গ্যালাক্সি এস৯ প্লাস : দুর্দান্ত ফিচারে বিলাসী ফ্ল্যাগশিপ, ডিজাইন আগের মতোই

Evaly in News page (Banner-2)

এস এম তাহমিদ, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : প্রতি বছরের মতো এবারও মার্চেই চলে এসেছে স্যামসাংয়ের নতুন ফ্ল্যাগশিপ গ্যালাক্সি এস৯ প্লাস।

এবার তারা নতুন ফিচার বা ডিজাইনের বদলে ফোনটিকে আরও নির্ভরযোগ্য ও কাজের উপযোগী করার পেছনে সময় দিয়েছে।

জনপ্রিয় ব্র্যান্ডটির এমন পদক্ষেপের ফলে নতুন ফিচারের তালিকা ছোট হলেও যে কয়টি যুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর প্রভাব অনেক।

চলুন জেনে নেওয়া যাক নতুন বিলাসবহুল এ ফোনের আদ্যপ্রান্ত।

এক নজরে গ্যালাক্সি এস৯ প্লাস

  • ডুয়াল সিম, দ্রুতগতির ফোরজি সমর্থন
  • সুপার অ্যামোলেড ডিসপ্লে, ১৪৪০ x ২৯৬০ পিক্সেল রেজুলেশন, এইচডিআর সমর্থন
  • স্যামসাং এক্সিনস ৯৮১০ অক্টাকোর প্রসেসর, ২.৮ গিগাহার্জ গতির ৪টি মঙ্গুস কোর ও ৪টি ১.৭ গিগাহার্জ গতির কর্টেক্স এ৫৫ কোর
  • মালি জি৭২-এমপি১৮ জিপিউ
  • ৬ গিগাবাইট এলপিডিডিআর৪এক্স র‌্যাম
  • ৬৪ গিগাবাইট স্টোরেজ, ৪০০ গিগাবাইট পর্যন্ত মাইক্রোএসডি কার্ড ব্যবহারের সুবিধা
  • ডুয়াল ১২ মেগাপিক্সেল ব্যাক ক্যামেরা। মূল ক্যামেরার অ্যাপার্চার দুটি, এফ/১.৫ ও এফ/২.৪। টেলিফটো ক্যামেরার জুম ২x, অ্যাপার্চার এফ/২.৪
  • ৮ মেগাপিক্সেল অটোফোকাস সেলফি ক্যামেরা, অ্যাপার্চার এফ/১.৭
  • ফোরকে ও ৯৬০ ফ্রেম-প্রতি-সেকেন্ড সুপার-স্লো মোশন ভিডিও
  • ইউএসবি টাইপ-সি পোর্ট, হেডফোন জ্যাক
  • ডুয়াল ব্যান্ড ওয়াইফাই, ব্লুটুথ ৫, এফএম রেডিও
  • এনএফসি, জিপিএস, হার্টরেট ও রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাপার সেন্সর
  • ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর ও আইরিশ স্ক্যানার
  • তারহীন চার্জিং, স্যামসাং অ্যাডাপ্টিভ চার্জিং
  • ৩৫০০ এমএএইচ ব্যাটারি
  • ৩২বিট, ৩৮৪ কিলোহার্জ হাই-ফাই অডিও সমর্থন
  • আইপি৬৮ পানি ও ধূলাে নিরোধী বডি

ডিজাইন

যারা গ্যালাক্সি এস৮ প্লাস দেখেছেন, তাদের কাছে ফোনটি নতুন মনে হবে না। সামনের ডিসপ্লে রয়েছে অপরিবর্তিত, দু’পাশের বাটনগুলোও আছে আগের মতই।

ফোনের নিচে থাকা পোর্টের সংখ্যাও কমেনি, ইউএসবি-সি পোর্টের পাশে এখনও আছে হেডফোন জ্যাক।

যদিও পরিবর্তন একদম নেই বলাটা ঠিক হবে না। পেছনের গ্লাস প্যানেলে যুক্ত হয়েছে একটির জায়গায় দুটি ক্যামেরা। ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সরও ক্যামেরার ডান থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে ক্যামেরার নিচে।

এ অল্প পার্থক্যই ফোনটির ব্যবহারিক সুবিধা বাড়িয়েছে। এখন আর ফোন আনলক করতে ক্যামেরায় হাত পড়বে না।

ফোনটির সামনে ও পেছনে ব্যবহার করা হয়েছে গরিলা গ্লাস। মাঝে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম। আকৃতিতে ডিভাইসটি অনেক হলেও দুপাশেই বাঁকানো কাঁচের প্যানেল থাকায় হাতের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়। ডিজাইনে এটি পূর্ণাঙ্গ ফ্ল্যাগশিপ কাতারের।

ক্যামেরা

প্রথমেই বলা যায়, দুটি ক্যামেরা থাকায় ক্যামেরার ক্ষমতা বেড়েছে অনেক বেশি। এছাড়া এটি বিশ্বের প্রথম দ্বৈত অ্যাপার্চার ক্যামেরা সমৃদ্ধ ফোন।

স্মার্টফোনের ক্যামেরাগুলো আকারে ছোট হওয়ায় লেন্সের মাধ্যমে যত বেশি আলো ভেতরের সেন্সরে প্রবেশ করতে পারবে- তত ভালো ছবি পাওয়া যায়। বিশেষত স্বল্প আলোতে লেন্সের মধ্যে দিয়ে যত আলো ঢুকবে ততই ভালো। অন্তত এতদিন পর্যন্ত তাই সত্যি ছিল।

স্যামসাং এবার ক্যামেরার অ্যাপার্চার বড় করে এফ/১.৫-এ পৌছেছে। ফলে স্বল্প আলোতে খুবই ভালো ছবি আসলেও দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমত, এ রকম বড় অ্যাপার্চারের লেন্সগুলো একসঙ্গে বিভিন্ন দূরত্বে থাকা বিষয়গুলোতে ফোকাস করতে পারে না। বিশেষ করে অনেক দূরের বিষয়গুলোকে ফোকাসে রাখা কঠিন।

দ্বিতীয়ত, দিনে বা কড়া আলোতে ছবি বেশি এক্সপোজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যাকে অনেকে ‘জ্বলে গেছে’ বলেন।

এ জন্যই প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যামেরাটি এফ/১.৫ মূল অ্যাপার্চারের পাশাপাশি এফ/২.৪ অ্যাপারচারও ব্যবহার করতে পারবে। তবে এ দুটির মাঝামাঝি অ্যাপার্চার ব্যবহারের সুবিধা নেই।

মূল ক্যামেরার রেজুলেশন ১২ মেগাপিক্সেল। অন্যটিরও ১২ মেগাপিক্সেল। সেটির অ্যাপার্চার এফ/২.৪ এবং রয়েছে ২এক্স অপটিক্যাল জুম লেন্স। দুটি ক্যামেরাতেই অপটিক্যাল স্ট্যাবিলাইজেশন রয়েছে।

সেলফির জন্য গ্যালাক্সি এস৯ প্লাসে আছে ৮ মেগাপিক্সেল অটোফোকাস ক্যামেরা। এটির অ্যাপার্চার এফ/১.৭।

এ ফোনে ক্যামেরা মোডের শেষ নেই। সাধারণ অটো মোডের পাশাপাশি আছে তুমুল জনপ্রিয় ‘লাইভ ফোকাস’ মোড, যাতে তোলা ছবির বিষয়ের পেছনের অংশ ইচ্ছেমত বোকেহ করে দেয়া যাবে। বোকেহের আকৃতিও ইচ্ছেমত পরিবর্তন করা যাবে। অনেক বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেলফি তোলার জন্য সামনের ক্যামেরাতেও আছে প্যানোরােমা মোড।

ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে আগের ফিচারগুলোর পাশাপাশি এবার যুক্ত করা হয়েছে ৯৬০ ফ্রেম-পার-সেকেন্ড সুপার স্লো মোশন। তার রেজুলেশন অবশ্য ৭২০পি। আর ভালো পরিমান আলো না থাকলে ভালো মানের ভিডিও পাওয়া যাবে না।

এ ছাড়াও ফুল এইচডিতে ২৪০ এফপিএস স্লো-মোশন ভিডিও করা যাবে। সর্বোচ্চ ফোর-কে রেজুলেশনে দুপাশের ক্যামেরাতেই ভিডিও ধারণ করা যাবে।

ক্যামেরার মানের দিক থেকে এস৯ প্লাস এ সময়ের অন্য সব ফোনের ওপরে অবস্থান করছে। আলোর পরিমান যাই হোক না কেন,  ক্যামেরার ছবি বা ভিডিওতে নয়েজ দেখা যায়নি। ছবির কালারের রেঞ্জ, কন্ট্রাস্টেরও অভাব নেই। অতিরিক্ত স্যাচুরেশনের অপবাদ কমাতে স্যামসাং স্যাচুরেশন কমিয়েছে অনেকটুকু।

তবে একেবারেই সমস্যা নেই তা নয়। এফ/১.৫ অ্যাপার্চারে ছবি তোলার সময় খুব কাছের সাবজেক্টের পুরোটা ফোকাসে রাখা একটু কষ্টের। লাইভ ফোকাস মোডের অনেক সময় সাবজেক্ট ও ব্যাকগ্রাউন্ডের মধ্যে তফাত করার অ্যালগোরিদম ঠিকমত কাজ করে না।

এগুলো হার্ডওয়্যারের সমস্যা নয় বরং সফটওয়্যারের ফলে ভবিষ্যতের আপডেটে ঠিক হয়ে যেতে পারে।

পারফরমেন্স

স্যামসাং বাংলাদেশে বিক্রি করছে এক্সিনস ৯৮১০ প্রসেসর সংস্করণ। এর পারফরমেন্স স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫-এর চেয়েও প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে বেশি। অবশ্য গ্রাফিক্সে অল্পবিস্তর পিছিয়ে। তবে ফ্ল্যাগশিপ ফোনের পারফরমেন্সে ঘাটতি বিগত দুই বছরেও দেখা যায়নি। আর এতেও দেখা যাবে না।

গ্রাফিক্সের জন্য আছে মালি-জি৭২এমপি১৮। গুগল প্লে স্টোরের সব গেইমতো বটেই, সামনে যা আসবে সেগুলোও ফুল গ্রাফিক্সে চালাতে পারবে এটি। যদিও পারফরমেন্সে অ্যাড্রিনো ৬৪০-এর চাইতে অল্প একটু পিছিয়ে।

র‌্যামের দিক থেকে এতে আছে এলপিডিডিআর৪এক্স প্রযুক্তির ৬ গিগাবাইট র‌্যাম। মাল্টিটাস্কিং বা ভারি অ্যাপ, দুটি ক্ষেত্রেই র‍্যাম খুবই দ্রুত গতির ও পরিমানে যথেষ্ট।

স্যামসাং এক্সিনস ৯৮১০-এর সম্পূর্ণ ক্ষমতা সহজেই ব্যবহার করতে নারাজ। সর্বোচ্চ ব্যাটারিলাইফের জন্য ও তাপ উৎপাদন কমাতে তারা ফোনের প্রসেসরকে যতদূর সম্ভভ ধীরে চালানোর জন্য প্রোগ্রাম করেছে।

ভবিষ্যতে অবশ্য পারফরমেন্স মোড যুক্ত করলে পারফরমেন্স আরও বাড়বে।

ডিসপ্লে

হাই ডাইনামিক রেঞ্জের কালার ও কন্ট্রাস্ট সমর্থিত ডিসপ্লেটি তৈরি করা হয়েছে সুপার অ্যামোলেড প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

ডিসপ্লেটির আকৃতি ৬ দশমিক ২ ইঞ্চি, রেজুলেশন ২৯৬০ x ১৪৪০ পিক্সেল, যার পিক্সেল ঘনত্ব ৫২৯ পিপিআই। মুভি দেখা বা ভিআর, দুটি কাজের জন্যই এটি প্রস্তুত। লম্বাটে হওয়ায় দুটি অ্যাপ একসঙ্গে ব্যবহারেও অ্যাপগুলো চাপা মনে হবে না।

দৈনন্দিন ব্যবহারে গ্যালাক্সি এস৯ প্লাসের ডিসপ্লেকে টেক্কা দয়া কঠিন। ছবির স্বচ্ছতা, কালারের মান, কনট্রাস্ট ও ব্রাইটনেস প্রায় সকল ফোনের উর্ধ্বে।

সাউন্ড

ইয়ারপিসকেও লাউড স্পিকার হিসেবে ব্যবহার করে এবার এস৯ প্লাসে যুক্ত করা হয়েছে স্টেরিও লাউডস্পিকার। স্পিকারগুলো ডলবি অ্যাটমস সমর্থন করে, মুভি দেখার সময় থ্রিডি সাউন্ড পাওয়া যাবে।

তবে ছোট স্পিকারে বেইস বা মিডরেঞ্জ আশা করা অনুচিত। সেজন্য ব্যবহার করা যেতে পারে সঙ্গে থাকা একেজির তৈরি হেডফোন।

হেডফোনে অসাধারণ সাউন্ড দেয়ার জন্য ফোনটিতে আছে হাইফাই ড্যাক ও অ্যাম্প। ফলে সাউন্ডে সর্বাধিক এগিয়ে আছে গ্যালাক্সি এস৯ প্লাস।

এআর ইমোজি, বিক্সবি

নিজস্ব অভিব্যাক্তি ও চেহারা স্ক্যান করে ইমোজিতে পরিণত করে পাঠানো যাবে সবাইকে। ফিচারটি দ্রুত কাজ করে। ক্যারিক্যাচার তৈরি করতে সময় লাগে এক মিনিটেরও কম। চেহারার সকল অভিব্যাক্তি পড়তে না পারলেও মূল ভাব সহজেই বুঝে নেয় এস৯ প্লাস।

বিক্সবি অ্যাসিস্ট্যান্ট আজ আরও বুদ্ধিমান। বেশ কিছু ভাষা বাংলায় রূপান্তর করতে পারে। ভবিষ্যতে আরও বুদ্ধিমান হয়ে ইঠবে।

ব্যাটারি লাইফ ও চার্জিং

ফোনটিতে আছে ৩,৫০০ এমএএইচ ব্যাটারি। অন্তত এক দিন টানা ব্যবহার করা যাবে। ফোনের ওপর কম চাপ পরলে ব্যাকাপ দুই দিনে পৌছাবে।

স্যামসাংয়ের এর নিজস্ব দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তির কল্যাণে ফোনটি ৮০ মিনিটেই ফুল চার্জ হয়ে যাবে।

স্থায়িত্ব

পানি, ধূলা ও অতিরিক্ত চাপ ও তাপ নিরোধী করে ফোনটি তৈরি করা হয়েছে। এর মানে এই নয় কেউ তীব্র স্রোত ও নোনা পানিতে ফোনটি ব্যবহার করবেন। সমুদ্রে ফোনটি নিয়ে ডুব দিলে নষ্ট হবে এমন নয়, তবে আশঙ্কা থাকবে।

পরিশেষ

স্যামসাং প্রতি বছর অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মধ্যে সবচাইতে ফিচারবহুল ডিভাইস হিসেবে বাজারে আনে এস সিরিজ। এবারও ব্যাতিক্রম হয়নি। ফোনটি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডগুলোর চেয়ে এগিয়ে অথবা সমকক্ষ। এর প্রভাব অবশ্য দেখা গেছে দামে।

মূল্য : প্রি-অর্ডারের মূল্য ধরা হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৯০০ টাকা

এক নজরে ভালো

  • ক্যামেরা
  • ডিসপ্লে
  • সাউন্ড
  • পারফরমেন্স
  • স্থায়িত্ব

এক নজরে খারাপ

  • মূল্য চড়া
  • দেখতে পুরোনো ডিজাইনের
  • বিক্সবি বাটন এখনও আছে

*

*

আরও পড়ুন