয়েছে ৫৫ লাখ। তিন মাসের নিস্ক্রিয় গ্রাহকের সংজ্ঞা বিবেচনায় এখানেও ঘাপলা রয়েছে।

তারপরও নিয়ম ভেঙ্গে যদি তারা এই সময়ে ‘গ্রাহক বা নিস্ক্রিয় ব্যবহারকারী’ হয়ে যান, তাহলে ‘গ্রাহক’ হিসাবে এই ৩০ লাখ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যুক্ত হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে এক কোটি গ্রাহকের মাইলফলক সেই ডিসেম্বরই হওয়ার কথা !

আরও পেছনে যাওয়া যাক

২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক হিসাবে ৩৮ লাখ ‘ফোরজি ব্যবহারকারী’ রয়েছে বলে উল্লেখ করে গ্রামীণফোন। এ প্রান্তিকে দেখা যাচ্ছে ‘ফোরজি ব্যবহারকারী’ ও ‘গ্রাহক’-এর সংখ্যায় পার্থক্য কম। ‘গ্রাহক’ ছিলেন ৪০ লাখের মতো। এতে দেখা যাচ্ছে মাত্র দুই লাখ ‘গ্রাহক’ ছিলেন যারা ‘ব্যবহারকারী’ নন।

খুব স্বাভাবিক বিশ্লেষণে ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা ৩০ লাখ ‘গ্রাহকের’ নিশ্চিতভাবে দুই প্রান্তিক আগে যোগ হয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।

২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিক হতে পরের তিন মাসে বা বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে ‘গ্রাহক’ বেড়েছে ৩০ লাখ, ‘ব্যবহারকারী’ বেড়েছে ১৭ লাখ। এ হিসাব তো আরও গোলমেলে !

কারণ নিয়ামানুয়ায়ী এ প্রান্তিকে যোগ হওয়া ৩০ লাখ গ্রাহকের সবারই ‘সক্রিয় ব্যবহারকারী’ হিসেবে আর্থিক প্রতিবেদনের সংখ্যায় যোগ হওয়ার কথা। অথচ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে ১৭ লাখ যোগ হয়েছেন, ১৩ লাখের হিসাব নেই। তাও যদি আগের প্রান্তিকের ‘নিস্ক্রিয় গ্রাহক বা ব্যবহারকারী নন’ এমন দুই লাখ গ্রাহক নিস্ক্রিয়ই থাকেন।  

তাহলে ২০১৯ সালে ‘সক্রিয় ব্যবহারকারী’ বাড়লো কীভাবে ? জিপির সব তথ্যের সমীকরণ মেলাতে অপশন এই একটিই।

এই ১৩ লাখ ‘নিস্ক্রিয় গ্রাহক বা গ্রাহক’ ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকে সক্রিয় থাকলেই শুধু ‘সক্রিয় ব্যবহারকারীর’ সংখ্যা ৬৮ লাখ হয়। যেখানে আগের প্রান্তিকের দুই লাখ গ্রাহক নিষ্ক্রিয়ই রয়ে গেছেন।

এর অর্থ ২০১৮ সালের শেষ প্রান্তিকে ‘কোটির মাইলফলক পুরো করা’ ৩০ লাখ ‘গ্রাহকের’ অস্থিত্ব নেই।   

তাহলে প্রশ্ন এই ‘৩০’ লাখ গ্রাহক কোন সময়ে যুক্ত হলেন আর গেলেন কই?

ঘাপলা আরও

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সর্বশেষ হিসাবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ফোরজি সংযোগ এক কোটি ১৭ লাখের একটু বেশি ছিল।

অপারেটরগুলোর ঘোষণা অনুয়ায়ী, ডিসেম্বর শেষে এমন গ্রাহক ছিল গ্রামীণফোনের ৭০ লাখ সংযোগ, রবির ৫৫ লাখ ও বাংলালিংকের ১২ লাখ। মোট হিসাব করলে যা বিটিআরসির পরিসংখ্যান থেকে ২০ লাখ বেশি হয়ে যায়।

আরও পড়ুন –

জিপির ফোরজি গ্রাহক ১ কোটিতে

ভাগ্যবান ঢাকার ছয় এলাকার মোবাইল গ্রাহকরা

*

*

আরও পড়ুন