মোবাইলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

মোবাইল ফোন হাতে পেয়ে কে কতটা বখে গেল, তার চেয়ে স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়েই গবেষণা হয়েছে বেশি। এসব গবেষণার ফল নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আলোচনা হয়েছে সভা-সেমিনারে। স্বাস্থ্যের ওপর মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন ফয়সল আবদুল্লাহ

mobile inner

মোবাইল ফোনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত রোগটা হলো ক্যান্সার। সাধারণ সর্দি-কাশি হলে বোধ হয় এ ইসু্যটা পাত্তাই পেত না। একবার একদল গবেষক বলে বসলেন, ফোন থেকে যে রেডিয়েশন বের হয় সেটা নাকি কোষের ডিএনএর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ঘনঘন মোবাইল ফোনের তরঙ্গের সংস্পর্শে সেই ডিএনএ উল্টাপাল্টা আচরণ করে রূপ নিতে পারে ক্যান্সারে। যথারীতি বিষয়টাকে মিথ্যা প্রমাণে উঠেপড়ে লাগলেন আরেক দল গবেষক। এর মধ্যে উলে্লখযোগ্য নাম অস্ট্রেলিয়ান রেডিয়েশন প্রটেকশন অ্যান্ড নিউক্লিয়ার সেফটি এজেন্সি। সংস্থাটি জানাল, এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী যে তথ্য-উপাত্ত তাদের হাতে আছে, তাতে স্পষ্ট যে মোবাইল ফোনের সঙ্গে ব্রেইন ক্যান্সারের কোনো সম্পর্ক নেই।

আশার কথা, মোবাইলের সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক নেই∏এমন ফলাফলের সংখ্যাই বেশি। ১০ বছর গবেষণা চালানোর পর ২০০৪ সালে ডেনমার্কের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Èমোবাইলে মোটেও স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই’ ধরনের মত দিল। জানা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠান নাকি সরাসরি ব্যবহারকারীর তথ্য না নিয়ে কেবল ক্রেতাদের তথ্য নিয়ে কাজ করেছে। অর্থাত্ আপনি ফোন কিনে কাকে ব্যবহার করতে দিলেন সেটা তাদের চিন্তার বিষয় ছিল না। সে হিসেবে গবেষণার ফলটা হতে পারত এমন∏মোবাইল ফোন কেনার সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক নেই। ড্যানিশ গবেষণাকে উদ্ধার করতে ঝঁাপিয়ে পড়ল উন্নত বিশ্বের আরো অনেকে। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ, সুইডিশ এবং ২০০৬-এ জার্মান গবেষণায়ও একই ফলাফল বেরিয়ে এলো।

ক্যান্সার যে হবে না∏এ ব্যাপারে বোঝা গেল সবাই মোটামুটি নিশ্চিত। তবে ২০০৭ সালে সুইডেনের ওরেব্রো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. লেনার্ট হার্ডেল মোবাইল ফোনের সঙ্গে Èঅ্যাকু্যস্টিক নিউরোমা’ নামে আরেক ক্যান্সারের সূত্র খঁুজে পেলেন। হার্ডেল আরো বললেন, দিনে এক ঘণ্টা বা এর বেশি কথা বললে ১০ বছর পর টিউমারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এই গবেষক বুদ্ধি করে সরাসরি কিছু দাবি করেননি। তিনি বারবার ঝুঁকির কথাই বলেছেন। আর যেই ঝুঁকিটাকে আসলে কেউই বাদ দিতে পারেননি। বিদু্যত্ চুম্বকীয় তরঙ্গের (তা যতই অল্প শক্তির হোক) একটা খারাপ প্রভাব থাকবেই।

লেনার্ট তঁার গবেষণায় আরো দেখেন, মোবাইল ফোনের কারণে সরাসরি ক্যান্সার না হলেও আগে থেকে হয়ে যাওয়া টিউমারের জন্য ফোনের রেডিয়েশন প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

শুধু ক্যান্সার বা টিউমার নিয়ে পড়ে থাকেননি গবেষকরা। ২০০৯ সালে হয়ে গেল মোবাইল ফোন বনাম কগনিটিভ ইফেক্ট পরীক্ষা। জিএসএম টাইপ নেটওয়ার্কে যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন (আরএফআর) থাকে, তার সংস্পর্শে মানুষের প্রতিক্রিয়ার গতি শ্লথ হয়ে আসতে থাকে। মাথার কাছে ফোন রেখে স্বেচ্ছাসেবকদের একটা কিছু মনে করতে বলা হলে, দেখা গেল উত্তর দিতে সবারই খানিকটা দেরি হচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাজের গতিও কমে এসেছে, এমন দাবি করা হয় ওই গবেষণায়।

মোবাইল ফোন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে কেবল জরিপ চালিয়ে কোনো রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক খঁুজে বের করা আসলেই মুশকিল। তাই এ গবেষণায় ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের রেওয়াজও আছে। মোবাইলে কথা বলার পর যেসব সমস্যার কথা সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী জানিয়েছে সেগুলো হলো, মাথাব্যথা ও মাথার ত্বকের নিচে শিরশিরে অনুভূতি, অনিদ্রা, মাথাঘোরা, মনোযোগ হ্রাস, প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, হজমে গণ্ডগোল ইত্যাদি।

মোবাইল ফোন নিয়ে Èনানা মুনির নানা মত’ থাকলেও মোবাইলের বেজ স্টেশন (আমরা যাকে মোবাইল টাওয়ার হিসেবে চিনি) নিয়ে কমবেশি সবাই একমত হয়েছেন। বেজ স্টেশনের আশপাশে বাস করাটা খুব একটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। মোবাইল ফোনে সর্বোচ্চ ২ ওয়াট শক্তির বিদু্যত্ চুম্বকীয় তরঙ্গের আসা-যাওয়া থাকলেও বেজ স্টেশনে এর শক্তি ১০০ ওয়াট পর্যন্ত।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০১১ সালের মে মাসে একদফা সতর্ক করে দিয়েছিল∏মোবাইলের বেজ স্টেশনের আশপাশে বেশিদিন থাকলে শরীরে Èকারসিনোজেনিক’ (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) তৈরির আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে ভারতের আদালতে মোবাইলের বেজ স্টেশন সরানোর দাবিতে মামলা ঠুকে দেওয়ার নজিরও আছে।

পরিশেষে নানা পরীক্ষা আর ইতিবাচক-নেতিবাচক ফলাফলের ভিড়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা একটা সাধারণ বিষয়ে একমত হলো যে মোবাইল ফোনে আসা-যাওয়া করতে থাকা স্বল্পমাত্রার বিদু্যত্ চুম্বকীয় তরঙ্গের ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকলেও থাকতে পারে। ঘুরেফিরে সেই প্রবাদের কাছেই যেতে হচ্ছে, যা রটে তার কিছু না কিছু তো ঘটতেও পারে বটে।

 

তবু সতর্কতা

মোবাইল ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললে আর কিছু না হোক, মাথা ধরা আর কানব্যথা অতি সাধারণ যন্ত্রণা। এসব থেকে বঁাচার জন্য কিছু আদবকেতাই যথষ্টে। এ ছাড়া মনটাকে যারা পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত রাখতে চান, তঁাদের জন্য রয়েছে সহজ-সরল কিছু টিপস।

হ     যেহেতু মোবাইল ফোন মানেই রেডিয়েশন, সেহেতু সেটটা শরীর থেকে দূরে রাখাটাই আসল কথা। হেডসেট কিংবা ব্লুটুথ ব্যবহার করে কথা বললেই ভালো।

হ     অনেকেই আছেন, যঁারা অতিমাত্রায় Èটেকি’ ভাবখানা ধরে রাখতে কানের মধ্যে দুলের মতো ব্লুটুথ হেডসেট গুঁজে রাখেন। ওই সেটেও কিন্তু সারাক্ষণ স্বল্পমাত্রার বিদু্যত্ চুম্বকীয় তরঙ্গ ঘুরপাক খায়। অতএব কাজ শেষে ওটা খুলে রাখাই উত্তম।

হ     যদি কানে চেপেই কথা বলতে হয়, তবে কথা বলার সময় বারবার কান বদল করে নেওয়া ভালো। আধা মিনিট ডান কানে তো আধা মিনিট বঁা কানে।

হ     দরকার ছাড়া মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা ভালো। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল খোলা রাখার দরকারটা কী বলুন?

হ     সরাসরি পকেটে না রেখে ফোনের জন্য একটা বাড়তি ব্যাগ রাখা ভালো। যদি পকেটে রাখতেই হয়, তবে নাম্বার প্যাডটাকে শরীরের দিকে রাখুন। অর্থাত্ ফোনের পেছনের দিকটা যেন বাইরের দিকে থাকে।

হ     চলন্ত গাড়িতে মোবাইল ফোন ব্যবহার না করাই ভালো। চলন্ত ও বেজ স্টেশন থেকে দূরে থাকাবস্থায় মোবাইলের রেডিয়েশনের শক্তি বেড়ে যায়।

হ     বালিশের নিচে ফোন রেখে ঘুমানো উচিত নয়। রেডিয়েশনটা সরাসরি মগজে গিয়ে লাগবে।

হ     শিশুদের দেহের কোষ বড়দের চেয়ে বেশি রেডিয়েশন শোষণ করতে পারে। তাই অন্তত এ কারণে হলেও মোবাইল ফোন শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।

হ     কাউকে কল করলে অপর প্রানে্তর ব্যক্তি রিসিভ না করা পর্যন্ত ফোন কানে ধরবেন না। কল সংযোগের সময় ফোন থেকে একটু বেশি শক্তিশালী তরঙ্গ বের হয়।

হ     দুর্বল ও বেশি পুরনো ফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। যেসব ফোনে নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা হয়, সেসব ফোন বেজ স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বেশ কসরত করে। যার ফলে রেডিয়েশনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে কয়েক গুণ।

*

*

Top