দেশীয় ই-কমার্সকে অনেকটা সুরক্ষা দেবে এই নীতিমালা

জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০১৮ কার্যকরে গেজেট প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি। কেমন হলো এই নীতিমালা আর দেশের ই-কমার্স খাতে কেমন প্রভাব ফেলবে সেসব নিয়ে টেকশহরডটকমের মুখোমুখি হয়েছেন ফাহিম মাসরুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল-আমীন দেওয়ান।  

ফাহিম মাসরুর দেশের সুপরিচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। দেশের শীর্ষস্থানীয় জব পোর্টাল বিডিজবস ডটকমের  প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।  

এই উদ্যোক্তা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর পরিচালক। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও ই-কমার্স অ্যালায়েন্সের সাবেক আহবায়কও। 

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে যেসব ব্যক্তি উদ্যোক্তা হয়েছেন তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ফাহিম মাসরুর ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ হতে বর্ষসেরা উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। 

টেকশহর : জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০১৮ কার্যকরে গেজেট প্রকাশ হলো সম্প্রতি। দু’বছর ধরে এ খাতের বিভিন্ন সংগঠন, উদ্যোক্তা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিত্বে এই নীতিমালা প্রণয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সভা-আলোচনায় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে।

অবশেষে নীতিমালা পেলেন। কেমন হলো এই ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা?

ফাহিম মাসরুর : সার্বিকভাবে এই নীতিমালা প্রশংসনীয়। নীতিমালার বেশ কিছু দিক রয়েছে যেগুলোতে এ খাতের উদ্যোক্তারা আনন্দিত হবেন। এর মধ্যে নেট নিউট্রালিটির বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

আরেকটি বিষয় বিদেশি কোম্পানিগুলোরে ক্ষেত্রে। এখানে বাংলাদেশি কোম্পানি ও অনুরূপ বিদেশি কোম্পানি ৫১:৪৯ ইক্যুইটিভিত্তিক মালিকানা ব্যবস্থায় বিদেশী বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার- প্রচারণার ব্যবস্থা নেয়া, দেশব্যাপী ইন্টারনেট সম্প্রসারণ ও সহজলভ্য করা,  সেন্টার অব এক্সেলেন্স করা, এসক্রো সার্ভিস, আন্তঃব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়্যাল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল ফিনান্সিয়্যাল সার্ভিস (ডিএফএস) লেনদেন উপযোগী সিস্টেম বাস্তবায়ন, ভোক্তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোড অব কন্ডাক্ট ইত্যাদি বিষয়গুলো যুগোপযোগী হয়েছে।

টেকশহর : ই-কমার্স খাতে এই নীতিমালার প্রভাব কেমন হবে?

ফাহিম মাসরুর : নেট নিউট্রালিটি এবং বিদেশি কোম্পানির জন্য দেশীয় অংশীদারিত্বের শর্তের প্রভাব অনেক।

ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য নেট নিউট্রালিটি বড় বিষয় ছিল। কারণ দেশে টেলিকম কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্কেই ৯০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এখন টেলিকম কোম্পানিগুলো যদি ই-কমার্সে আসে, তাহলে তাদের এই নেটওয়ার্কে অন্যদের ই-কমার্সের অ্যাকসসে অ্যাফেক্ট পড়তে পারে।

আর বিদেশি কোম্পানির দেশীয় অংশীদারিত্বের বাধ্যবাধকতার ফলে দেশীয় ই-কমার্স খাত বিকশিত হবে। কারণ বিদেশীরা বড় ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে এসে নানাভাবে অসম প্রতিযেগিতা তৈরি করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের কোনঠাসা করে ফেলে।

বিদেশী কোম্পানিগুলো এখানে এসে শুধু বিপণনে কর্মসংস্থান করে । অথচ কারো প্লাটফর্ম, প্রোডাক্ট ডেভেলমেন্ট, ডিজাইনসহ প্রকৌশলসহ অন্যান্য জায়গায় দেশীয়দের কর্মসংস্থান করে না। এসব জায়গায় তাদের সব রিসোর্সে বিদেশের। এখন দেশীয় অংশীদারিত্বের ফলে এখানে দেশীয় স্কিল ডেভেলমেন্ট হবে, কর্মসংস্থানের জায়গা বাড়বে।

এছাড়া অন্যান্য সে সব বিষয় এসেছে তা যদি ঠিক সময়ে ঠিকভাবে প্রতিপালন করা হয় তাহলে ই-কমার্স খাত সুশৃঙ্খল হবে।   

টেকশহর : কী থাকলে আরও ভাল হতো?

ফাহিম মাসরুর : ট্যাক্সেশন পলিসির বিষয়টি নীতিমালার গেজেটে নেই। এখন ই-কমার্সের জন্য ট্যাক্স দিতে হয়। ই-কমার্সকে আইটিইএস মধ্যে ফেলা হয়নি, এটি করার দাবি ছিল সকলের।

এই পলিসির উদ্যোগ নিয়েছিল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও সেল এটি করলো। এখানে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে কতটুকু দায়িত্ব বাস্তবায়ন করবে তার স্পষ্টকরণ থাকলে ভাল হতো।  ডিটিও সেলের কর্মপরিধি কতটুকু সেটাও দেখার বিষয় আছে মনে করছি।

নেট নিউট্রালিটির শর্তটি থাকলেও সেখানে টেলিকম কোম্পানিগুলোর বাধ্যবাধকতার বিষয়টি স্পষ্ট নেই। যেমন তারা ই-কমার্স ব্যবসা করতে পারবে কিনা ? করলে কীভাবে কোন নিয়ম-নীতির মধ্যে করবে? ইত্যাদি বিষয়গুলোর ব্যাখ্যার দরকার রয়েছে বলে মনে হয়।   

বিদেশী কোম্পানির দেশীয় অংশীদারিত্বের বিষয়টি বাস্তবায়নকারী হিসেবে বলা হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কথা। এখানে স্পষ্টকরণ থাকলে ভাল হতো। বাস্তবায়নকারী সংস্থা অনেকে এখানে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিয়ে একটা ঝুঁকি আছে। যেটা প্রথমদিকে বোঝা যায় না। এখন চীনা কোম্পানিগুলোর আধিপত্য দেখা যায়। এরা যখন মার্কেটে প্রভাব তৈরি করে তখন দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যায়।

বিদেশী কোম্পানিগুলোর প্রোডাক্ট সাপ্লাই হয় চায়না হতে। তাদের পণ্যের কারণে দেশীয় পণ্য প্রস্তুতকারকরা টিকতে পারে না।   

পণ্যের দাম ডাম্পিংয়ের বিষয়টিও আছে। এখানে বেশি ইনভেস্টমেন্টের কারণে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক কমিয়ে বাজার দখল নিতে পারে বিদেশীরা। অনেক পণ্যের এক্সক্লুসিভিটি ধরে রাখে তারা, যাতে ঐ পণ্যের জন্য গ্রাহক তার ওখানে যেতে বাধ্য হয়।

বিদেশীদের ইনভেন্টরি মডেলে ই-কমার্স করতে না দেয়া। ভারতে কিন্তু বিদেশীরা এই মডেলে ব্যবসা করতে পারে না। সেখানে তাদের জন্য মার্কেটপ্লেস মডেল অনুমোদন করা হয়েছে।

নীতিমালায় এসব কিছু বিষয়ে সুরক্ষা ও স্পষ্টকরণ থাকলে ভাল হতো।  

টেকশহর : এখন দেশের ই-কমার্স খাতের অবস্থা কেমন?

ফাহিম মাসরুর : এখানে ই-কমার্সের অস্থির সময় যাচ্ছে। অনেকগুলো উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ই-কমার্সে অনেক ইনভেস্টমেন্ট লাগে। এখনও দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ভর্তুকি দিয়ে চলছে। এফ কমার্সে অনেকে টিকে আছে, তাদেরও অনেকে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ফেইসবুকেও অনেক বুস্ট করতে হয়ে।

দেশের পুরো ই-কমার্স খাত ফেইসবুককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এটি কোনো সুখকর বিষয় নয়। এই বৃত্ত হতে বের হতে হবে।

ই-কমার্সে এখন ঢাকায় বেশ উন্নতি হয়েছে। ঢাকার বাইরে সমস্যা রয়েছে, সেখানে ডেলিভারিই বড় সমস্যা। ভাল পণ্য বা মান বোঝার জন্য ক্রেতাদের মার্চেন্ট বা পণ্যের রিভিউ দেখা উচিত।

বাংলাদেশের ই-কমার্সের ভবিষ্যত গ্রামে। সেখানে ইন্টারনেট চলে যাচ্ছে। সরকার সারাদেশের মানুষের কাছে ইন্টারনেট দিতে অনেক উদ্যোগও নিচ্ছে। তাই ই-কমার্সগুলোকে লক্ষ্য থাকতে হবে সেদিকেই।   

*

*

আরও পড়ুন