Maintance

যাদের জন্য মুখরিত বছর

প্রকাশঃ ৪:৫২ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭ - সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১:০৭ অপরাহ্ন, জানুয়ারি ১, ২০১৮

টেক শহর কনটেন্ট কাউন্সিলর : তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০১৭টি মাতিয়ে রেখেছিল কয়েকটি ঘটনা। যার কোনোটি বছরের শুরুতে, কোনোটি শেষে আবার কোনোটি সারা বছর ধরেই চলেছে। বছর ফুরালেও এগুলোর আলোচনা থাকবে আরও অনেকদিন।

সবচেয়ে আলোচিত এক যন্ত্রমানবী

বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের শুরুতেই এক উম্মাদনায় মজে যায় দেশ। কি ভার্চুয়াল কি বাস্তব-সবখানে যন্ত্রমানবী সোফিয়া।

সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাওয়া রোবটটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভিজুয়াল ডেটা, ফেশিয়াল রিকগনিশন ফিচার মেশিন লার্নিং পদ্ধতিতে  ওয়াই-ফাই কানেকশনে এসে নিজ সিদ্ধান্তেই মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে ।

এশিয়ার বৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি উৎসব ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে আমন্ত্রিত হয়ে ৪ ডিসেম্বর রাতে বাক্সে করে ঢাকায় আসার আগেই সোফিয়াকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়।

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধনী দিনে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ করে সে।

তুমি আমাকে কীভাবে চেনো?-প্রধানমন্ত্রীর এমন জিজ্ঞাসায় সোফিয়া উত্তর দিয়েছিল, ‘আপনি মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। আপনাকে মাদার অব হিউম্যানিটিও সম্বোধন করা হয়। আপনি ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা।’

একটু থেমে পরেই সোফিয়া বলে দেয়, ‘আপনার নাতনির নাম আমার নামে।

মেলায় দুপুরে টেক টক উইথ সোফিয়া’ সেশনে আসন ছিল দুই হাজার জনের। অথচ উপস্থিত এর তিন-চারগুণ। ভিড় ঠেলেও ঢুকতে না পেরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সঙ্গে এলইডি স্ক্রিনে সোফিয়াকে দেখতে দাঁড়িয়ে ছিল আরও হাজারো মানুষ।

এছাড়া বাংলাদেশে আসার পর মূল দুটি সেশনের আগে পরে কতগুলো টিভি, প্রিন্ট, অনলাইন গণমাধ্যমে ইন্টারভিউ দেয় সোফিয়া। গণমাধ্যম ও মন্ত্রী-আমলাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয় সে। সব জায়গাতেই নিজের সক্ষমতার পরীক্ষায় উতরে যায় এই যন্ত্রমানবী।

৬ ডিসেম্বর রাত একটার দিকে বাংলাদেশ হতে বিদায় নেয় সোফিয়া।  তবে বিদায়ের আগে ২০১৭ সালের বাংলাদেশে আলোচিত বিষয়ের তালিকার শীর্ষ জায়গাটি দখল করে যায় এই রোবট।

রোবটটি নির্মাণ করেছে হংকংভিত্তিক ফার্ম হানসন রোবটিক্স। এর অবয়ব অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের মতো।

সোফিয়াকে অ্যাক্টিভেট করা হয় ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর তাকে প্রকাশ্যে আনা হয়।

আলোচিত-সমালোচিত পেপ্যাল-জুমের উদ্বোধন

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি কমিউনিটি, বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে ২০১৭ সালে ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল পেপ্যাল-জুম।

বছরের ১৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে ফ্রিল্যান্সার সম্মেলনে পেপ্যাল-জুম মাধ্যমে দেশে অর্থ আনার নতুন সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

সেবাটির মাধ্যমে বিদেশের যেকোনো একজন ক্লাইন্ট দেশের যেকোনো একজন ফ্রিল্যান্সার বা প্রাপকের অ্যাকাউন্টে সরাসরি স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে টাকা পাঠাতে পারবেন।

এতে টাকা আনতে সাধারণত ৪০ মিনিট সময় লাগবে, সর্বোচ্চ হলে ২ ঘন্টা। পেইনিওর বা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে যেখানে দশ-বিশ-ত্রিশ শতাংশ খরচ কেটে নেয়, বছরে ফি দিতে হয় সেখানে এখন ১ হাজার ডলার আনতে লাগবে ৫ ডলার। আর এর ওপরে কোনো টাকা লাগছে না । এতে বছরে ফিও নেই।

সেবাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর মধ্যেই ফ্রিল্যান্সার ও প্রবাসীরা মাধ্যমটি ব্যবহার করে তখন ৮ কোটি টাকা পাঠিয়েছিল। সেবাটি দেয়া শুরু করে সোনালী রুপালীসহ ৯ টি ব্যাংক।

পেপ্যালের সঙ্গে গত ৩ বছর ধরে যোগাযোগ করছিল বাংলাদেশ। প্রথমে ২০১৫ তে জুমের সঙ্গে বৈঠক। পরে ২০১৬ তে জুম-সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্টি লেনদেন চালু। তারপরে ২০১৬ তে পেপ্যালের সঙ্গে জুম একীভূত হওয়ার পর পেপ্যালের এক্সপ্রেস সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পেপ্যালের ওয়ালেট হতে এই ইনবাউন্ড সার্ভিস আসলো। বিশ্বের ১০৩টা দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সেবাটির আওতাভুক্ত হয়।

নির্বাচন কাণ্ডে বছরজুড়ে আলোচনায় বেসিস

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বেসিসের বছর কেটেছে নির্বাচনের সরগরমে।

Symphony 2018

বছরের শুরু হতেই নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে নেতাদের মতদ্বৈততা, আপিল-অভিযোগ। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও শাখার শুনানি, প্রথম দফায় ৮ জুলাই নির্বাচন বাতিল শেষে এই ইস্যুতে সংগঠনটির গঠনতন্ত্র পর্যন্ত সংশোধন। এরপরও দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত ২৮ ডিসেম্বরে নির্বাচন হয়নি।

বেসিস নির্বাচন বোর্ড নভেম্বরের শেষদিকে সদস্যদের জানিয়ে দেয় যে, ৩১ অক্টোবরের ইজিএমে সংশোধিত গঠনতন্ত্র ডিটিওর অনুমোদনের আগে নির্বাচন কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের পুন : তফসিল ঠিক সময়ে ঘোষণা করা হবে।

সংগঠনটির আগের গঠনতন্ত্রে বলা ছিল ৩ বছরের সেশন সময়ে প্রতি টার্মে(প্রতি বছর) কার্যনির্বাহী কমিটি হতে ৩ জন পদত্যাগ করবেন। পদত্যাগ করে শূন্য হওয়া ৩ পদে হবে নির্বাচন।

নতুন নির্বাচিত এবং পুরোনো মিলে ৯ পরিচালক নতুন করে কার্যনির্বাহী কমিটির পদের দায়িত্ব নেওয়ার নির্বাচন করবেন।

কিন্তু মে মাসে তখন পদত্যাগ নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় এবার ‘পদে থাকার জ্যেষ্ঠতা’র ভিত্তিতে কমিটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাসেল টি আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট এম রাশিদুল হাসান ও পরিচালক উত্তম কুমার পালকে পদত্যাগ করতে চিঠি দিয়েছিল নির্বাচন বোর্ড।

নির্বাচন বোর্ডের ওই সিদ্ধান্তে ‘আপত্তি’ করে আপিল বোর্ডে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন তারা।

পরে নির্বাচন বোর্ড আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে চিঠি দিয়ে জানায়, জ্যেষ্ঠতা নয় পদত্যাগ হবে লটারি করে।

অনুষ্ঠিত হয় লটারি। পদত্যাগের ওই লটারিতে নাম ওঠে বেসিস কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি মোস্তাফা জব্বার,  সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাসেল টি আহমেদ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ রহমানের।

বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বেসিস সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন পরিচালকের কাছে আবেদন করেন।

যার প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও শাখা এক চিঠিতে সংগঠনটির সংঘস্মারক ও সংঘবিধি সংশোধনের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা দেয়া হয়। ফলে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব কার্যক্রম আটকে যায়।

এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বেসিস নির্বাচন নিয়ে ডিটিও’র শুনানি করে।  শুনানি শেষে ডিটিওর নির্দেশনায় বলা হয়, সংগঠনটির বর্তমান গঠনতন্ত্র সংশোধনের পর হবে নতুন নির্বাচন, যা অনুষ্ঠিত হবে সবগুলো কার্যনির্বাহী পদে। এছাড়া নতুন নির্বাচনে কমিটির মেয়াদ হবে ২ বছর।

এর ফলে ৮ জুলাই তারিখের বেসিসের ২০১৭-১৮ টার্মের তিনটি পদে নির্বাচনের সকল কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়।

পরে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ইজিএমে অনুমোদনের পর পুরোনো গঠনতন্ত্রে ঘোষিত তফসিলে ২৮ ডিসেম্বরে নির্বাচনও করা যায়নি। কারণ নতুন গঠনতন্ত্রেই আসতে হবে তফসিল। এছাড়া গঠনতন্ত্রে ডিটিরও অনুমোদনও ছিল বাধ্যতামূলক।

তবে এতকিছুর পরও বছর শেষে সেই নির্বাচনই কবে হবে তা এখনও ঠিক হয়নি।

বাংলার নতুন বিপ্লব  

ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনে বাংলার ভাষাও ডিজিটাল করার বড় এক উদ্যোগ নেয়া হয় বছরটির শুরুতে। তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার বাড়ানো, বাংলা কম্পিউটিংয়ের নতুন নতুন উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার একটি প্রকল্পে অনুমোদন দেয় জানুয়ারিতে।

গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ শীর্ষক এই প্রকল্পে তৈরি করা হবে ১৬টি সফটওয়্যার। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৯ কোটি ২ লাখ টাকা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে সাধারণ ও অল্পশিক্ষিত মানুষও তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আসছেন। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ব্যবহার সকলের জন্য সহজ হবে।

প্রকল্পটিতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাকে শীর্ষ পর্যায়ে নেয়া, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়ক বাংলা ভাষার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রমিতকরণ, বাংলা কম্পিউটিংয়ে বিভিন্ন টুলস, প্রযুক্তি ও বিষয়বস্তুর উন্নয়ন এবং জরিপ, সমীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম করা হবে।

সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে থাকছে, বাংলা করপাস, বাংলা স্পিচ টু টেক্সট এবং টেক্সট টু স্পিচ, ন্যাশনাল কিবোর্ডের আধুনিকায়ন, বাংলা ফন্টের ইন্টার-অপারেবিলিটি ইঞ্জিন, বাংলা ভাষায় কমন লোকাল ডেটা রিপোজিটোরি (সিএলডিআর), বাংলা বানান ও ব্যাকরণ এক্সামিনার, বাংলা মেশিন ট্রান্সলেটর ডেভেলপমেন্ট, স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার, সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস টুলস উন্নয়ন, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভাষার প্রমীত কিবোর্ড, বাংলার আন্তর্জাতিক ফোনেটিক অ্যালফাবেট উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়।

প্রকল্পটির নানা সমীক্ষা ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

আল-আমীন দেওয়ান

 

*

*

Related posts/