তথ্যপ্রযুক্তিতে নারী : কতটা এগোচ্ছে দেশ?

ড. লাফিফা জামাল, শিক্ষক ও সংগঠক : আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এ খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বর্তমানে দেশে বিদ্যালয় পর্যায় থেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। অন্যান্য খাতের মতো তথ্যপ্রযুক্তিতেও নারীদেরকে সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। নারীর ক্ষমতায়নে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশকে এগিয়ে যেতে হলে, কোনো জাতিকে উন্নত করতে হলে নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই।

বর্তমানে প্রায় ২৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশুনা করছে। তবে সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা কর্মক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য লাভ করতে পারছে না। সরকারি হিসাব মতে, কর্মক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিতে মাত্র ১২ শতাংশ নারী কাজ করছেন। তার মধ্যে অধিকাংশই প্রাথমিক বা মধ্যম পর্যায়ের কাজ করেন, নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে নারীর অবস্থান শতকরা ১ শতাংশের চেয়েও কম–অদৃশ্য কাঁচের ছাদে (গ্লাস সিলিং) আটকে যায় আমাদের নারীরা।

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) এর একটি জরিপে দেখা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে পড়াশুনা করছে এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে প্রোগ্রামিংকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী।

অথচ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত বিষয়ে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ প্রতি বছর বাড়ছে ১৭ শতাংশ হারে–যেখানে অন্যান্য খাতে এ বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ।  শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্রবিশ্বেই প্রকৌশল ও প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ইউনেস্কোর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, জাপানের মতো প্রযুক্তিতে উন্নত একটি দেশে মাত্র ৫ শতাংশ নারী প্রকৌশলী কাজ করছেন। কোরিয়াতে এ হার ১০ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ শতাংশ এবং ফিনল্যান্ডে ২২ শতাংশ। সব দেশকে ছাপিয়ে এক্ষেত্রে সবার উপরে অবস্থান করছে শ্রীলঙ্কা–সেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী প্রকৌশলী রয়েছেন।

১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর এসিএম-আইসিপিসি’র ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু গত ২০ বছরে একজনও নারী প্রোগ্রামার বাংলাদেশ থেকে এ আসরের ফাইনালে যেতে পারেনি। ২০১১ সালের পর থেকে গণিত অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক আসরে কোন নারী শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেনি। একই অবস্থা ফিজিক্স অলিম্পিয়াড এবং ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডেও। অথচ দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোর ফলাফলেও আমরা মেয়েদের আধিপত্য দেখতে পাই। তাহলে কেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে? নারীর মেধা তো কোনো অংশেই পুরুষদের চেয়ে কম নয়। সেই মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগালেই এক্ষেত্রে সফলতা আসবে।

robot-olympiad-techshohor ছবি-সংগৃহীত

তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়গুলো নিয়তই পরিবর্তনশীল। প্রতিদিনই আসছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। কাজেই এক্ষেত্রে কাজ করতে হলে নিজের দক্ষতাকেও সেভাবে বৃদ্ধি করতে হয়, সময় দিতে হয়ে প্রচুর, ৯টা-৫টার ডেস্কজবের ছকে একে বেঁধে রাখা যায়–যেটাকে অনেক নারী তাদের কাজের পক্ষে অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অফিসের ধরাবাঁধা সময়ের বাইরে বাড়িতে বসেও অনেক কাজ করা সম্ভব। চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজের সময় সুবিধামতো পরিবর্তন করে নেয়া সম্ভব। যারা ফ্রিল্যান্সার হতে আগ্রহী তারা একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট কানকশন থাকলে বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ঘরে বসে কাজ করেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারেন, করছেনও।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিতে মেয়েদের সংখ্যা কম হওয়ার অন্যতম কারণ আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা। এ বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করা হয় কঠিন বিষয় হিসেবে, কিন্তু আর যা কিছু কঠিন তা তো মেয়েদের জন্য নয়!

টেকনিক্যাল বিষয়গুলোকে ছেলেদের বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়। অথচ বিশ্বের প্রথম প্রোগ্রামার এডা লাভলেস ছিলেন একজন নারী। প্রথম কম্পাইলার নিয়ে কাজ করেন গ্রেস হপার, তৈরি করেন প্রোগ্রামিং ভাষা কোবল (COBOL)। সে সময়ে এত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এডা লাভলেস, গ্রেস হপার, মার্গারিটা হ্যামিলটনের মতো প্রোগ্রামার এবং গণিতবিদদের আমরা পেয়েছি–তাহলে এখন কেন আমরা সেভাবে আগাতে পারছি না?

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের একটি নিয়মিত কার্যক্রম ‘মিসিং ডটার’। এ কার্যক্রমের আওতায় নিয়মিত আয়োজন করা হয় গার্লস প্রোগ্রামিং কনটেস্ট, অনলাইন গার্লস প্রোগ্রামিং কনটেস্ট, এডা লাভলেস গার্লস প্রোগ্রামিং ক্যাম্প, গ্রেস হপার গার্লস প্রোগ্রামিং ক্যাম্প, মার্গারিটা হ্যামিলটন গার্লস প্রোগ্রামিং ক্যাম্প, গণিতে আগ্রহী ছাত্রীদের জন্য আয়োজন করা হয় লীলাবতী ক্যাম্প, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কর্মক্ষেত্রগুলো মেয়েদের ঘুরে দেখার জন্য আয়োজিত হয় ‘সিইং ইজ বিলিভিং’ কর্মসূচী।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলের ছাত্রীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে অতিসম্প্রতি নতুন একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে, যার নাম ‘অবাক কুতূহলে’। এ কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থীরা দুই-তিন দিন ধরে পরিদর্শন করে  বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আইসিটি-বিষয়ক বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান, কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায় এসকল প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করছে তাদের, কথা বলার সুযোগ পায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা ও কর্মজীবিদের সঙ্গে। পরবর্তীতে এক বছর ধরে তাদের মেন্টরিং করা হয়–উপযুক্তভাবে তৈরি করা হয় তাদের ভবিষ্যতের জন্য।

বাংলাদেশ উইমেন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি) প্রযুক্তি খাতে পেশাগতভাবে জড়িত নারীদের একটি প্রধান সংগঠন। এ সংগঠনটি তার জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করছে তথ্যপ্রযুক্তিতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী নারীদের জন্য। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরির জন্য তারা কাজ করছে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সহায়তা দান, নারীদের উন্নয়নে বিভিন্ন কাউন্সেলিং সেশন, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সামাজিক সচেতনতা বিষয়ক অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে আয়োজন করছে বিডব্লিউআইটি।

বর্তমান সরকার তথ্য প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দশ হাজারেরও বেশি দক্ষ নারী জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত লিভার্জিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স (এলআইসিটি) প্রোজেক্টের অধীনে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী যাতে অংশগ্রহণ করে সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ডিভিশনের অধীনে এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) উদ্যোগে পরিচালিত এই এলআইসিটি প্রোজেক্টে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার নারী ও পুরুষকে আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রশিক্ষিত ১০ হাজার নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

বিশ্ব  ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,  প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ চাকরির বাজার তৈরি হয়। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে চাকরির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। আত্মবিশ্বাস, নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত অনুশীলনের মাধ্যমে নারীরা তথ্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তাদের সামাজিক ও লিঙ্গ সংক্রান্ত বাধা পেরিয়ে নিজে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

লেখক : ড. লাফিফা জামাল, চেয়ারপার্সন, রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সভাপতি, বাংলাদেশ উইমেন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি), সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন), কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি।

*

*

আরও পড়ুন