Maintance

ফেইসবুকে কবিতা, চাকরি গেল জিপি প্রকৌশলীর

প্রকাশঃ ১০:২০ অপরাহ্ন, জুলাই ২৬, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ২:৫৬ অপরাহ্ন, জুলাই ২৮, ২০১৭

আল-আমীন দেওয়ান, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আট লাইনের দুর্নীতিবিরোধী একটি কবিতা ও বাংলা নববর্ষ নিয়ে পোস্ট দেওয়ায় এক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে চাকরিচ্যুত করেছে গ্রামীণফোন।

টেকনোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ জামানকে গত ১৮ জুলাই চূড়ান্ত বরখাস্তের চিঠি দেয় মোবাইল ফোন অপারেটরটি। চিফ হিউম্যান রিসোর্স অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াসির মাহমুদ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে তার বিরুদ্ধে ফেইসবুকে কোম্পানির নির্বাহী পরিচালকদের ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারদের নামে মিথ্যা অপপ্রচার ও ছবি কাটাছেঁড়ার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গ্রাহক বিচারে শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের (জিপি) অনেক কর্মী ফেইসবুক ব্যবহার নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন। এ ঘটনায় অনেকে অসন্তোষও প্রকাশ করেন। একান্ত জনরা আলাপ করলেও প্রকাশ্যে সবাই নীরব থাকছেন।

এ চাকরিচ্যুতি অন্যায় ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামীণফোন অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়ন বা জিপিইইউর (প্রস্তাবিত) সভাপতি ফজলুল হক।

GrameenPhone Corporate Office_ Tech Shohor

টেকনোলজি বিভাগের ওই উর্ধ্বতন সিস্টেম প্রকৌশলীর দাবি, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় কোম্পানিটির জামায়াত ঘনিষ্ঠরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। তিনি ১৪ এপ্রিল নববর্ষকে কেন্দ্র করে একটি ও ২৪ এপ্রিল একটি ইংরেজি কবিতা ফেইসবুকে পোস্ট করেছিলেন।

চাকুরিচ্যুতির চিঠিতে ২৪ এপ্রিলের পোস্টকে মানহানিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোন টেকশহর ডটকমকে জানায়, ‍‌‌’আমরা কর্মীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য এ ধরণের বিষয়ে মন্তব্য করি না। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গ্রামীণফোনের গভীর শ্রদ্ধা আছে এবং এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।’

যদিও এর আগে ফেইসবুক ইস্যুতে একই কর্মকর্তাকে দেওয়া একটি নোটিশের বিষযে বক্তব্য জানতে চাইলে গ্রামীণফোন তাদের অবস্থান জানিয়েছিল।

দু’বছর আগে যুদ্ধপরাধী ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদের পুত্র আলি আহমেদ তাহকিকের বিষয়ে ফেইসবুকে মন্তব্য করায় একই কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছিল। তখন এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ টেকশহর ডটকমকে জানিয়েছিল, ‘কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে এ মন্তব্য করা হয়েছে, যা কোম্পানির আচরনবিধির (কোড অব কন্ডাক্ট) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ কারণে একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’

গত ১৮ জুলাই চাকরিচ্যুতির চিঠিতেও, দু’বছর আগে মানবতাবিরোধী মুজাহিদের পুত্রের কর্মকাণ্ডের বিষযে মন্তব্য করার জন্য দেওয়া শোকজ নোটিশের রেফারেন্স রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানেন গ্রামীণফোনের এমন একাধিক উধ্বর্তন কর্মকর্তাও বলছেন, ফেইসবুক স্ট্যাটাসকে টেনে নিয়ে চাকরিচ্যুত করার মতো পদক্ষেপ নেয়া যায় না। এ ছাড়া চাকরিচ্যুত করার নোটিশে স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে ২০১৫ সালে করা ফেইসবুক কমেন্টসের বিষয়টিও রেফারেন্স হিসেবে আনা উদ্দেশ্যমূলক কিনা-তা ভাবনার বলে মন্তব্য করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব কর্মকর্তারা।

কামরুজ জামানের দাবি তাকে ‘অন্যায় ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে’ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তার অভিযোগ, চূড়ান্ত শুনানিতে তার দু’জন প্রতিনিধির মতামতকেও উপেক্ষা করেছে জিপি কর্তৃপক্ষ।

সুবিচার চাইতে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আবেদন করবে জানিয়ে জ্যেষ্ঠ এ প্রকৌশলী উল্লেখ করেন, ফেইসবুকে শুধু নৌকায় ভোট চাওয়ায় ২০০৯ সালে তার ইনক্রিমেন্টের পরিমান কমিয়ে দিয়ে প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ জিপিতে ১৬ বছরের কর্মজীবনে তার পারফরমেন্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ কেউ পায়নি বলে তার দাবি। তার মতে, এটা প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত।

ফেইসবুকে কামরুজ জামানের কবিতা ও নববর্ষ নিয়ে পোস্ট

কামরুজ জামান জানান, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া আলবদর বাহিনীর নেতা মুজাহিদের পুত্র তাহকিককে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সংবাদের ফেইসবুকে শেয়ার করা লিংকের পোস্টে ২০১৫ সালের ১৯ মে একটি মন্তব্য করেছিলেন। তাহকিক তখন গ্রামীণফোনের স্টেইকহোল্ডার রিলেশন্স ডিপার্টমেন্টের রিলেশনশিপ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

‘এজন্য ওই বছরের ৭ জুন শোকজ করেও কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারায় দীর্ঘ দু’বছরে এ ফেইসবুক সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই নানাভাবে আমাকে নাজেহাল করেছে কর্তৃপক্ষের একটি অংশ’- বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অফিসিয়াল কার্যক্রম ও দায়িত্বের জায়গা হতে কোথাও অভিযুক্ত করতে না পেরে শেষে ন্যায়ের দাবি ও দুর্নীতিবিরোধী বিষয়ক কবিতা এবং বাংলা নববর্ষ নিয়ে স্ট্যাটাসের কারণে এ চাকরিচ্যুতি করা হয়েছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

জিপিইইউর (প্রস্তাবিত) সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে চাকরিচ্যুতি হতে পারে না। ইউনিয়ন তার সদস্যদের বিরুদ্ধে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে।

facebook-gp-techshohor

চাকরিচ্যুতির চিঠিতে বলা হয়, ‘আগেও আপনার বিরুদ্ধে আরও দু’বার গ্রামীণফোন ও এর কর্মীদের, বিশেষত সহকর্মীর বিরুদ্ধে ফেইসবুকে অপপ্রচারের একই অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বর্ণিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে বিগত ৭ জুন ২০১৫ ও ৭ আগস্ট ২০১৬ পৃথক দুটি কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়েছিল।’

চাকরিচ্যুতির ব্যাখায় চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ফেইসবুক ও বিশ্বব্যাপি টেলিনরের ১৩ দেশের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুক@ওয়ার্কে কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে গুরুতর অসদাচরণ করেছেন। এ ছাড়া নিয়মিতভাবে আপনার পোস্টে ছবি কাটাছেঁড়া করে এর সঙ্গে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাহী পরিচালকদের ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মানহানির চেষ্টা করছেন।’

অভিযোগের বিষযে প্রাথমিক তদন্ত, কারণ দর্শনো নোটিশ, কাজের স্থগিতাদেশ এবং তদন্ত কমিটি এ কর্মকর্তার অভিযোগের প্রমান পেয়েছ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চূড়ান্ত চাকুরিচ্যুতির বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সকল অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গুরুতর মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও অসদাচরণে আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আপনার আগের রেকর্ড বিবেচনা করে শাস্তি কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করা হলেও তেমন কোনো পরিস্থিতি পাওয়া যায়নি। দোষের মাত্রা অতি গুরত্বপূর্ণ হওয়ায় অসদাচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হল।’

আরও পড়ুন:

*

*

Related posts/