প্রযুক্তির পথে নারীর বড় চ্যালেঞ্জ সমাজ

luna shamsuddhoha-TechShohor
Evaly in News page (Banner-2)

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারী উদ্যোক্তা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন লুনা শামসুদ্দোহা। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর বর্তমান-ভবিষ্যত ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন টেকশহরডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমরান হোসেন মিলন।

লুনা শামসুদ্দোহা বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির (বিডাব্লিউআইটি)-এর সভাপতি। দেশের  খ্যাতনামা সফটওয়্যার কোম্পানি দোহাটেক নিউ মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান । সম্প্রতি তিনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন।

সুপরিচিত এই তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখায় আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। প্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির কারণে গ্লোবাল উইমেন ইনভেন্টরস অ্যান্ড ইনোভেটরস নেটওয়ার্ক (গুইন) সম্মাননা রয়েছে তাঁর।

লুনা বাংলাদেশ বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা, সুইজারল্যান্ডের গ্লোবাল থট লিডার অন ইনক্লুসিভ গ্রোথের সদস্য। ২০০৫ সালে তিনি সুইস ইন্টারঅ্যাকটিভ মিডিয়া সফটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (সিসমা) পান।

টেকশহর : নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে সংশ্লিষ্ট করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি)। দেশে এমন একটি উদ্যোগ কতো জরুরি?

লুনা শামসুদ্দোহা : বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি) আমাদের উদ্যোগ নেওয়া সাত বছর হতে চললো। আজকের যুগ হলো প্রযুক্তির। প্রযুক্তি ছাড়া তো কোনো কাজ, কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরের কলিং বেল থেকে লাইট বন্ধ জ্বালানো সবই প্রযুক্তি। সব কিছুতেই প্রযুক্তি। এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলোকে প্রযুক্তি থেকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই। বেঁচে থাকাটাই প্রযুক্তি।

bwit agm-techshohor

প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদের এটা দরকার। আমরা যদি নারীর ক্ষমতায়ন চাই, সে ক্ষেত্রে প্রযুক্তিতে যেতে গেলে শুধু ইকোনোমিক ইমপাওয়ারমেন্ট না, সবকিছুতেই প্রযুক্তি রয়েছে। সেই জায়গায় এই সময়ে এসে নারীকে পিছিয়ে রাখা হয় তাহলে তো কিছুই হবে না। পিছিয়ে রাখাটায় একটা সামাজিক ব্যাপার আছে, নারীরা প্রযুক্তি থেকে একটু দূরে থাকে।

এরপরও আমাদের যে সমস্যাটা আছে যে, সেলফোনটা নারীর হাতে নাই। বিশেষ করে গ্রাম-মফস্বলে দেখা যায়, সেখানে বাড়ির কর্তার হাতে ফোন থাকে, নারীর হাতে নয়। সেটার জন্যই নারীরা দূরে থাকে। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ডিভাইডটা কমাতে উনি হার্ডওয়্যার বা ডিভাইসের থেকে দাম কমিয়ে দিলেন। ফলে এটা সহজলভ্য হয়ে গেছে। এখন ইন্টারনেটের উপর থেকে দাম কমাচ্ছেন। কারণ মোবাইল ফোন কোনো ফ্যাশন নয়। এটা যতো আমাদের হাতে আসবে, তত ক্ষমতা বাড়বে। আমি মনে করি ডিজিটাল ডিভাইড যতো কমবে, প্রযুক্তিতে নারীদের তত বেশি ইনগেজ করা যাবে।

টেকশহর : নারীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জগুলো কী ?

লুনা শামসুদ্দোহা : এ এক মহাচ্যালেঞ্জ। আর এমন চ্যালেঞ্জ হাজারোটা রয়েছে। প্রথম কথা হলো, যদি অনেক উপর থেকে বলি তবে বলতে হয়, মেয়েরা কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং খুব কম পড়ে। এটাকে অনেকেই ছেলেদের লেখাপড়াও ভাবে। সেখানে একটা বাধা রয়েছে।

তারপরে মেয়েরা যাও পড়ে, তাতে ছেলেদের তুলনায় ক্যারিয়ারে যায় না। এটাও হয়। খুব কম মেয়ে দেখা যায়, যারা বুয়েট বলেন, এটা বলেন সেটা বলেন, সেখান থেকে পড়ালেখা করে, কিন্তু কাজ করতে আসে না। এ ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা দেখা যায়। এটাও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। অনেকেই মেয়েদের রাতের বেলায় আসা যাওয়া, কাজ করারে স্বাভাবিকভাবে নেয় না। এটা এখনো আমাদের দেশে হচ্ছে।

এগুলো বিশেষ করে, এখনো সামাজিক বাধাটাই সবচেয়ে বড় বাধা। এগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। মেয়েদের বুদ্ধি নেই, জ্ঞান নেই এমন ভাবাটা বোকামি। বরং এসব সামাজিক বাধা ফলেই তাদের কাজে নিয়ে আসা চ্যালেঞ্জের।

প্রোগ্রামিং নিয়েও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সে ক্ষেত্রে নারীদের প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা কেমন।
লুনা সামসুদ্দোহা : এখানেও একই সমস্যা। প্রোগ্রামিংয়েও নারীদের খুব কম পেয়েছি। এখনো কম আসে। তবে এখন অনেকেই প্রোগ্রামিং নিয়ে নানা ধরনের কাজ করছেন। ফলে একটা চেঞ্জ এসেছে। তারপরও অনেক নারী প্রোগ্রামিং শিখলেও পরে তারা ক্যারিয়ারে আসতে চায় না। যারা আসে অবশ্যই তাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়, সেসব পেরিয়ে আসতে হয়।

এটা যে শুধু আমাদের দেশে তা নয়। আমরাতো বিডব্লিউআইটি থেকে কাজ করেছি। আমরা দেখেছি সমস্যাটা শুধু আমাদের দেশের নয়, সারা বিশ্বের।

টেকশহর : এই খাতে নারীদের সংশ্লিষ্ট করতে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

লুনা শামসুদ্দোহা : দেখেন এ ক্ষেত্রে সরকারের অবশ্যই কাজ করার আছে। দেশেও সরকার কিন্তু বসে নেই। এই প্রযুক্তির অবকাঠামো কিন্তু সরকার বানিয়েছে। আমাদের দেশে যে প্রযুক্তি ইকো-সিস্টেম সেটাও সরকারের তৈরি করা। কারণ শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। ট্যাক্স কমাচ্ছে, এ সবই করছে সরকার। যেটা আমাদের ক্ষমতা নেই। এটাকে ব্যবহার করে আমা যদি মেয়েদের আনতে পারি তবেই সফলতা।

তবে আমরা শুধু এমন করে বলে গেলে হবে না। আমরা শুধু দেখি নাই, নাই, নাই। কিন্তু যেটুকু আছে সেটার ব্যবহার করতে আমরা পারি না। অনেক দেশের তুলনায় আমাদের ঢের বেশি আছে। আমাদের এখন ৭ দশমিক ২ শতাংশ গ্রোথ। এখানে মেয়েরা যদি না থাকে তবে কিভাবে হয় এটা? মেয়েরা না থাকলে এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে। এখানে যে আমার একটা অবদান নেই সেটা তো অস্বীকার করতে কেউ পারবে না।

টেকশহর : তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশ এবং দেশের বাইরে চাকরির বাজার কেমন?

লুনা শামসুদ্দোহা : তথ্যপ্রযুক্তির কথা বলতে গেলে, ঢাকায় যে প্রযুক্তি বাইরেও সেই একই প্রযুক্তি। ফলে সব জায়গায় একটা বড় বাজার রয়েছে। আমরা বিশেষ করে দোহাটেক নিউ মিডিয়া দেশের বাইরেও অনেক কাজ করছে। ফলে আমরা দেখতে পাই, দেশে যেমন প্রযুক্তি খাতে চাকরি রয়েছে তেমনি বিদেশেও।

এজন্য অবশ্যই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ আমি দেখি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক ছেলে-মেয়ে আছেন যারা খুব স্মার্ট। তারা শিখতে চায়, ফলে তারা এগিয়ে যায়। তারা কাজও করে খুব সতর্কতার সঙ্গে এবং খুব ভালো কাজ করে। ফলে তাদের চাকরির বাজার আছে বলেই তারা এতদূরে আসতে পারছে।

টেকশহর : দোহা টেকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আপনি। এই প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের অবস্থানে আনতে কোন ধরনের বাধা এসেছে কী?

লুনা শামসুদ্দোহা : দোহাটেককে আজকের অবস্থানে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ অনেকবার ফেল করেছি। আবার দাঁড়িয়েছি। অনেক কাজ পাইনি, কিন্তু কাজ করলে মানে যে প্রোজেক্টটা পেয়েছি, নিয়েছি সেটাতে ফেল করিনি। সেটা পেতে ব্যর্থ হয়েছি হয়তো। এটাতো স্বাভাবিক, কেউ নিজের খাবার প্লেটে করে সাজিয়ে দেয় না।

নিজে নিজে সেটা করে নিতে হয়। নিজে জেনে, বুঝে, এগিয়ে, সবার সঙ্গে কম্পিট করে কাজ করছি। এটা একটা তৃপ্তির যে, আমাকে কেউ না দিলেও আমি একটা জায়গায় প্রতিযোগিতা করে কাজ নিতে পারছি, সেটা সফলভাবে করতে পারছি।

এই চিত্র শুধু যে দেশে তা নয়, আমরা বাইরের দেশেও অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে পিছনে ফেলে কাজ পেয়েছি, সেগুলো সফলভাবে করেছি। এটা আসলে কাজের যোগ্যতা। কোম্পানির যোগ্যতায় এটা করা।
আমরা কাজ করছি, আমরা যেনো আরো কাজ করতে পারি দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারি।

টেকশহর : ধন্যবাদ আপনাকে।

লুনা শামসুদ্দোহা : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

*

*

আরও পড়ুন