হুয়াওয়ে পি২০ প্রো, ক্যামেরায় সেরা ফোন

Evaly in News page (Banner-2)

এস এম তাহমিদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : বরাবরই ক্যামেরার জন্য হুয়াওয়ের পি সিরিজ সমাদৃত। নতুন মডেলটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

একটি বা দুটি নয়, তিনটি ব্যাক ক্যামেরা আর চোখ ধাঁধানো রঙের বডি নিয়ে পি২০ প্রো হুয়াওয়েকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। কিন্তু পারফরমেন্স, বিশেষ করে তিনটি ক্যামেরা কী আসলেই কাজের কী না, তা ফোনটি ব্যবহার না করে বলা দুষ্কর।

এক নজরে হুয়াওয়ে পি২০ প্রো

  • ডুয়াল সিম
  • ৬ দশমিক ১ ইঞ্চি অ্যামোলেড ডিসপ্লে, ২২৪০ x ১০৮০ পিক্সেল রেজুলেশন, নচযুক্ত
  • হাইসিলিকন কিরিন ৯৭০ অক্টাকোর প্রসেসর
  • মালি জি৭২ এমপি১২ জিপিউ
  • ৬ গিগাবাইট র‍্যাম
  • ১২৮ গিগাবাইট স্টোরেজ
  • অ্যান্ড্রয়েড ৮ দশমিক ১ ওরিও অপারেটিং সিস্টেম, ইএমইউআই ৮ দশমিক ১ ইন্টারফেইস
  • তিনটি ব্যাক ক্যামেরা : এফ/১.৮ অ্যাপার্চারের ৪০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, এফ/১.৬ অ্যাপার্চারের ২০ মেগাপিক্সেল সাদাকালো ক্যামেরা, এফ/২.৪ অ্যাপার্চারের ৮ মেগাপিক্সেল ৩এক্স জুম ক্যামেরা
  • ফোরকে ভিডিও, ৯৬০ এফপিএস স্লো মোশন
  • ২৪ মেগাপিক্সেল সেলফি ক্যামেরা, অ্যাপার্চার এফ/২.০
  • ৪০০০ এমএএইচ ব্যাটারি, হুয়াওয়ের নিজস্ব ফাস্ট চার্জিং
  • ইউইএসবি টাইপ সি পোর্ট
  • হেডফোন জ্যাক নেই
  • ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর

ডিজাইন

সামনে পেছনে গ্লাস, আর অ্যালুমিনিয়াম বডির তৈরি পি২০ প্রো সবার নজর কাড়তে বাধ্য। ফোনটির রংধনুর মত আভা সমৃদ্ধ বেগুনি রঙ দূর থেকেই বলে দেবে এটা হুয়াওয়ে পি২০ প্রো।

এর সঙ্গে আছে পেছনে থাকা তিনটি ক্যামেরা, আর ক্যামেরার সঙ্গে একই লাইনে থাকা হুয়াওয়ে লোগো, লাইকা লোগো, আর ক্যামেরার স্পেসিফিকেশন। ফোনের পেছনে পুরো দুই লাইন লেখা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে আছে বড় প্রশ্ন।

 

সামনের ডিসপ্লেতে আছে নচ। নচের মধ্যখানে দেয়া আছে সেলফি ক্যামেরা আর ইয়ারপিস। কিন্তু তার মানে বেজেল বাদ পড়েনি, ডিসপ্লে নিচের মোটাসোটা বেজেলে দেয়া হয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। বেজেল থাকার পরও নচ প্রয়োজন ছিল কি না, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন। হয়ত হুয়াওয়ে ধারণা করছে, নচ হবে নতুন ফ্যাশন।

প্রচণ্ডভাবে পলিশ করা গ্লাস দুই পাশে থাকায় ফোনটি ময়লা হতে বাধ্য। সামনে পেছনে সমান তালে ভেসে থাকবে আঙুলের ছাঁপ। তৈরির মানে খুবই ভালো, ডিজাইন আর সবার চেয়ে একদমই আলাদা।

ডিসপ্লে

ফোনটি হাতে নিয়ে প্রথমেই চোখে পড়বে লম্ব ডিসপ্লেটি। আকৃতি ৬ দশমিক ১ ইঞ্চি হলেও, তার অনুপাত ১৯:৯, আর রেজুলেশন ২২৪০ x ১০৮০ পিক্সেল। প্যানেল তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে অ্যামোলেড প্রযুক্তি। ডিসপ্লের ব্রাইটনেস ৫১৮ নিট, যা অন্যান্য ফ্ল্যাগশিপের সমকক্ষ। কন্ট্রাস্টও অন্যান্য ওলেড বা অ্যামোলেড প্যানেলের সঙ্গে তুলনা করার মত।

কিন্তু অন্যান্য ফ্ল্যাগশিপের কোয়াড এইচডি রেজুলেশনের তুলনায় ফুল এইচডি প্লাস রেজুলেশন কিছুটা পেছানো, যদিও ভিআর কনটেন্ট না দেখলে তা চোখে পড়বে না। ডিসপ্লের কালার ব্যালেন্স অত্যন্ত নিখুঁত, ক্যামেরা ফোনের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ।

ডিসপ্লের মূল সমস্যা বলা যেতে পারে নচ। নচ লুকিয়ে রাখার জন্য ব্ল্যাক স্ট্যাটাসবারের সুবিধা রাখা হয়েছে, যদিও তা কতটুকু কাজের তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। যদি কাটা অংশে সমস্যা না থাকে তাইলে পি২০ প্রোর ডিসপ্লে সেরাদের কাতারেই থাকবে।

পারফরমেন্স

হুয়াওয়ের নিজস্ব কিরিন ৯৭০ প্রসেসর খুব শক্তিশালী তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা আজকের ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসর স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ বা এক্সিনস ৯৮১০র সঙ্গে পেরে উঠবে না। তার মানে ফোনটি স্লো বা ল্যাগ করে তা নয়, অ্যাপ চালাতে হাঁপিয়ে যায় তাও নয়।

ফ্ল্যাগশিপের ক্ষেত্রে পারফরমেন্স পার্থক্য আজকাল বেঞ্চমার্কের বাইরে ধরা কঠিন, তাই ছোট করে বলে দেয়া যেতে পারে, পি২০ প্রো গেইমিং বা ভারী অ্যাপ চালানোর সময় পারফরমেন্সে থাকবে চলনসই, অসাধারণ নয়।

প্রসেসরের দিক থেকে এতে আছে কর্টেক্স এ৭৩ পারফরমেন্স কোর আর কর্টেক্স এ৫৩ ব্যাটারি সাশ্রয়ী কোর। দুটি মিলিয়ে কিরিন ৯৭০ গিকবেঞ্চে দিয়েছে ১৯০০ সিঙ্গেলকোর স্কোর আর ৬৬০০ মাল্টিকোর স্কোর। পারফরমেন্স তুলনা করা যেতে পারে স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ এর সঙ্গে।

হাই ডেফিনিশন গেইম, যেমন পিইউবিজি বা রিয়েল রেসিং ৩ এর ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ এফপিএস পাওয়া যাবে। মোবাইল গেইমিং করার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু মাল্টিপ্লেয়ারে প্রোফেশনাল গেইমিং করতে চাইলে ফোনটি যথেষ্ট নয়। মালি জি৭২ এমপি১২ জিপিউটি কোয়ালকম অ্যাড্রিনো ৬৩০ এর সঙ্গে ঠিক পেরে উঠবে না।

মাল্টিটাস্কিং করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ র‍্যাম দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে শক্তিশালী প্রসেসরের সঙ্গে ৬ গিগাবাইট র‌্যাম মিলিতভাবে সহজেই একাধিক অ্যাপ চালানো যাবে।

ব্যাটারি লাইফ

৪ হাজার এমএএইচ ধারণক্ষমতার ব্যাটারির সঙ্গে এআই ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট থাকার ফলে হুয়াওয়ে পি২০ প্রো সহজেই দেড় থেকে ২ দিন ব্যাটারিলাইফ দিতে পারবে। হুয়াওয়ের নিজস্ব ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তি ব্যাটারিকে দেড় ঘণ্টায় ফুল চার্জ দিতে সক্ষম। সমস্যা একটিই, তার জন্য প্রয়োজন হবে হুয়াওয়ের নিজস্ব ক্যাবল আর চার্জার।

সাউন্ড কোয়ালিটি

উন্নতমানের সাউন্ড, কিন্ত ভলিউমে ঘাটতি। অল্প কথায় এটাই হুয়াওয়ে পি২০ প্রোর সাউন্ড কোয়ালিটি। সরাসরি হেডফোন ব্যবহারের উপায় নেই। ব্যবহার করতে হবে ডঙ্গল, তাই চার্জ করা আর গান শোনা একত্রে হবে না। ব্লুটুথ হেডফোন ব্যবহার করাই শ্রেয়, ভলিউম নিয়ে সমস্যা সেখানেই মিটে যাবে।

সফটওয়্যার

হুয়াওয়ের নিজস্ব ইন্টারফেইস, ইমোশন ইউআই দেখতে স্টক অ্যান্ড্রয়েডের চেয়ে একেবারেই আলাদা। বড় বড় আইকন, প্রচুর সাদা রঙের ব্যবহার আর হুয়াওয়ের নিজস্ব অ্যাপ রয়েছে এতে। পারফরমেন্স আর ব্যাটারি লাইফ দুটির জন্যই এআই ব্যবহার করা হয়েছে। ফোন কেনার আগে অবশ্যই ইএমইউআই দেখে পছন্দ হয় কি না যাচাই করতে হবে।

ক্যামেরা

ফোনটির মূল আকর্ষণ তার ক্যামেরা সন্দেহ নেই। পেছনে থাকা তিনটি ক্যামেরার মধ্যে মূলটির রেজুলেশন ৪০ মেগাপিক্সেল, তবে পুরো রেজুলেশনটাই ব্যবহার করা উচিত হবে না। ক্যামেরার পিক্সেলগুলোর এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তা সর্বোচ্চ পরিমাণ আলো গ্রহণ করতে পারে, তাই ১০ মেগাপিক্সেল রেজুলেশনে ব্যবহার করাই উচিত।

মূল ক্যামেরায় তোলা প্রতিটি ছবির মান চমৎকার। ছবিতে ডিটেইলের পরিমাণ, ডাইনামিক রেঞ্জ আর কনট্রাস্ট প্রফেশনাল ক্যামেরার সমকক্ষ। সমস্যা কালার ব্যালেন্সের ক্ষেত্রে। নিজ হাতে কালার বা হোয়াইট ব্যালেন্স ঠিক করে না নিলে তা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড মনে হবে।

অন্য দুটি সেন্সরের একটি ৩ গুণ অপ্টিক্যাল জুম সমৃদ্ধ ৮ মেগাপিক্সেল, যা ৪০ মেগাপিক্সেল সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ৫ গুণ পর্যন্ত জুম করতে পারবে ডিটেইলের পরিমাণ নষ্ট না করেই।

শেষ সেন্সরটি ২০ মেগাপিক্সেল সাদাকালো। তার কাজ হচ্ছে, সাদাকালো ছবি তোলার পাশাপাশি ৪০ মেগাপিক্সেল মূল ক্যামেরার ছবিতে কন্ট্রাস্টের পরিমাণ বাড়ানো।

সবগুলো ক্যামেরা একত্রে কাজ করে খুব কম আলোতেও চমৎকার ছবি তুলতে সক্ষম। নয়েজের পরিমাণও খুবই কম, অন্ধকারে ছবি তুলার কাজও চালানো যাবে।

ভিডিওতে ডিটেইলের অভাব রয়েছে, স্ট্যাবিলাইজেশনও অন্যান্য ফ্ল্যাগশিপের মত নয়। তবে ভবিষ্যতের আপডেটে তা বদলাতে পারে।

ক্যামেরাতে এআই ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তা এখনও খুব উন্নতমানের নয়। তবে ৪০টিরও বেশি রকমের ছবির সিন নিজ থেকেই ক্যামেরার সেটিং এটি ঠিক করে নিতে পারবে।

সেলফি ক্যামেরার মান পেছনের মতই উন্নত। তবে অটোফোকাস নেই। এআই বিউটিফিকেশন আর পোর্ট্রেইট মোড রয়েছে।

পরিশেষ

ক্যামেরার জন্য তৈরি ফোনটি তার সুনাম ধরে রেখেছে। ক্যামেরার যে সকল ফিচারে এখনো ঘাটতি আছে, সেগুলো সহজেই সফটওয়্যার আপডেটে ঠিক করে নেয়া যাবে। ফোনটির পারফরমেন্স আর ইউআই অনেকের পছন্দ না হতে পারে। ক্যামেরাই যাদের মূল লক্ষ্য শুধু তাদেরই ফোনটি কেনা সমীচীন।

এক নজরে ভালো

ক্যামেরা
ব্যাটারি লাইফ
অসাধারণ ডিজাইন
ডিসপ্লে

এক নজরে খারাপ

পারফরমেন্স এ বছরের ফ্ল্যাগশিপের সমান নয়
ভিডিওর মান

মূল্য

৮২ হাজার ৯৯০ টাকা।

*

*

আরও পড়ুন