ভ্যাটমুক্ত ইন্টারনেটের দাবিতে একাট্টা সাত সংগঠন

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : নতুন বাজেটে বলতে গেলে ‘উল্লেখযোগ্য’ কিছু পায়নি তথ্যপ্রযুক্তি খাত। উল্টো নানাদিকে ভ্যাট-ট্যাক্স বসিয়ে এটিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল স্পিরিটের বিপরীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন খাতটির ব্যবসায়ী নেতা ও উদ্যোক্তারা।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া জানায় অ্যামটব, বেসিস, বিসিএস, বিএমপিআইএ, আইএসপিএবি, বাক্য ও ই-ক্যাব।

আর সংবাদ সম্মেলনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই সাত সংগঠনের নেতারা শোনালেন বাজেটে তাদের অপ্রাপ্তি ও চিন্তার কথা।

তবে এরমধ্যে ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার নিয়ে একাট্টা সবাই।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশের গন্তব্য যাওয়া কঠিন হবে। ইন্টারনেটের ওপর ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কর হতে সরকার খুব সামান্যই আয় করে। অথচ কর তুলে দিলে দীর্ঘমেয়াদে যে সুফল আসবে সেটি অপরিসীম।

সবাই এবার আশা করেছিলেন এবার ভ্যাট প্রত্যাহার হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হওয়ায় হতাশার কথা জানাচ্ছেন তারা।

অ্যামটবের মহাসচিব টি আই এম নূরুল কবীর বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেয়া, নতুন ও পুরাতন সিম প্রতিস্থাপনের উপর ১০০ টাকা ট্যাক্স তুলে দেয়া, মোবাইল খাতে বিদ্যমান তালিকাভূক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ কর কমানো, অলাভজনক মোবাইল কোম্পানির মোট আয়ের উপর ধার্য সর্বনিম্ন ০.৭৫ শতাংশ কর্পোরেট কর তুলে দেয়া, দেশীয় কোম্পানিগুলো স্মার্টফোন উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এর উপর বিদ্যমান প্রায় ৩১ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানোর আবেদন ছিল।

কিন্তু এসবের কোনোটিই করা হয়নি বরং মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির ওপর আরও ২ শতাংশ কর বাড়ানো হয়েছে-বলছিলেন নূরুল কবীর।

বিএমপিআইএর সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনে এবং মোবাইল যন্ত্রাংশ আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ছাড়ে সরকারের আহবানে তারা কারখানা করতে উদ্যোগী হয়েছেন। ইতোমধ্যে স্যামসাং, সিম্ফনি, আইটেল, ওয়ালটন ও উই সংযোজন কারখানা স্থাপন করে ফেলেছে। যেখানে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

‘এখন এক বছর ধরে বিনিয়োগ ও কারখানা স্থাপন শেষে যখন উৎপাদনে যাওয়ার সময় ঠিক তখনই এই ভ্যাটের খড়গ। নতুন বাজেট অনুযায়ী রেডিমেট বা তৈরি হ্যান্ডসেট আমদানিতে কর ৩১ দশমিক ১ শতাংশ আর দেশে সংযোজন করলে হবে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ। তাই আরোপিত এই কর প্রত্যাহার না করলে স্থাপিত কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং এখানে কেউ আর কারখানা করবে না।’-বলেন তিনি।

‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৮৪ দশমিক ৭১ এবং ৮৪ দশমিক ৭৩ শিরোনাম সংখ্যা-এইচ এস কোড-এ ব্যবসায়ী পর্যায়ে কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি প্রত্যাহার করার প্রস্তাব হয়েছে। ফলে কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশের মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ফলে কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে।’-জানান বিসিএসের যুগ্ম-মহাসচিব মো. এ ইউ খান জুয়েল।

তিনি বলেন, কম্পিউটারে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ইউপিএস-আইপিএস অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। কিন্তু ইউপিএস-আইপিএস এর শুল্কহার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে কম্পিউটার চালানো না গেলে কম্পিউটারের পরিপূর্ণ ব্যবহারের অন্তরায় হবে। এছাড়াও কম্পিউটার প্রিন্টার এবং ফটোকপিয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য ভোল্টেজ স্টাবিলাইজার অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। ভোল্টেজ স্টাবিলাইজারের শুল্কহার বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ শতাংশ। যা আগে এক শতাংশ ছিল।

বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, অপারেটিং সিস্টেম, ডেটাবেইজ, ডেভেলপমেন্ট টুলস, সাইবার সিকিউরিটি পণ্য আমদাবির ওপর থেকে শুল্ক কমানোর জন্য বেসিস থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ঢালাওভাবে এগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং মূসক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

‘এতে দেশে উৎপাদিত হয় এরকম সফটওয়্যারও বিদেশ থেকে আমদানি উৎসাহিত হবে এবং দেশীয় সফটওয়্যার শিল্প বিকশিত হবে না। পাশাপাশি, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবার (আইটিইএস) ওপর আলোচ্য বাজেটে মূসক বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।’-উল্লেখ করেন আলমাস কবীর।

আইএসপিএবি সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, ইন্টারনেট সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য নেটওয়ার্ক ইকুইপমেন্টের প্রয়োজন হয়। নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা ও সুলভ মূল্য আইসিটি উন্নয়নে প্রধান হাতিয়ার। ইন্টারনেট যন্ত্রপাতি যেমন, মডেম, ইথারনেট ইন্টারফেস কার্ড, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সুইচ, হাব, রাউটার, সার্ভার ব্যাটারির উপর বর্তমানে ২২.১৬ শতাংশ ভ্যাট ও শুল্ক আরোপিত রয়েছে।

বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের কোনো দাবিই পূরণ করা হয় না উল্লেখ করে তিনি এই ভ্যাট ও শুল্ক পুরোপুরি অব্যাহতি দেবার দাবি জানান।

ই-ক্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আক্তার নিশা বলেন, বাজেট প্রস্তাবে অনলাইন কেনাকাটায় ৫ শতাংশ ভ্যাট বসানোর কথা বলা হয়। এতে ই-কমার্স, এফ-কমার্স মানে ইন্টারনেট মাধ্যমে সকল কেনাকাটায় ভ্যাট যুক্ত হবে। যদিও এটি ছাপার ভুল বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া।

তবে আমরা গত তিন বছর থেকে ই-কমার্সকে আইটিইএসে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছি। এটি  হয়নি।-বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাক্যর যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ আমিনুল হক বলেন, ইন্টারনেট ও ইন্টারনেটের যন্ত্রপাতির বেশি দামের কারণে তাদের আউটসোর্সিং খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেবার খরচ বেড়ে গেলে তখন বাংলাদেশ হতে আউটসোর্সিংয়ের আগ্রহ কমবে।

আল-আমীন দেওয়ান

 

*

*

আরও পড়ুন