ফাইভজিতে আমাদের ভবিষ্যৎ?

এস এম তাহমিদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর :  ইতিহাসের আরও একটি বিভাজনের যুগের দিকে যখন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তখন বৈশ্বিক সমস্যার বৈশ্বিক সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা অত্যন্ত কঠিন।

অথচ মজার বিষয়, আমরা একে অপরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষার নতুন প্রজন্মে শিগগিরই প্রবেশ করতে যাচ্ছি।

আসন্ন দিনগুলোতে আগের চেয়ে অনেক গভীরভাবে বিশ্বব্যাপী সবার জীবন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়বে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন টেলিযোগাযোগকে পঞ্চম প্রজন্ম বা ফাইভজির যুগে নিয়ে যাবে। ফলে আমাদের সামনে বড়সড় এক সামাজিক পরিবর্তন আসন্ন।

প্রথম প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগের সময় ইটের সমান ফোন আর অনির্ভরযোগ্য অ্যানালগ ভয়েস কল প্রযুক্তি ছিল মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবহারকারীর কাছে। দ্বিতীয় প্রজন্ম নিয়ে এল ডিজিটাল ভয়েস সেবা। এতে কলড্রপ আর প্রযুক্তিগত খরচ কমে যাওয়ায় এই সেবা আরও বেশি মানুষের হাতের নাগালে যেতে থাকলো।

এরপর মোবাইল ইন্টারনেট, মোবাইল কম্পিউটিং আর অ্যাপের যুগ শুরু হয় তৃতীয় প্রজন্মের শুরু থেকে। আর ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক মোবাইল ব্রডব্যান্ড সেবার সূচনা করে। অডিও আর ভিডিও স্ট্রিমিং, হাতের নাগালের মধ্যে রাইড শেয়ারিং সেবা আর সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণ হয় ফোরজির কল্যাণেই।

ফলে আজ আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ ভাবছি। অথচ মাত্র ২০ বছর আগেও আমাদের পকেটে বা ব্যাগে থাকা ডিভাইসটির জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল অচিন্তনীয়।

এখন প্রশ্ন, ফাইভজি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

কল্পনা করুন এমন এক দুনিয়া, যেখানে শুধু সকল মানুষ নয় প্রতিটি জিনিসও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। গাড়ি সংযুক্ত রাস্তার সঙ্গে, ডাক্তাররা রোগীদের মেডিকেল ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত, অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে থেকেই যা ইচ্ছে দেখে শুনে কেনাকাটা করা বা নতুন কিছু দেখে বা শুনে শিক্ষা লাভ করার মত কাজ করা খুবই সাধারণ ব্যাপার।

তাহলে এমন দুনিয়ার জন্য চাই সংযুক্ত থাকার মাধ্যমের বিশাল উন্নয়ন।

আর এ বিশাল যোগাযোগগত চ্যালেঞ্জের প্রযুক্তিগত উত্তর ফাইভজি নেটওয়ার্ক।

হাজার হাজার কোটি নিরাপদ সংযোগ তাৎক্ষণিকভাবে গড়তে পারবে এ প্রযুক্তি। পরিবহন, স্বাস্থ্য, জরুরি সেবা, উৎপাদন ও বিতরণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বড় প্রভাব ফেলবে ফাইভজি প্রযুক্তি। আর ফাইভজি প্রযুক্তি সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে যাতে এ সকল ক্ষেত্রগুলো মাঠপর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্ককে এমন সব উপায়ে ব্যবহার করতে পারে যা আগে কখনোই সম্ভব হয়নি। আর যখন ফাইভজির পরিধি বাড়বে তখন এ সকল সেবায় ফাইভজির অবদানও একই হারে বাড়তে থাকবে।

আগামী ২০১৯ সাল থেকেই ফাইভজি প্রযুক্তির সুফল আর সুবিধা আমরা পেতে শুরু করব। থ্রিজি বা ফোরজির চেয়ে ফাইভজি প্রযুক্তি বিশ্বকে আরও বড়ভাবে নাড়িয়ে দেবে। বিদ্যুৎ বা পেট্রোলচালিত গাড়ির উদ্ভাবনের চেয়ে এটা কম বৈপ্লবিক হবে না। পুরো অর্থনীতির মোড় আর সামাজিক ব্যবস্থা পাল্টে ফেলার মত প্রযুক্তি এটি।

উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে বা কিছু সময় তাদের ছাড়িয়েও গেছে শুধুমাত্র মোবাইল প্রযুক্তির কল্যাণে। আগামীতে ফাইভজি যে আরও বড়ভাবে সকল দেশকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেবে না, তা ভাবার কোনও অবকাশ নেই।

অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ফাইভজির প্রভাবে আসা নতুন পণ্য ও সেবার মূল্য হবে ১২ লাখ কোটি ডলারের। তার পেছনে থাকবে ফাইভজির অগ্রগতি। যার ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক মানুষের সঙ্গে শুধু মানুষ ও তথ্যের সংযোগের বদলে মানুষের সঙ্গে প্রতিটি জিনিসের সংযোগ তৈরি হবে।

বেশিরভাগ সুফল আমরা এখনো চিন্তাও করতে পারছি না। যখন ফোনে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছিল, তখন নেটওয়ার্ক অপারেটররা সেটি চালু করার ব্যাপারে বারবার পিছপা হচ্ছিলেন এই ভেবে যে ফোনে কে ইন্টারনেট ব্যবহার করবে। যখন ফোরজি মোবাইল ব্রডব্যান্ড চালু হয় তখন কেউ উবার, স্পটিফাই বা ফেইসবুকের মত ব্যবসার উদ্ভব হবে তা কল্পনা করতে পারেনি।

গত তিন বছরে ‘স্মার্টপ্রযুক্তি সংযুক্ত ডিভাইস’ বা আইওটির প্যাটেন্ট জমা পড়ার পরিমাণ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, এমনটাই দাবি ইউরোপিয় প্যাটেন্ট অফিসের। এ ধারা বজায় থাকলে ফাইভজি নেটওয়ার্ক সবখানে যাওয়ার আগেই সেটি কাজে লাগানোর প্রযুক্তি বাজারে হাজির থাকবে।

কিন্তু মোবাইল যোগাযোগে প্রজন্মগত পরিবর্তন রাতারাতি হয় না। প্রচুর গবেষণা আর উন্নয়নের প্রয়োজন হয়, যার জন্য দরকার বড় মাপের সম্পদের যোগান। এর আগে ফোরজি নেটওয়ার্ক নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল প্রায় এক যুগ, আর সেখানে চ্য়ালেঞ্জেরও অভাব ছিল না। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বেশীরভাগ গবেষণা হয়েছিল কোয়ালকমে, সেখানকার এক ইঞ্জিনিয়ার গবেষণার সময় মুখোমুখি হওয়া হাজারো সমস্যার মধ্যে  একটি তুলে ধরেন এভাবে :

‘বেইস স্টেশন ত্যাগ করার পর সিগন্যাল প্রায় ১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত শক্তি হারাতে পারে ফোনে রিসিভ হওয়ার আগেই। লসের পরিমাণটা তুলে ধরতে হলে বলা যেতে পারে, টাওয়ার থেকে নির্গত সিগন্যাল যদি হয় পৃথিবীর সমান তাইলে ফোনে রিসিভ হওয়া সিগন্যালের পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আকৃতির’।

এমন বিশাল পরিমাণ শক্তি লস হলে তা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন তাক লাগিয়ে দেয়া ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধান। যাতে এমন শক্তি লস তরঙ্গের মাধ্য়মে পাঠানো কথা, শব্দ বা অন্যান্য তথ্যের ওপর প্রভাব না ফেলে। যাতে যোগাযোগ হয় স্বচ্ছ, ঝামেলাহীন আর তাৎক্ষণিক।

প্রতিদ্বন্দ্বী  উদ্ভাবনী গবেষণা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা, পণ্য প্রস্তুতকারক, নেটওয়ার্ক অপারেটর, বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ থেকে এসে একত্রিত হয়ে আলোচনা করছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন, হাজারো প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করছে যাতে ফাইভজির স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করা যায়।

তারা প্রতিটি প্রযুক্তিগত সমাধান বারবার নিরীক্ষা করছেন যোগ্যতার বিচারে, যাতে ঐক্যমতে আসা যায়। এ প্রক্রিয়া প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, যার হাত ধরে এসেছে প্রচুর নিত্য নতুন শিল্প, শত কোটি নতুন কর্মক্ষেত্র আর বিশ্বে হয়েছে ১ লাখ কোটিরও বেশি ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সমন্বিতভাবেই সমস্যার সমাধান সম্ভব; এমন চিন্তাধারার সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের মিলনের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। আর যদি আমরা জিনিসটাকে মানবিক চিন্তাধারার একটি মডেল হিসেবে চিন্তা করি তাহলেও তা খারাপ হয় না। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এ বছরের লক্ষ্য  ‘ভেঙ্গে যাওয়া বিশ্ব’কে জোড়া লাগানো, সেটি অর্জনে এ মডেল কাজে আসবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে উপস্থাপিত কোয়ালমমের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডন রোজেনবার্গের প্রতিবেদন অবলম্বনে।

*

*

আরও পড়ুন