Maintance

ইন্টারনেটের বৃষ্টি বিলাস, বছর বছর গ্রাহকের ফাঁস

প্রকাশঃ ২:০৫ অপরাহ্ন, জুন ১৯, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১২:২৩ অপরাহ্ন, জুন ২১, ২০১৭

আল-আমীন দেওয়ান, টেক  শহর  কনটেন্ট কাউন্সিলর : মিরপুরের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম। বৃষ্টি এলেই মন খারাপ হয়ে যায় তার। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যে কয়েকটি কোম্পানির কাজ তিনি করেন তা তখন বন্ধ হয়ে যায়। এতে কখনও কাজটি হারান, কখনও সময় মতো কাজ দিতে পারেন না আবার ক্লায়েন্টের ভৎসনাও শোনেন।

কম্পিউটার বিভাগের এই শিক্ষার্থী জানান, বৃষ্টি আসলে বেশিভাগে সময় ইন্টারনেট সংযোগ থাকে না। কাউমি অনলাইন নামে একটি আইএসপির সেবা নিয়ে থাকেন তিনি।

শুধু মিরপুরের আশরাফুল নয় বৃষ্টিতে ইন্টারনেট নিয়ে ভোগান্তি দেশের বেশিরভাগ ব্রডব্যান্ড গ্রাহকের। একটু বৃষ্টি হলেই পালায় দেশের ব্রডব্যান্ড  ইন্টারনেট। আর বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার কার্যকর কোনো সমাধান না হওয়ায় ইন্টারনেটের এই বৃষ্টি বিলাস হয়েছে গ্রাহকের ফাঁস।

ক্যাবল-ঝুলন্ত-তার-ঢাকা-আইএসপি-ইন্টারনেট-টেকশহর

সারাদেশে কর্পোরেট ও বাসা-বাড়ির ব্যবহারী মিলিয়ে ব্রডব্যান্ড সংযোগ আছে ৬০ লাখ। এর মধ্যে বাসা-বাড়ির সংযোগ ২৫ লাখের একটু বেশি। আবার মোট সংযোগের মধ্যে ৫০ লাখই ঢাকার।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ(আইএসপিএবি) জানায়, দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহার ৪২১ জিবি। যেখানে ৩০০ জিবি ব্যবহার করে এই ব্রন্ডব্যান্ডের ৬০ লাখ গ্রাহক আর বাকি ১২০ মতো যায় টেলকোর ৬ কোটি গ্রাহকের ব্যবহারে।

বৃষ্টিতে ইন্টারনেটের এই সমস্যার কারণ জানতে গিয়ে ইন্টারনেট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির টেকশহরডটকমকে জানান, ‘আমাদের যে ব্রডব্যান্ড সেটা সব জায়গায় সত্যিকার অর্থে ব্রডব্যান্ড হয়ে উঠতে পারেনি। এই জন্যই অবস্থাটা হয়। যেসব সংযোগ এফটিটিএইচ, ভিকম বা ফাইবার অপটিকে একদম বাসা পর্যন্ত কানেক্টিভিটি আছে সেখানে সমস্যাগুলো হয় না।’

‘কিন্তু অধিকাংশ পাড়ায়, বাসায় বা এলাকাতে যে ব্রডব্যান্ডটা দেয়া আছে সেটা হচ্ছে ইথারনেট ক্যাবল টেনে সুইচ করে করে এক বাসা হতে আরেক বাসায় সংযোগ দেয়া। বৃষ্টি হলে এই তারগুলো ফেটে যায়, শর্ট হয়ে যায় বা সুইচবক্স শক হয়ে পুড়ে যায় তখন এই সমস্যাগুলো তৈরি হয়।’

ঢাকায় কিছু এলাকার বাসায় ফাইবার সংযোগ থাকলেও ফাইবার অপটিক সংযোগ বাসা পর্যন্ত গেছে এমন সংখ্যাটা যে কম এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বলে উল্লেখ করেন ব্যান্ডউইথ আমদানিকারক কোম্পানি ফাইবার অ্যাট হোমের এই চিফ স্ট্রাটেজিক অফিসার।

আমাদের এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারটা এখনও ওভাবে গড়ে উঠেনি। এটি এখনও দূর্বল। তবে বৃষ্টিতে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক বলে তিনি বলছেন।

বৃষ্টির এই ভোগান্তি হতে মুক্তি মিলবে যদি ফাইবার অপটিক ক্যাবলে সংযোগ নেয়া হয়। সুমন জানান, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বৃষ্টির জন্য ইন্টারনেট চলে যাওয়ার কথা না। তবে বড় ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যুৎ, সড়ক সবকিছুর মতো ইন্টারনেটেও ডিজাস্টার তো হয়ই।

দেশের ইন্টারনেট সেবা দাতাদের সংগঠন আইএসপিএবি এর সভাপতি এম.এ. হাকিম টেকশহরডটকমকে জানান, ‘কেউ সংযোগ দিতে রাস্তার মধ্যে বক্স বসায়। ওখানে একটা সুইচ দিয়ে আশেপাশে ইউটিপি ক্যাবল টেনে দিচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে সেগুলো বজ্রপাতে পুড়ে যেতে পারে, বিদুৎবাহিত হয়ে কম্পিউটারের মাদারবোর্ড জ্বলে যেতে পারে বিভিন্ন সমস্যার কারণে সবাই পাওয়ার বন্ধ করে বসে থাকে। এটা টেকনোলজিক্যাল কারণ।’

‘যারা ফাইবার অপটিক ব্যবহার করে তাদের এই সুইচ বন্ধের দরকার পরে না। ফাইবার অপটিক বিদ্যুৎ পরিবাহী না। আর যারা ইউটিপি ক্যাবল কিংবা অন্য ক্যবল ব্যবহার করে যেখানে বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ায় বৃষ্টি-বজ্রের সময় সেটি ব্যবহারী পর্যন্ত চলে আসে।’

সমস্যা সমাধান না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছেন বলে জানান তিনি। বড় আইএসপিগুলোর যে সব এলাকায় সংযোগ রয়েছে সেগুলোর সর্বনিম্ন সংযোগে চার্জ ১ হাজার বার’শ। কারণ তারা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা দিয়ে নিম্ন প্যাকেজটাও আর কমে না।  আর পাড়া বা এলাকাগুলোতে স্থানীয় ছোট ছোট আইএসপিগুলো যে সংযোগ দেয় তার অফার থাকে ৫’শ টাকায় পাঁচ এমবিপিএস, তিন এমবিপিএস। এগুলো হোম ইউজারদের টার্গেট করেই চলে। তাই বাসাবাড়িতে এসব সংযোগই বেশি। যারা ফাইবার অপটিক ব্যবহার করে না এবং প্রযুক্তিটা ভাল নয়।

প্রতিযোগিতায় এই দামের পার্থক্যের কারণে একেবারে হোম ইউজার টার্গেট করে বড় আইএসপিগুলো এলাকা ও অলিগলিতে যায় না।  গ্রাহকরা কম দামের সংযোগটাই নিতে চান। তারা প্রযুক্তির বিষয়টা খুব একটা বিবেচনায় নেন না বলেন নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এই ব্যবসায়ী।

এছাড়া এলাকাভিত্তিকর মাসল পাওয়ার আরেকটা কারণ হিসেব উল্লেখ করে এম.এ হাকিম। তিন বলেন, স্থানীয়ভাবে এই ব্যবসাটা তারাই করতে চায়। এসব আইএসপির অনেকেরই লাইসেন্সও নেই। ৭০-৮০ শতাংশ অবৈধ আইএসপি। আমরা প্রায়ই বিটিআরসিকে বলি। বিটিআরসি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়, গ্রাহকদের বলে যে তাদের সংযোগ না নিতে, অবৈধ আইএসপির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয় কিন্তু এর মাঝখানে এক ফাঁক থেকে যায়।’

ফাঁকটা কোথায় তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ-বিটিআরসি যখন অভিযান চালায় তখন এদের আইডেন্টিফাই করতে পারে না। কারণ লাইসেন্স থাকা কোনো কোনো আইএসপির পপ হিসেবে ওই স্থানীয় অবৈধ আইএসপিরা নিজেদের হাজির করে। আসলে এই আইএসপিগুলো ন্যাশন-ওয়াইড কিন্তু ব্যবসা কম তাদের কেউ সাপোর্ট দিচ্ছে আর মাসে কোনো ইনভেস্টমেন্ট ছাড়াই ওই এলায় ব্যান্ডউইথ দিয়ে ব্যবসা করে। এই অবৈধ আইএসপিরা তো ব্যান্ডউইথ পাচ্ছে, কেউ না কেউ তাদের ব্যান্ডউইথ দিচ্ছে।’

প্রতিকার নেই শুধু অভিযোগেই শেষ বৃষ্টিতে ইন্টারনেট ভোগান্তি। মিরপুর বসবাসকারী তাহমিদ অপটিমা নামে একটি আইএসপির ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করেন। তিনি জানান, বৃষ্টি আসলে ইন্টারনেট লাইন থাকে না। আজকে বৃষ্টির দিনে সারাদিনই ইন্টারনেট ছিলো না।

রাহাত রহমান জানান, আইসিসি নামে প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করেন তিনি। বৃষ্টি আসলেই ইন্টারনেট হয়ে যায় স্লো বা থাকে না। বেশিভাগ সময় বাজ পড়ার শব্দ পেলেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।

ফ্রিল্যান্সার মেহেলি পারভীন পান্থপথে একটি আইএসপির সংযোগ ব্যবহার করেন। সোমবার দিনভর বৃষ্টিতে তার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ। যোগাযোগ করলেও বৃষ্টি কমলে সংযোগ চালু হবে বলে তাকে তার আইএসপি জানায়। অথচ এদিন তার দুটি কাজ ডেলিভারি দিতে হবে। বাধ্য হয়ে মোবাইলে ডেটা কিনে কাজ করছেন তাও অনেক ধীর গতির ইন্টারনেটে।

*

*