টেলিনর-আজিয়াটা একীভূতকরণ : বাংলাদেশের ভাবনার কী আছে

টিআইএম নূরুল কবীর : টেলিনর-আজিয়াটার মার্জার উদ্যোগের ঘোষণা গত দু’দিন ধরে এশিয়ার টেলিকম এবং অর্থনৈতিক বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

বাংলাদেশও এই আলোচনার বাইরে নেই, কারণ এখানে টেলিনর ও আজিয়াটার শক্তিশালী দুটি প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। টেলিনরের গ্রামীণফোন ও আজিয়াটার রবি।  

টেলিনর-আজিয়াটা এই সোমবার তাদের মার্জার নিয়ে যে ঘোষণা দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগামী দু’মাস তারা আলোচনা করবে এবং ২০২০ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে গিয়ে এটি একটি পরিণতি পাবে।

এটি ইনভেস্টরদের একটি কৌশল। যে আটটি দেশে টেলিনর-আজিয়াটার ব্যবসা আছে যেখানে কোনো দেশে টেলিনরের, কোনা দেশে আজিয়াটার আবার কোনো দেশে উভয়েরই।  

এখানে তাদের এই ঘোষণায় বিশ্বের বাজারগুলোতে যে আলোচনা-রিঅ্যাকশন হচ্ছে, বিশেষ করে এশিয়ান মার্কেটগুলোতে, সেটি তারা পর্যবেক্ষণ করছে। সেখানে রয়েছে রেগুলেটর, গ্রাহক, বিনিয়োগকারী, নীতি-নির্ধারক এবং মিডিয়া। এটি তাদের জন্য জরুরি। সেগুলোর কোনো কোনো বিষয় তাদের মার্জার আলোচনায়ও আসতে পারে। 

বাংলাদেশে এক সময় ছয়টি কোম্পানি ছিল। একটি ন্যাচারাল ডেথ হলো, সিটিসেল বন্ধ হলো, এয়ারটেল মার্জ করতে বাধ্য হলো। টেলিটক সরকারের সাপোর্টে চলছে কিন্তু এটিকে চলা বলে না। এই প্রতিযোগিতায় এটি একদমই নগণ্য। বাংলালিংকের বর্তমান অবস্থা তুলনা করলে তারও একটি দূর্বল জায়গায় রয়েছে।

একটি মার্জার যখন দুটি প্যারেন্ট কোম্পানি করে তখন অবশ্যই তার একটা প্রভাব ওই কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি থাকা বাজারগুলোতে পড়ে।

এখন টেলিনর-আজিয়াটা মার্জারের আলোচনায় বাংলাদেশ ও ভারতকে আলাদা রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশকে কেন আলাদা রেখেছে?

এর একটি কারণ স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের রেগুলেটর আর মালয়েশিয়ান রেগুলেটর এক না। বাংলাদেশে কম্পিটিশন ল আছে, এসএমপি গাইডলাইন আছে। সে অনুযায়ী এই মার্জারে এখানে তাদের বাজার দখল যদি ৮০ বা ৮৫ শতাংশে চলে যায় সেটি রেগুলেটর কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এটি এখানে কার্যকর করতে পারবে না, যা তারা জানে।

টেলিনর ও আজিয়াটার নিজস্ব যেসব ব্যবসা আছে সেগুলো হয়ত তারা একসঙ্গে করবে। কিন্তু রবি এবং গ্রামীণফোনের যে মোবাইল অপারেটর লাইসেন্স আছে সেটিকে একসঙ্গে করা রেগুলটর ভিউ হতে কঠিন।

এখানে মূল কোম্পানি একীভূতকরণ হলে দেশে জিপি-রবির অপারেশন আলাদা হলেও ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজিতে সুবিধা নিয়ে নিতে পারে।

টেলিনর-আজিয়াটা মার্জারে তাদের সব সেবা, সব সম্পদকে এক করা হচ্ছে। যেখানে আইনসম্মতভাবে বিষয়গুলো ঠিক থাকবে সেখানে এক হবে, যেখানে ঠিক থাকবে না সেখানে এক হবে না-এটি একটি কৌশলের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে।

বিটিআরসির এখন কোনো ভূমিকা নেই। অবজার্ভার হিসেবে তাদের দেখতে হবে এই মার্জারে কী কী স্টেপ নেয়া হচ্ছে।

দেশের টেলিকম খাতের সবকিছু আইনে নিয়ন্ত্রিত। সেখানে কেউ একটি সার্ভিস দিতে গেলেও, প্রমোশনাল বিষয়েও টেলিকম আইন অনুযায়ি বিটিআরসির কাছ হতে অনুমতি নিতে হয়। এখানে ট্যারিফেরও অনুমতি নিতে হবে। তাই মার্জার হলেই এই হাইলি রেগুলেটেড বাজারে একচোটিয়া কিছু করার সম্ভাবনা নেই।    

টেলিটক নিয়ে বেশ ভাবনার আছে। টেলিটককে এখন বিদেশি বিনিয়োগ বা অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে মার্জ করার সুযোগ দেয়া উচিত। এর ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়া যেতে পারে। এতে ম্যানেজমেন্ট এবং ইনভেস্টমেন্ট আরও ভাল হবে, অপারেটরটি শক্তিশালী হবে। এটি হলে বাজারে প্রতিযোগিতা ভাল হবে।

টেলিনর-আজিয়াটার মার্জার হলে দেশে এর ইফেক্ট কবে পড়বে তা এখনও বলার সময় আসেনি। কিন্তু টেলিটকের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতির সময় এসেছে। এটি এখনও যদি সাবসিডি দিয়ে সরকার চালাতে চায় তাহলে এটি আর এগুবে না।

অন্যদিকে বাংলালিংক অনেকদিন ধরে স্ট্র্যাগল করছে। সম্প্রতি ওদের কয়েকটি কোয়ার্টার দেখা যাচ্ছে তুলনামূলক ভাল করছে। কিন্তু এটি সিগনিফিকেন্ট না। আজিয়াটা-টেলিনেরর যে মার্জার যেখানে বাংলালিংকের কী হবে?

গ্লোবালি মার্জার-একুজ্যিশন-ইনভেস্টমেন্ট নরম্যাল বিষয়। এখানে যেকোনো বড় কোম্পানি কোনো না কোনো কোম্পানিতে ইনভেস্ট করতে পারে, ওই ইকোনমিতে তারা আলাদা দুটি বড় প্রতিযোগিও হতে পারে।

দেশে রবিতে আজিয়াটার ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ভারতের ভারতী এয়ারটেলের ২৫ শতাংশ এবং জাপানের এনটিটি ডোকোমোর ৬ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

গ্রামীণফোনের উদ্যাক্তাদের মধ্যে নরওয়ের টেলিনরের হাতে রয়েছে ৫৫ দশমিক ৮০ শতাংশ শেয়ার এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ টেলিকমের কাছে রয়েছে ৩৪ দশমিক ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বাকি ১০ শতাংশ শেয়ার।

ভিওনের গ্রুপে এখনও টেলিনরের  ৮ দশমিক ৯শতাংশ শেয়ার হয়েছে।

এখন গ্রামীণফোন-রবি মূল কোম্পানি একীভূত হলে টেলিনরের হাতে থাকবে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার আর আজিয়াটার দখলে থাকবে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার।

বিনিয়োগের এই অংশগুলো বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ইনভেস্টমেন্ট গতি-প্রকৃতি দেখতে হবে। যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চলে আসে। 

বিনিয়োগ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে একটি দেশে টেলিনর তিনটি কোম্পানির উপরে প্রভার বিস্তার করছে। সব মিলিয়ে বোঝাই যাচ্ছে, টেলিনর এশিয়ার জন্য আরও বড় জায়ান্ট হয়ে যাচ্ছে। 

এখন মার্জারের কৌশল পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দুই মাসের যে আলোচনার কথা দুটি কোম্পানি বলছে সেখানে কী আউটকাম আসে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক দেশের একজন টেলিকম বিশেষজ্ঞ, মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব তিনি। তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকম খাতে দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।  

*

*

আরও পড়ুন