দেশি অ্যাপে কথা বলায় মোবাইল অপারেটরগুলোর আপত্তি

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : দেশীয় আইপি টেলিফোনি কোম্পানিগুলো অ্যাপে কথা বলার সুবিধা চালু করায় এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো।

এসব অ্যাপ দিয়ে মোবাইল ফোনে যেমন নামমাত্র মূল্যে কথা বলা যায় তেমনি যেকোনো আইপিটিএসপি নম্বরে কথা বলা যায় খরচ ছাড়াই।

এখন ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোন সার্ভিস প্রোভাইডার্স (আইপিটিএসপি) কোম্পানিগুলোকে অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস সেবার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে  বিটিআরসির কাছে জোর আপত্তি তুলেছে মোবাইল অপারেটরগুলো। অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মাধ্যমে সম্প্রতি এই আপত্তি জানানো হয়। 

কমিশনও আপত্তিকে আমলে নিয়ে আইপিটিএসপি কোম্পানি এবং মোবাইল ফোন অপারেটদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছে। 

বলা হচ্ছে, আইপিটিএসপিগুলো সবাই অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল সেবা দিতে শুরু করলে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর আয়ে প্রভাব পড়বে। সে কারণেই মোবাইল অপারেটররা এর বিরোধিতা করছেন।

তবে আইপিটিএসপি কোম্পানিরা বলছেন, হোয়াটস্যাপ, ইমো বা ভাইবারের মতো কোম্পানির কারণে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষের কথা বলা কমে যাচ্ছে। টাকাটা বিদেশে চলে যাছে। সেখানে মোবাইল ফোন অপারেটররা কিছুই করতে পারছে না। কিন্তু তাদের যতো আপত্তি কেবল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যে।

আইএসপিএবি সভাপতি এবং  আম্বার আইটির সিইও আমিনুল হাকিম টেকশহরডটকমকে বলেন, এই আপত্তি গ্রহণযোগ্য না । দেশে তো হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবার-ইমো তুমুল জনপ্রিয়, সবাই এতে অডিও-ভিডিও কলিং সেবা নিচ্ছে। এদের বিষয়ে কোনো অবজেকশন নেই অথচ দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিষয়ে আপত্তি করা হচ্ছে-এটা হাস্যকর। 

তিনি জানান, এখানে আইপিটিএসপিদের ডিপেন্ডেনসি আছে। প্রথমে নেটের সংযোগ লাগবে। এখন দেশীয় এসব অ্যাপের কারণে যে পরিমাণ কল মোবাইল অপারেটরগুলো হারাবে তার বিপরীতে তাদের কাছ থেকে তো ইন্টারনেট কেনা হবে। বিষয়টি উইন-উইন জায়গায়। দেশীয় এসব অ্যাপের কারণে অপারেটরগুলো ডেটা সংযোগে সমানতালে ব্যবসা করবে। 

‘সবচেয়ে বড় কথা নতুন একটি প্রযুক্তি বাংলাদেশে চলবে না শুধুমাত্র একটি সেক্টরের ব্যবসার রিস্ক ফ্যক্টরের জন্য, এটি তো লজ্যিকাল না’ বলছিলেন তিনি।    

আইপি টেলিফোনির লাইসেন্স পাওয়া কোম্পানি মেট্রোনেট বাংলাদেশের সিইও সৈয়দ আলমাস কবীর টেকশহরডটকমকে জানান, ভাইবার-হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিদেশী অ্যাপ দেশে ব্যাপকভাবে চলছে। তাহলে দেশীয় এমন অ্যাপের ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরগুলোর আপত্তির জায়গাটা কোথায় ?

দেশীয় এসব অ্যাপ টেলিকম সেবায় গ্রাহকের পছন্দের পরিধি বড় করবে উল্লেখ করে বেসিসের এই সভাপতি বলেন, তার কোম্পানি অনেক আগে হতেই তৈরি। সেই জানুয়ারিতে বিটিআরসি হতে অনুমোদনপত্র পেয়েছেন। মেট্রোটেল বাজারে আসার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বেশ কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে সুরাহা হয়েনি বলে এখনও বাণিজ্যিকভাবে আসতে পারছেন না। 

অ্যামটব মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এস এম ফরহাদ টেকশহরডটকমকে বলেন,  মোবাইল অপারেটরগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে স্পেকট্রাম কেনাসহ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তাদের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা দিয়ে তারা গ্রাহকদের সেবা দেয়। অপরদিকে আইপিটিএসপিদের লাইসেন্স ফিক্সড টেলিফোনের। কিন্তু কোনো রকম বিনিয়োগ ছাড়াই তারা এখন মোবিলিটিসহ ভয়েস সেবা প্রদান করার সুযোগ পেলো।

‘মোবাইল অপারেটররা সরকারের কাছে থেকে লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা করছে, তাই তারা বিটিআরসির কাছে বাকি লাইসেন্সধারীদের মতো সমান গুরুত্ব প্রত্যাশা করে। একই ধরনের সেবার জন্য একই লাইসেন্সিং নীতিমালা থাকার কথা। এছাড়া মোবাইল অপারেটররা শত কোটি টাকা খরচ করে গ্রাহকদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছে এবং নীতিমালার ব্যত্যয়ের জন্য তাদের জরিমানাও গুণতে হয়। অন্যদের জন্যেও কি একই নীতি প্রযোজ্য নয়’ বলছিলেন তিনি। 

সাধারণত আইপি টেলিফোনি অপারেটরগুলো ডেস্কটপে ব্যবহারের জন্য সফট ফোনের এবং সাধারণভাবে ব্যবহারে টেলিফোন সেট বা হার্ড ফোনের অপশন দিয়ে থাকে।

কিন্তু একজন গ্রাহক এমন ক্ষেত্রে আইপি ফোন ব্যবহারের মবিলিটি নিতে গেলে অসুবিধায় পড়েন । গুগল প্লে থেকে এ সংক্রান্ত অ্যাপ ডাউনলোড করলেও দেখা যায় সেখানে অনেক পোর্টের লিমিটেশন থাকে। আবার টেলিফোন অপারেটরগুলো হতে পোর্টগুলো বন্ধ থাকে। ওয়াইফাই দিয়ে কথা বলা গেলেও জিপিআরএস, থ্রিজি-ফোরজি দিয়ে কথা বলতে পারেন না।

কিন্তু এখন আইপি টেলিফোনের অ্যাপে এসব কোনো সমস্যা নেই এবং আইপি টেলিফোনি সেবায় এটি নতুন মাত্রা। 

হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবারের মতো অ্যাপগুলোতে শুধু ইন্টারনেটে অ্যাপ হতে অ্যাপে কথা বলা যায়। কিন্তু ইন্টারনেটভিত্তিক টেলিফোন বা আইপি টেলিফোনের অ্যাপে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কে বা ল্যান্ডলাইনে কথা বলা যায়। এ অ্যাপে ইন্টারনেট, সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ল্যান্ডফোন যে কোনো মাধ্যমে কথা বলার সুবিধা রয়েছে। আর এই আইপি ফোন হতে আইপি ফোনে কথা বলতে কোনো খরচ লাগে না।

আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম জানান, এসব অ্যাপে মোবাইল নাম্বারে প্রতি মিনিট ৩০ হতে ৪০ পয়সায় কথা বলা যাবে।

এখন চালু থাকা ব্রিলিয়ান্ট কানেক্ট অ্যাপে যেকোনো মোবাইল বা ল্যান্ড নম্বরে ৩০ পয়সা প্রতি মিনিটে কথা বলা যাচ্ছে। এতে ১ সেকেন্ড পালসও রয়েছে। 

এদিকে বিটিআরসি আরও কয়েকটি আইপিটিএসপিকে এ বিষয়ক অনুমোদন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু অ্যামটবের আপত্তিতে এখন সেগুলোর বিষয়ে ধীর এগুচ্ছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রথম এই লাইসেন্সের অনুমোদন পায় নভোকম এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারক্লাউড লিমিটেড। বছরের শেষ দিকে গিয়ে তারা সেবাটি চালু করে এবং দিনে দিনে তাদের ‘ব্রিলিয়ান্ট’ অ্যাপ ব্যবহার করে মানুষের কথা বলা বাড়ছে। 

একই বছরে ডিসেম্বরে আরও চারটি কোম্পানি আম্বার আইটি লিমিটেড, বিডিকম অনলাইন লিমিটেড, মেট্টোনেট বাংলাদেশ এবং লিংক থ্রি টেকনোলজি লিমিটেডও একই লাইসেন্স পেয়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন পায় আইসিসি কমিউনিকেশন্স লিমিডেট।

আইসিসি কমিউনিকেশন্সকে অনুমোদন দেওয়ার সময় বিটিআরসি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে দেশব্যাপী সকল আইপি টেলিফোনি সেবা দেয় এমন সব কোম্পানিকেই অ্যাপভিত্তিক কলিং সেবা চালুর অনুমোদন দেবেন।

দেশে এখন আইপিটিএসপি সেবার জন্য ৪১ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে।

আইজেডএস/এডি/২০১৯/২০৩০

 

*

*

আরও পড়ুন