Techno Header Top

শুধু পার্ক নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত হাইটেক নগরী

Evaly in News page (Banner-2)

আশরাফুল আলম জয়, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সিঙ্গাপুর : সেনঝেন শহরকে এখন চীনের নতুন সিলিকন ভ্যালি বলা হয়। চীনের অন্যান্য উন্নত শহর বেইজিং বাসাংহাইয়ের মতো এতো উন্নত অবস্থা ছিল না সেনঝেনের; কিন্তু মাত্র দু’চার দশকের ভেতরেই পুরো শহরটিকে খুব পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে।

মানুষ দিন-রাতের যে কোনো সময়েই এখানে নিরাপদে চলাফেরা করছে। আইন-শৃঙখলার উন্নত পরিস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

শহরে তেমন কোনো ট্রাফিক জ্যাম চোখে পড়ল না, ব্যস্ত রাস্তাগুলোয় একাধিক লেন দিয়ে সুশৃঙখলভাবে গাড়ি যাচ্ছে।

এ ছাড়াও পুরো শহরে জালের মতো বিছিয়ে আছে এমআরটি ট্রেনের নেটওয়ার্ক।

এমআরটির ভেতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবার এক কাঠি সরেস। বিমানবন্দরের মতো ব্যাগ-ব্যাগেজ স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে হয়। ট্রেনের টিকেট হিসেবে প্লাস্টিকের কয়েন কিনতে হয়, ছোট একটা গর্তে স্ক্যান করা লাগে।

মূল শহরে আকাশ ছোঁয়া চোখ জুড়ানো দালান চোখে পড়বে। একেবারে গোড়া থেকে পরিকল্পিতভাবে শহরটিকে তৈরি করার কারণে চীনের বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলীবাবা, টেন্সেন্টসহ ছোট বড় দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে নিশ্চিন্তে বিস্তৃত হচ্ছে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করে, এমন একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওরা ভালো বেতন পায়। বাংলাদেশি টাকায় মাসে আড়াই লাখ টাকা মাসিক বেতন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এর চাইতেও অনেক বেশি দেয় দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের।

শুধু ওয়েব এপ্লিকেশন বানানোই নয়, রোবোটিক্স, আইওটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – কোনটাতেই না নেই ওদের।

প্রযুক্তিবিদদের অনেকেই ঋণ নিয়ে সুন্দর মডেলের গাড়ি, বিলাসি ফ্ল্যাট কিনেছে। সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু সমস্যা একটা থেকেই যায়, ইংরেজিতে খুব দুর্বল ওরা। ইউরোপ, আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষক এনে তা কাটানোর চেষ্টা চলছে।

এখানে ইংরেজি শিক্ষা দেন, এমন এক আমেরিকান বললেন, শুধু ইংরজি শিখিয়েই নিজের দেশের চেয়ে ভালো উপার্জন করছেন তিনি। উপরন্তু নতুন একটা দেশে নতুন অভিজ্ঞতা ভালোই অর্জন করছেন।

প্রযুক্তিকেন্দ্রিক পেশাগুলোতে ভালো আয়-রোজগারের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা। হরেক রকম মার্কেট, বিনোদনকেন্দ্র, উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসার হয়েছে, সাধারণ মানুষের কাজের অভাব নেই।

তবে চীনে যাওয়ার একটা বিপদ হলো, সেখানে গুগল, ফেসবুক কিছুই কাজ করে না (ভিপিএন দিয়ে যদিও ব্যবহারের চোরাই উপায় আছে, তবে খুব দরকার না হলে পর্যটকরা ও পথে যান না)।

গুগল, ফেসবুক ব্যবহার না করা গেলেও ওদের নিজেদের সেরকম প্রযুক্তি আছে। সাধারণের জীবনেও প্রযুক্তি মিলে মিশে আছে।

একদিন অফিসে এক সহকর্মী বলছিলেন, এখানে তাজা ফল পাওয়া যায়। অফিসে সেগুলো আসতে কতক্ষণ লাগবে, এটা ভাবতে ভাবতেই দশ-বারো পদের কাটা ফল হাজির। এটা সম্ভব হয়েছে, আলাদীনের চেরাগ মোবাইল অ্যাপের কারণে।

আরেক দিন দুপুরের খাবার শেষে ফ্রেশ জুস খাবো ভাবছি, এক সহকর্মী নিয়ে গেলেন অরেঞ্জ জুসের ভেন্ডিং মেশিনে। পেমেন্ট দেবার পর, পাঁচটি সরস কমলা চিপে এক গ্লাস ঠান্ডা রস বের হলো। টিভির বিজ্ঞাপনের মতো চুমুকেই যেন অনাবিল শান্তি!

সেখানকার ডিজেআই প্রতিষ্ঠান ড্রোন বানিয়ে হুলুস্থূল অবস্থা করে ফেলেছে। ক্ষুদে আকার থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির ড্রোন শোভা পাচ্ছে শহরজুড়ে থাকা বহু শোরুমে। অবস্থা দেখে ড্রোনে মানুষ উড়িয়ে নেবার দৃশ্য দেখতে খুব বেশি অপেক্ষা করা লাগবে না!

স্থানীয় আলীবাবার সফলতা এখন বিশ্ব জুড়ে কে না জানে তা। এ টেক জায়ান্টের অন্যতম বড় অফিস এই সেনঝেনে। ওদের নিজস্ব সার্চ ইঞ্জিন বাই ডু চীনাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অংশ।

চীনের টেন্সেন্ট কোম্পানির ‘wechat’ সেখানে তুমুল জনপ্রিয়। শুধু মোবাইলে চ্যাট করার জন্যই নয়, ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেটোয়ার্কের কাজও দিব্যি চলে ওটা দিয়ে।

চীনে প্রায় সবধরণের লেনদেন হয় উই চ্যাট দিয়ে। যদিও ভিক্ষুক চোখে পড়েনি, তবে আমার ধারণা, ভিক্ষুক থাকলেও উই চ্যাট দিয়ে টাকা নিতো!

প্রেক্ষাপটবাংলাদেশ

ওই দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, শুধু হাইটেক পার্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন সুপরিকল্পিত হাইটেক নগরী। আনন্দের ব্যাপার, আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইটেক পার্ক করা হচ্ছে। দু:খের ব্যাপার এখনও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

রাজধানী থেকে দূরে হলেও সুপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা, নিরাপত্তা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখলে কত দ্রুত একটা নতুন শহর প্রযুক্তি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে সেনঝন তার একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে।

আমাদের হাইটেকপার্কের কর্তাব্যক্তিরা এখানে শুধু প্লেজার ট্রিপে না এসে একটু খোঁজখবর নিয়ে নিজেদের দেশে হাইটেক পার্ক স্থাপন করা সংশ্লিষ্ট নতুন শহরগুলোতে কিভাবে বাস্তব ও কার্যকরি অবকাঠামো দাঁড় করানো যায়, সেই ধারণা নিতে পারেন।

রাজনৈতিক কারণে ফেসবুক, গুগল, আমাজনের মতো পশ্চিমা জনপ্রিয় প্রযুক্তিগুলোর বিকল্প চীন নিজেরাই তৈরি করেছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সেইপথে না যেতে হলেও দেশি হাজার সমস্যা সমাধান দিতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি। এ ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে বিদেশি চাহিদাতো আছেই।

উন্নতমানের প্রযুক্তিউদ্ভাবন ও সেবার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে কেবল হাইটেক পার্ক করলেই হবে না, আমাদের দরকার আন্তর্জাতিক মানের হাইটেক নগর পরিকল্পনা। দরকার শুধু সদিচ্ছা।

গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে প্রযুক্তিবিষয়ক উদ্যোগগুলো দেখে মনে হয়েছে, আমাদের সরকারের এ বিষয়ে আন্তরিকতার অভাব নেই।

ভালো নির্দেশনা ও অন্যান্য দেশের সফল মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে, প্রযুক্তি জ্ঞানহীন সুবিধাবাদী লোকদের পাশ কাটিয়ে এগাতে পারলে প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের অর্থনীতি এবং তরুণদের জন্য একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা আছে।

কারণ, ওদের তুলনায় আমাদের ইংরেজি জ্ঞান ভালো। প্রযুক্তি ও মেধার দিকেও আমরা চীনাদের চাইতে খুব পিছিয়ে আছি এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

লেখক সম্পর্কে
আশরাফুল আলম জয় সফটওয়্যার শিল্পে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। হাইপারফরমেন্স ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিগ ডেটাসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় তাঁর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত।

ডেভেলপার কম্যুনিটিতে অবদানের জন্য আশরাফুল আলম মাইক্রোসফট থেকে পরপর ছয় বছর ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর কাজ প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছে আইইই কম্পিউটার সোসাইটি, মাইক্রোসফট চ্যানেল নাইনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে।

অভিজ্ঞ এ সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ বর্তমানে একটি বহুজাতিক ফিনানশিয়াল প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার স্থপতি হিসেবে সিঙ্গাপুরে কর্মরত রয়েছেন।

ভবিষ্যতে দেশের সফটওয়্যার শিল্পের উন্নয়নে তরুণদের নিয়ে তিনি কাজ করতে ইচ্ছুক।

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ- https://www.fb.com/ashraful.alam

*

*