মোবাইল ওএসের বিবর্তনে অ্যান্ড্রয়েড যেভাবে অপ্রতিরোধ্য

রিয়াদ আরিফিন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : স্মার্টফোন এখন জীবনে অত্যাবশকীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করেই দৈনন্দিন কাজ সেরে ফেলা যায়।

স্মার্টফোনের কল্যাণেই কমেছে কম্পিউটারের উপর নির্ভরশীলতা। দিন দিন স্মার্টফোনে নিত্যনতুন অনেক ফিচার যোগ হচ্ছে, যা আমাদের জীবনকে করে তুলছে সহজ, কাজে আনছে গতি।

স্মার্টফোনের এই উত্থান বেশিদিন আগের নয়। বিগত এক দশকে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন হয়েছে, আর এর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল স্মার্ট অপারেটিং সিস্টেম তৈরি। বর্তমান সময়ে এসে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমটি স্মার্টফোন বাজারে রাজত্ব করছে। কিন্তু আমরা কতটুকু জানি অ্যান্ড্রয়েডের ইতিহাস?

স্মার্টফোন ধারণার সূচনা

১৯৭৩ সালে মোবাইল ফোন উদ্ভাবনের পর প্রায় তিন দশকের বেশি সময় এটি শুধুমাত্র যোগাযোগের একটি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। কথা বলার পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অন্যান্য কাজ, যেসব করতে কম্পিউটারের প্রয়োজন হয়, সেগুলো করার ধারণা থেকেই ২০০০ সালের গোড়ার দিকে স্মার্টফোন ধারণাটির সূচনা হয়। আর এই উদ্দেশ্যেই একটি স্মার্ট অপারেটিং সিস্টেম গড়ে তোলার চেষ্টা করে বিভিন্ন কোম্পানি।

১৯৯৮ সালে মোবাইলের জন্য স্মার্ট অপারেটিং সিস্টেম ‘সিম্বিয়ান ওএস’ যাত্রা শুরু করে নকিয়া ও এইচটিসির হাত ধরে। তারপর কম্পিউটারের কাজ মোবাইলে করার ধারণা থেকে প্রথম পকেট পিসি নামক ফোন নিয়ে আসে উইন্ডোজ, যা অনেকটা কম্পিউটারের আদলে তৈরি করা হয়েছিল।

২০০৩ সালে মটোরলা মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স ব্যবহার করে স্মার্টফোন নিয়ে আসে। নকিয়া সিম্বিয়ান অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে বেশ কিছু স্মার্টফোন বাজারে ছাড়ে যেগুলো বেশ সাড়া ফেলে। এর পাশাপাশি নকিয়া নিজেরা অপারেটিং সিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছিল। ফিচার ফোনের জন্য তার এস৪০ ও এ৬০ প্লাটফর্ম নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি লিনাক্সকে কেন্দ্র করে ‘মাইমো’ ও ‘মিগো’ নামে অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে আসে। এই অপারেটিং সিস্টেমগুলো পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ২০০৭ সালে মার্কিন কোম্পানি অ্যাপল আইওএস ব্যবহার করে তাদের প্রথম ফোন নিয়ে আসে।

মুক্তজোট গঠন

স্মার্টফোনের বিকাশে ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রায় সকল মোবাইল ও মোবাইল যন্ত্রাংশ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মিলে একটি মুক্তজোট গঠিত হয়। যারা স্বতন্ত্র এবং একজোট হয়ে একটি ভালো অপারেটিং সিস্টেম তৈরিতে প্রচেষ্টা চালায়। এই জোট থেকেই লিনাক্স কার্নেল ব্যবহার করে গড়ে তোলা একটি মুক্ত মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম ‘অ্যান্ড্রয়েড’-র ঘোষণা আসে।

অ্যান্ড্রয়েডের উত্থান

২০০৩ সালের অ্যান্ডি রুবিন নামক একজন ব্যক্তি একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্যামেরায় ব্যবহার করে ডেটা কপি সহজ করা। ২০০৫ সালে গুগল এই প্রজেক্টটি কিনে নেয় এবং এর উন্নতিতে কাজ শুরু করে। গুগল এই অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়, এটিকে মুক্ত প্লাটফর্ম করে দেয়। এর ফলে যেকেউ চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারে। এর আগে যতগুলো অপারেটিং সিস্টেম চালু হয়েছিল কোনটিই মুক্ত ছিল না, সেগুলো ব্যবহার করতে মালিকানা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়ত। তাই গুগলেরের এমন সিদ্ধান্তের কারনে দ্রুতই অ্যান্ড্রয়েডের বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

এই অপারেটিং ব্যবহার করে ২০০৮ সালে এইচটিসি প্রথম স্মার্টফোন নিয়ে আসে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে প্রায় সব মোবাইল ফোন নির্মাতা অ্যান্ড্রয়েডের দিকে ঝুঁকতে থাকে। ডেভেলপাররা এই প্লাটফর্মের জন্য অ্যাপ্লিকেশন তৈরি শুরু করেন এবং এর ভাণ্ডার দিনদিন সমৃদ্ধ হতে থাকে। এর পরের গল্পটা শুধু উন্নতির। বর্তমানে স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৭৬ শতাংশই এই অপারেটিং সিস্টেমটির দখলে।

অ্যান্ড্রয়েড বনাম অন্য অপারেটিং সিস্টেম

অ্যান্ড্রয়েডের অগ্রগতির পাশেপাশে আরও কিছু অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে অনেকেই কাজ করেছে। যার মধ্যে মাইক্রোসফটের ‘উইন্ডোজ মোবাইল প্লাটফর্ম’, স্যামসাংয়ের ‘বাডা’ ও ‘টাইজেন’, মজিলা কর্পোরেশনের ‘ফায়াফক্স’ ও ‘কাই’ ওএস, ব্লাকবেরির ‘ব্লাকবেরি ওএস’ অন্যতম। এগুলো বেশি সুবিধা করে উঠতে পারেনি। এমনকি ২০১১ সালে নকিয়া, ইন্টেল ও লিনাক্স ফাউন্ডেশনের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ‘মিগো’ নামক অপারেটিং সিস্টেমটি গড়ে উঠতে পারেনি।

মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের বর্তমান হাল

বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন বাজারে এখন অ্যান্ড্রয়েড রাজত্ব করছে। সর্বশেষ হিসাব মোতাবেক, অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের আইওএসের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে ৭৬ ও ২১ শতাংশ। এই দুটি অপারেটিং সিস্টেমের বাইরে অন্য সকল অপারেটিং সিস্টেম মিলিয়ে মাত্র ৩ শতাংশের বাজার রয়েছে এখন।

আরএ/ইএইচ/ জুন ০৯/ ২০১৯/ ১৪০০

আরও পড়ুন –

অ্যান্ড্রয়েডে ম্যালওয়্যার থেকে বাঁচার উপায়

কম্পিউটার দিয়েই অ্যান্ড্রয়েড ফোন নিয়ন্ত্রণ

*

*

আরও পড়ুন