ওএস নিয়ে হুয়াওয়ের যা চ্যালেঞ্জ

রিয়াদ আরিফিন, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : অ্যান্ড্রয়েড হারিয়ে এমন একটা চ্যালেঞ্জ হুয়াওয়ের সামনে এসেছে যেখানে অন্য রথী-মহারথীরা আগে ডুবেছে।

অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টা হয়ত ‘টিকে থাকার লড়াই’ ছিল না কিন্তু নিজেদের অপারেটিং সিস্টেমের প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ গুরুত্বে দিতে কার্পন্যও করেনি তারা। মাইক্রোসফট, স্যামসাং, নোকিয়ার মতো জায়ান্টদের হাল ছেড়ে দিতে হয়েছে।

তাহলে হুয়াওয়ের উপায় ?

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্মার্টফোন বিক্রির নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই অ্যাপলকে তিন নম্বরে ফেলে দেয়া ব্র্যান্ডটি এক নম্বরে থাকা স্যামসাংকে তাড়াচ্ছিল। যে গতিতে হুয়াওয়ে এগুচ্ছিল তাতে ২০২০ সাল নাগাদ স্যামসাংয়ের ঘাড়ের উপরে নিঃশ্বাস নিত। ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাজারে ৫৯ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ফোন সরবরাহ করেছে হুয়াওয়ে।

এখন দেখার বিষয় অ্যান্ড্রয়েডের বিচ্ছেদে সামনের দিনগুলোতে এই পরাক্রম সম্রাজ্য নিজেদের হংমেং দিয়ে কতোটা রক্ষা করতে পারে তারা। চলুন দেখে আসি মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের লড়াই…

মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের বর্তমান হাল
বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন বাজারে এখন অ্যান্ড্রয়েড রাজত্ব করছে। সর্বশেষ হিসাব মোতাবেক, অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের আইওএসের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে ৭৬ ও ২১ শতাংশ। এই দুইটি অপারেটিং সিস্টেমের বাইরে অন্য সকল অপারেটিং সিস্টেম মিলিয়ে মাত্র ৩ শতাংশের বাজার রয়েছে এখন।

অপারেটিং সিস্টেম অনুযায়ী স্মার্টফোনের মার্কেট শেয়ার (সূত্রঃ স্ট্যাটকাউন্টার)

অ্যান্ড্রয়েড জনপ্রিয় হয় যেভাবে
অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমটি প্রথম ২০০৩ সালে তৈরি করা হয় ডিজিটাল ক্যামেরায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, যা পরে গুগল কিনে নেয়। ২০০৮ সালে প্রথম এই অপারেটিং সিস্টেমের ফোন বাজারে আসে। গুগল প্লাটফর্মটিকে ওপেন সোর্স করে দেয়, ফলে যেকোন কোম্পানি চাইলে এটি ব্যবহার করে ফোন তৈরি করতে পারে। ওপেন সোর্স হওয়ার এর জনপ্রতিয়তা দিনদিন বাড়তে থাকে। এর অ্যাপ্লিকেশন ভাণ্ডার দিনদিন সমৃদ্ধ হতে থাকে।

বাজারে থাকা সকল ব্র্যান্ডই অপারেটিং সিস্টেমটির দিকে ঝুঁকতে থাকে। অ্যান্ড্রয়েডের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমগুলো বন্ধ হয়ে থাকে। পরবর্তীতে মোবাইল ফোন নির্মাতা কোম্পানিগুলো নিজেরা কিছু অপারেটিং সিস্টেম চালু করার চেষ্টা করলেও বেশিরভাগই কুলিয়ে উঠতে পারেনি অ্যান্ড্রয়েডের সঙ্গে।

অ্যান্ড্রয়েড বনাম অন্য অপারেটিং সিস্টেম
যেসব অপারেটিং সিস্টেম অ্যান্ড্রয়েড ঝড়ে শেষ অবধি সফলতার মুখ দেখতে পারেনি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ মোবাইল, স্যামসাংয়ের টাইজেন, ফায়ারফক্সের ফায়ারফক্স ওএস (কাই-ওএস)। এমনকি নকিয়া, ইন্টেল ও লিনাক্স ফাউন্ডেশনের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা মিগো ওএস ও বেশিদূর এগোতে পারেনি।

অ্যান্ড্রয়েডের জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে হুয়াওয়ে?
অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমটি এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ, এটিকে ওপেন সোর্স করা। এর ফলে এর জন্য দ্রুতই অনেক অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হয়, যার ফলে এটি দ্রুত বাজার দখল করতে থাকে। অ্যান্ড্রয়েডের তুমুল জনপ্রিয়তাকে টেক্কা দিয়ে নতুন কোন অপারেটিং সিস্টেমকে বাজারে দাঁড়াতে গেলে অবশ্যই মেরুদণ্ড শক্ত হতে হবে ব্র্যান্ডটির।

কেমন হতে পারে হুয়াওয়ের নতুন অপারেটিং সিস্টেম
নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হয়ে গেলেও হুয়াওয়ে চাইলে অ্যান্ড্রয়েডের ওপেন সোর্স প্লাটফর্মটি ব্যবহার করতে পারবে। তবে এই পথে এগুলো প্লে স্টোর, জিমেইল, ম্যাপসসহ আরও কিছু আকর্ষণীয় অ্যাপ ব্যবহার না করতে পারা ও নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট না পাওয়ার মত প্রতিবন্ধকতা থাকছে।

তবে এক্ষেত্রে হুয়াওয়ে চাইলে অ্যান্ড্রয়েড ওপেন সোর্স সিস্টেম ব্যবহারের পাশাপাশি গুগল প্লের পরিবর্তে নিজেদের অ্যাপ স্টোর তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রেও চীনের বাইরে বৈশ্বিক বাজারে সফলতা অর্জন করাটা বেশ চ্যালেঞ্জ হবে হুয়াওয়ের জন্য।

কেননা পরিপূর্ণ ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া সকল ধরনের অ্যাপ তৈরি করা ডেভেলপারদের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তৃতীয় পক্ষ এসব অ্যাপ প্লাটফর্মে বৈশ্বিক গ্রাহকরা তেমন একটা আগ্রহ দেখান না। উদাহরণস্বরূপ অ্যান্ড্রয়েডকে ভিত্তি করে গড়ে তোলা নকিয়ার ‘এক্স প্লাটফর্ম’। যারা এই মডেল অনুসরণ করে শেষ অবধি ব্যর্থ হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ প্লে স্টোরের বিকল্প ‘অ্যাপ গ্যালারি’ আনছে হুয়াওয়ে

আবার হুয়াওয়ে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ও উন্নয়ণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই পথটিও খুব একটা মসৃণ হবে না, যা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। ওপেন সোর্স হওয়ার বিগত কয়েক বছরে অ্যান্ড্রয়েডের যে অগ্রগতি সাধন হয়েছে, এর পাশে নতুন করে কোন অপারেটিং সিস্টেম এসে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে তা সময়ই বলে দেবে! নতুন অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে এসে তাকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মত করে তৈরি করা এবং এর পাশাপাশি সকল ধরনের অ্যাপ্লিকেশনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ বৈকি!

হংমেং নিয়ে সফলতার বিষয়টি নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাজারে একে সর্বজনীন করতে হুয়াওয়ের চমকপ্রদ কোনো কৌশলের উপর। নি:সন্দেহে এর ফল দ্রুত মিলবে না। তবে হুয়াওয়ের যে ব্যাপক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলমেন্ট বিনিয়োগ ও বাজার দখলের যে আগ্রাসী মনোভাব তা ঠিক থাকলে দেরিতে হলেও মিষ্ট ফল মিলতে পারে।

আরও পড়ুনঃ হুয়াওয়ের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হংমেং

সর্বশেষ ৯০ দিনের জন্য হুয়াওয়ের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে মার্কিন সরকার। একই সঙ্গে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুয়াওয়ের প্রতি নরম সুরে কথা বলেছেন, বাণিজ্য চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হতেও আহবান জানিয়েছেন। তবে মার্কিন-চীনা এই বাণিজ্য যুদ্ধ কোথায় গিয়ে ঠেকে আর হুয়াওয়ে উদ্ভুত যেকোন পরিস্থিতে কোন পথে হাঁটে তাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুনঃ হুয়াওয়ে-গুগল নিষেধাজ্ঞা কোথায় গিয়ে ঠেকবে

আরএ/ইএইচ/এডি/মে২৪/ ২০১৯/ ১৮০০

*

*

আরও পড়ুন