টেলিকমের আলোচনা সমালোচনার বছর

অনন্য ইসলাম, টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : ক্যালেন্ডার থেকে খসে পড়া ২০১৩ সালটি দেশের টেলিটকম খাতের জন্যও উল্লেখযোগ্য একটি বছর। এর আগের বছরটিও অনেক আলোচিত ছিল। তবে সদ্য বিদায়ী বছরের মতো এতোটা আলোচনা-সমালোচনা টেলিকম খাত নিয়ে আগে কখনো হয়নি।

শেষ হওয়া বছরটিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়া মানব পতাকা যেমন টেলিকম খাতের একটি বড় অর্জন,  তেমনি ব্যাপক পরিসরে থ্রিজি যুগে প্রবেশ একটি মাইলফলক হিসাবে থাকবে। আবার বছরের শেষ দিকে ওলোকে লাইসেন্স দেওয়ার ঘটনাও বিষ ফোঁড়া হয়ে থাকবে যোগ হয়েছে। টেলিকম খাতের বছর শেষের সালতামামি নিয়ে এ প্রতিবেদন।

গিনেজ বুকে লাল-সবুজ পতাকা
বিজয় দিবসে লাল সবুজের বিজয় স্লোগান গেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব পতাকা তৈরি করে বাংলাদেশ। তাও আবার রেকর্ডের ইতিহাস থেকে পাকিস্তানকে মুছে দিয়ে। পরে ডিজিটাল ভাবেও বিশ্বের বৃহত্তম পতাকা তৈরি করা হয়।

Digital Flag made by robi-TechShohor

গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে দেশের নাম তুলতে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল দেশের অন্যতম মোবাইল ফোন অপারেটর রবি। ২৭ হাজার ১১৭ জন স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এ মানব পতাকা তৈরি হয়। এর আগে ২০১২ সালে লাহোর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামে পাঞ্জাব ইয়ুথ ফেস্টিভাল উপলক্ষে ২৪ হাজার ২০০ লোকের অংশগ্রহণে জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিল পাকিস্তান।

থ্রিজির লাইসেন্স
অনেক ঠেলাঠেলির পর অবশেষে ৮ সেপ্টেম্বর হয়ে গেল কাঙ্খিত থ্রিজির নিলাম। এতে প্রতি মেগাহার্ডজ ২ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যে ২৫ মেগাহার্ডজ স্পেকট্রাম কেনে চার অপারেটর। গ্রামীণফোন নেয় দশ মেগাহার্ডজ। বাকি তিন অপারেটর রবি, এয়ারটেল এবং বাংলালিংক কেনে পাঁচ মেগাহার্ডজ করে।

3G-Mobile-Internet-Plans

চার অপারেটর ইতোমধ্যে থ্রিজি নেটওয়ার্ক তৈরির কাজে হাত দিয়েছে। প্রায় দেড় বছর আগে থেকে উন্নত প্রযুক্তির এ সেবা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব অপারেটর টেলিটক।

ওলো বিতর্ক
বছরের শেষ সময়ে এসে টেলিকমে যুক্ত হয় ওলো বির্তক। নভেম্বরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি নামমাত্র মূল্যে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের স্পেকট্রামসহ রাশিয়ান কোম্পানি ওলোকে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দিয়েছে সকল নিয়মকানুন ভেঙে। সেই সঙ্গে মোবিলিটিসহ চতুর্থ প্রজন্মের এলটিই সুবিধাও দেওয়া হয়েছে কোম্পানিটিকে।

ollo_techshohor

এলটিই অপারেটর হিসেবে ওলোকে স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া নিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছে জিএসএম মোবাইল অপারেটদের বিশ্ব সংগঠন জিএসএমএ।

উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে স্পেকট্রাম দেওয়ার দাবি জানানো হলেও ৩ হাজার ২’শ কোটি টাকার স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৪৬ কোটি টাকায়।

মোবাইল ফোন গ্রাহক বাড়ল ১ কোটি ৪৬ লাখ
সব ক্ষেত্রে এক বছরের হিসাব পাওয়া গেলেও মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের গ্রাহক সংখ্যার সর্বশেষ তথ্য অক্টোবরের। ওই সময় পর্যন্ত বিটিআরসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দশ মাসে মোবাইলের গ্রাহক বেড়েছে ১ কোটি ৪৬ লাখ। এতে দেশে মোট অ্যাকটিভ সিমের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ১৭ লাখে।

কেবল গ্রামীণফোন এ সময়ে ৬৬ লাখ ৪২ হাজার নতুন অ্যাকটিভ সিম বাড়াতে পেরেছে। অথচ ২০১২ সালে সব অপারেটর মিলে ১২ মাসে গ্রাহক বেড়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ। আর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে ৬১ লাখ ৬৮ হাজার।

নতুন মন্ত্রী নতুন সিইও
নভেম্বরে অন্তবর্তী সরকারের টেলিযোগাযোগমন্ত্রী হয়েছেন রাশেদ খান মেনন। অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের স্থলাভিষিক্ত হন তিনি।

এর আগে বছরের একেবারে শুরুতে দেশের বড় দুই অপারেটর গ্রামীণফোনে বিবেক সুদ ও বাংলালিংকে জিয়াদ সিতারা নতুন সিইও হিসাবে যোগ দেন। আর বছরের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে রবির অনেক দিনের সিইও মাইকেল কুহেইনার অবসরে গেলে দায়িত্ব নেন সুপুন বীরসিংহে।

ভুরি ভুরি গেটওয়ে লাইসেন্স
২০১২ সালটি ছিল গেটওয়ে লাইসেন্সের ছড়াছড়ি। আর পরের বছরে দেন দরবার শুরু হয় ৮৮৫ ভিএসপি লাইসেন্সের জন্যে। দেশে ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল সার্ভিস (ভিওআইপি) উন্মুক্ত করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০৬ আবেদনের বিপরীতে সরকার ১ হাজার চারটি লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত ৮৮৫ কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েছে। তবে এদের প্রায় সকলেই এখন বিপদে পড়েছে ব্যবসা শুরু করতে না পেরে।

খুলল ইউটিউবের বন্ধ দরজা
ইনোসেন্স অব মুসলিমের বিতর্কিত ভিডিও ফুটেজ সরিয়ে না নেওয়ায় ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বন্ধ হয় ইউটিউব। এর পর থেকে এটি বন্ধই ছিল। অবেশেষে গত জুনে সরকার আগের আদেশ প্রত্যাহার করলে বন্ধ দরজা খুলে যায়।

সিটিসেলকে লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ
বকেয়া আদায়ে দেশের ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলকে লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ দিয়ে টেলিকম খাতে চমক দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তাও দিয়েছে বিটিআরসি। অপারেটরটির কাছে মোট পাওনা ২৪৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তবে অর্থ পরিশোধে সিটিসেল এপ্রিল পর্যন্ত সময় চাইলেও ২০১৩ সালের শেষ দিন পর্যন্ত তা সুরাহা হয়নি।

BTRC_techshohor

বিটিআরসির বকেয়ার বছর
মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে বছরের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বকেয়া রাজস্ব নিয়ে বড় রকমের বিবাদে জড়িয়েছিল বিটিআরসি। সিম কার্ডের কর নিয়ে ও ভ্যাট পরিশোধ নিয়ে বিপরীত রকমের বক্তব্য ছিল উভয় পক্ষের। তবে পরে তা কিছুটা সুরাহা হলেও পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি।

অন্যদিকে বিভিন্ন অপারেটরের কাছে বিটিআরসির তিন হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। বিপুল এ অর্থ আদায়ে তৎপরতাও শুরু করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ল্যান্ডফোন কোম্পানি বিটিসিএলের কাছে রয়েছে ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।

সিটিসেলের কাছে ২৪৯ কোটি, টেলিটকের কাছে ৩১ কোটি, আন্তর্জাতিক গেটওয়েগুলোর (আইজিডব্লিউ) ৫০০ কোটি, আন্তসংযাগ এক্সচেঞ্জগুলোর কাছে ২১১ কোটি, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ের কাছে ৩০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

এর বাইরে ওয়াইম্যাক্স অপারেটর বাংলালায়নের কাছে ২৯ কোটি, কিউবির কাছে ১৫ কোটি, ১২ বেসরকারি ল্যান্ডফোন অপারেটরের কাছে ২৯ কোটি এবং অন্য বেসরকারি ও সরকারি সংস্থার কাছে স্পেকট্রাম বাদে পাওনা রয়েছে ২৪ কোটি টাকা।

Related posts

*

*

Top